Image description

আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া এবং ‘যৌক্তিক প্রয়োজনীয়তা’ নেই—এমন প্রকল্পগুলোতে কাটছাঁটের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এবং অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় থাকা মোট দুই হাজার ৩৭২টি প্রকল্প যাচাই-বাছাই করে এর মধ্যে ৪৩৭টি প্রকল্পে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ২০৯টি প্রকল্প কমিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এর বাইরে ২৭০টি প্রকল্প চলতি অর্থবছরের মধ্যে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের সেক্টরভিত্তিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটি প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের জন্য গঠিত কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য ড. নেয়ামত উল্লা ভূঁইয়া।

পরিকল্পনা কমিশনের এক সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকল্পই বাদ দেওয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া যে প্রকল্প থেকে জনগণ তেমন উপকৃত হবে না, তেমন প্রকল্পই বাদ দেওয়া হচ্ছে।

অনেক প্রকল্প প্রকল্প আছে যেগুলোর অনুমোদনের পর তেমন অগ্রগতি নেই, সেগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। অনেক প্রকল্প আছে, যেগুলো রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং করা হচ্ছে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও শেখ রেহানার নামে ৮২টি উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মধ্যে ৩৮টির বাস্তবায়ন শেষ হলেও প্রায় ৪০টি প্রকল্প এখনো চলমান।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত চলমান প্রকল্প এবং সবুজ পাতায় থাকা অননুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলোকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত একনেক সভায় চলমান প্রকল্পগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়। এর অংশ হিসেবে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প চিহ্নিত করা, প্রকল্পের ব্যয়ে অপচয়ের সুযোগ রয়েছে কি নাতা দেখা এবং প্রকল্পগুলো জাতীয় স্বার্থে নেওয়া হয়েছে কি নাএসব বিষয় পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

গত ১৮ জুন পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে নির্দেশনা পাঠানো হয়। ১ আগস্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব এবং কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করে ৭ আগস্টের মধ্যে প্রকল্পগুলোর রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং সম্পন্ন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে বলা হয়। এ কাজ যাচাইয়ের জন্য পরিকল্পনা কমিশন, আইএমইডি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটি ১০, ১১ ও ১৮ আগস্ট তিনটি সভা করে প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে। এতে সমজাতীয় প্রকল্পগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির আওতায় আনা, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অননুমোদিত প্রকল্প বাদ দেওয়া এবং সামগ্রিকভাবে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত উপায়ে প্রকল্পের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে কোনো প্রকল্পের যৌক্তিক ও অপরিহার্য অঙ্গ বাদ না দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।

সেক্টরভিত্তিক হিসাবে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে চলমান ৩৪৮ এবং অননুমোদিত নতুন ২৮৫টিসহ মোট ৬৩৩টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ১২০টি প্রকল্পে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সমাপ্য প্রকল্প ৭৯টি এবং প্রকল্প কমতে পারে ৯টি।

ভৌত অবকাঠামো বিভাগে চলমান ৩৭৯ ও অননুমোদিত নতুন ৫৫২টিসহ মোট প্রকল্প ৯৩১টি। এর মধ্যে ১১০টি প্রকল্পে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের উদ্যোগ রয়েছে। সম্ভাব্য সমাপ্য প্রকল্প ১৯টি এবং প্রকল্প কমতে পারে ৬১টি।

আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগে চলমান ২৯৫ ও অননুমোদিত নতুন ৩২২টিসহ মোট ৬১৭টি প্রকল্পের মধ্যে ১৮০টিতে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সমাপ্য প্রকল্প ৬৯টি এবং কমতে পারে ৬৬টি প্রকল্প। শিল্প ও শক্তি বিভাগে চলমান ১১৮ এবং নতুন ১১৫টিসহ মোট ২৩৩টি প্রকল্পের মধ্যে ২৭টিতে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং হবে। এ বিভাগে ২৩টি প্রকল্প সম্ভাব্যভাবে শেষ হতে পারে এবং ২৭টি প্রকল্প কমতে পারে।

সব মিলিয়ে চারটি সেক্টরে চলমান এক হাজার ১০৭ এবং অননুমোদিত নতুন এক হাজার ২৬৫টিসহ মোট দুই হাজার ৩৭২টি প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩৭টি প্রকল্পে রিস্কোপিং ও রিপারপাসিং, ২৭০টি সম্ভাব্য সমাপ্তি এবং ২০৯টি প্রকল্প কমানোর প্রস্তাব রয়েছে।

তবে প্রকল্প কাটছাঁটের পাশাপাশি এর বাস্তবায়ন নিয়েও বেশ কিছু ঝুঁকির কথা জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একাধিক প্রকল্প একীভূত করে একটি সমন্বিত প্রকল্প তৈরি করা হলে প্রকল্পের লক্ষ্য অর্জনে অতিরিক্ত সময় ও অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জনবল কাঠামো পরিবর্তনেরও প্রয়োজন হবে। আবার বন্ধ হওয়া প্রকল্পের অডিট আপত্তি ও অন্যান্য দায়ভার নতুন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ ছাড়া রিস্কোপিং ও রিপারপাসিংয়ের ফলে প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পরিবর্তিত হলে নতুন করে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। প্রকল্পের কলেবর বাড়লে এক অর্থবছরে আগের তুলনায় বেশি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হবে এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত প্রকল্প একীভূত করলে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে কমিশন।

অন্যদিকে চলমান প্রকল্পগুলো পুরনো রেট শিডিউল অনুযায়ী তৈরি হওয়ায় রিস্কোপিং বা রিপারপাসিংয়ের সময় হালনাগাদ রেট শিডিউল অনুসরণ করতে হবে। এতে প্রকল্পের ব্যয় পরিবর্তনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর সীমাও পরিবর্তিত হতে পারে। প্রকল্পের তথ্য আইবাস++, এএমএস, পিপিএস ও ই-পিআইএমএসে হালনাগাদ করতেও সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং ক্রয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক পরিকল্পনা সচিব মামুন-আল-রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রতিটি প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজনীয়তা মাঠ পর্যায়ে যাচাই করা দরকার। কারণ প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হওয়ার কথা। এরই মধ্যে কোনো প্রকল্পে অর্থ ব্যয় হয়ে থাকলে তা বাতিলের মাধ্যমে অপচয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। তবে যাচাই-বাছাইয়ের পর সত্যিই কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন নেই প্রমাণিত হলে শুধু প্রকল্প বাতিল নয়, যাঁরা প্রকল্প তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।