আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছে দেশের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নির্বাচন কমিশন আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে পারে। এর আগেই সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যস্ত দলগুলো। বিএনপি এখনো কোনো সিটে প্রার্থী চূড়ান্ত না করলেও বেশিরভাগ সিটে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াত। আর ছয়টি সিটে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে এনসিপি।
দলীয়ভাবে নির্বাচন হওয়ার কথা না থাকলেও সিটি করপোরেশনগুলোতে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চায় তিন দলই। ফলে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে তৃণমূলেও জোরালো অবস্থান রয়েছে। এতে জোটের শরিকদের সঙ্গে মনোমালিন্যের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
১৩ সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী
বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে ১৩টি সিটি করপোরেশনে একাধিক নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে এলাকায় গণসংযোগ করছেন। অনেকে দোয়া চেয়ে ব্যানার-ফেস্টুনও টানিয়েছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান সিটি প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
ঢাকা উত্তর সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ও বর্তমান সিটি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের নাম আলোচনায় রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটিতে বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেন, নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর ও বর্তমান সদস্যসচিব নাজিমুর রহমানের নাম রয়েছে।
রাজশাহী সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন, বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শওকত শাহীন, মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন অর রশিদ এবং সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।
বরিশাল সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা বেশ দীর্ঘ। আলোচনায় রয়েছেন সাবেক প্যানেল মেয়র আলহাজ কে এম শহিদুল্লাহ, মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ও সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবির জাহিদ, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, বর্তমান সিটি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের রহমাতুল্লাহ, বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীন, বিএনপি নেতা এবায়েদুল হক চান, জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম খান রাজন এবং বরিশাল মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি ও বিএম কলেজের সাবেক জিএস অ্যাডভোকেট আকতারুজ্জামান শামীম।
খুলনা সিটিতে বর্তমান প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নাম আলোচনায় রয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে খুলনা-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন। এ ছাড়া মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা ও সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনিরের নামও রয়েছে।
সিলেট সিটিতে সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর নাম আগে আলোচনায় ছিল। তবে তিনি সিলেট-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী হওয়ায় এবার মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ইশতিয়াক আহমদ সিদ্দিকীর নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মহানগর বিএনপির সাবেক নির্বাচিত সভাপতি নাসিম হোসাইন এবং সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরীর নামও রয়েছে। কুমিল্লা সিটিতে দুইবারের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু, বর্তমান প্রশাসক ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু, নগর বিএনপির সভাপতি ও কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উৎবাতুল বারী আবু।
রংপুর সিটিতে বর্তমান প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব মাহফুজুন্নবী ডনের প্রার্থিতা অনেকটাই নিশ্চিত বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি ইতিমধ্যে গণসংযোগ ও প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ ছাড়া মহানগর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ছাত্রনেতা শহীদুল ইসলাম মিজু মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন। রংপুর-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান শামুর নামও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।
ময়মনসিংহ সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বর্তমান প্রশাসক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স, সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার, ফুলপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ এনায়েতুর রহমান এবং সাবেক পৌর মেয়র আমিনুল হকের নাম রয়েছে। গাজীপুর সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে এখনো কারও নাম জানা যায়নি।
নারায়ণগঞ্জ সিটিতে বর্তমান প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান, বিএনপি নেতা জাকির খান ও রাকিবুল ইসলাম খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। দলের হাইকমান্ড সাখাওয়াত হোসেন খানকেই প্রার্থী করতে পারে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। নবগঠিত বগুড়া সিটিতে বর্তমান প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি এম আর ইসলাম স্বাধীনকে প্রার্থী করা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির দলীয় সূত্র বলছে, মেয়র পদে বিগত দিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের মূল্যায়ন করা হবে। বিতর্কিতদের সুযোগ দেওয়া হবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতারা খোঁজখবর নিচ্ছেন। এরপর দলীয় মনোনয়ন বোর্ড চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
আগাম প্রার্থী ঘোষণা জামায়াতের
বিএনপি যেখানে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করেনি, সেখানে বেশিরভাগ সিটে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। ঢাকা উত্তর সিটিতে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন, ঢাকা দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, চট্টগ্রামে সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী, বরিশালে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে এটিএম আজম খান, ময়মনসিংহে কামরুল আহসান এমরুল, নারায়ণগঞ্জে শিবিরের সাবেক সভাপতি আব্দুল জব্বার এবং গাজীপুরে হাফিজুর রহমানকে মেয়র প্রার্থী করেছে দলটি। তবে কুমিল্লা, সিলেট, খুলনা ও বগুড়া সিটিতে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি জামায়াত।
দলীয় সূত্র বলছে, খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। তবে হাইকমান্ড এখনো বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
কুমিল্লায় মহানগর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, মাস্টার মোসলেহ উদ্দিন ও ভিপি মজিবের নাম আলোচনায় রয়েছে। বগুড়ায় শহর আমির আবিদুর রহমান সোহেলকে প্রার্থী করা হতে পারে। তিনি গত জাতীয় নির্বাচনে বগুড়া-২ আসনে তারেক রহমানের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
ছয় সিটিতে এনসিপির প্রার্থী চূড়ান্ত
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক হলেও সিটি নির্বাচনে এককভাবে লড়ার ঘোষণা দিয়েছে এনসিপি। ইতিমধ্যে ছয়টি সিটে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে দলটি। ঢাকা দক্ষিণে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তরে দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে প্রার্থী করা হয়েছে।
এ ছাড়া সিলেটে অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান আফজাল, রাজশাহীতে মোবাশ্বের আলী এবং কুমিল্লায় জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলামকে প্রার্থী করা হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটিতে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি এনসিপি। তবে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সাবেক মেয়র মঞ্জুরুল ইসলামকে প্রার্থী করার চেষ্টা চলছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। অন্য সিটিগুলোতেও প্রার্থী বাছাই চলছে।
এর আগে, গত ২১ আগস্ট গুলশানে বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে রাজশাহী বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে অংশ নেবে।
তিনি বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের ছাড় দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে দলের সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্রের দাবি, বিএনপির জরিপে কোনো সিটিতেই শরিকদের তেমন শক্ত অবস্থান নেই। তাই শরিকদের প্রার্থীকে ছাড় দিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না দলটি। বরং বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে শরিকদের কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
এনসিপিও একই অবস্থান জানিয়েছে। গত ২৪ আগস্ট চট্টগ্রামের এক কর্মসূচিতে দলটির উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেবে। অধিকাংশ সিটে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। সব জায়গায় জয় না এলেও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হবেন এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরি হবে।