Image description

আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অবস্থান এবং এসএসএফের নিরাপত্তা দেওয়ার দাবি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের সময় তোলা হয়েছে বলে দাবি ভারতীয় গণমাধ্যমের। একই দাবি করছেন ভারত-বাংলাদেশের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের দাবি, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার চালাতে হলে নতুন মামলা করা এবং ২০২৭ সালে আওয়ামী লীগসহ সব দলের অংশগ্রহণে মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচনের দাবিও জানিয়েছে ভারত।

যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী বাংলাদেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মুস্তাফিজুর রহমান এসএফ মিডিয়া নিউজে বলছেন, পরাগ জৈন ঢাকায় এসে দাবি করেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা বাতিল ও বিচার করতে হলে নতুন মামলা করতে হবে। তাকে এসএসএফের নিরাপত্তা দেওয়াসহ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় রাখতে হবে। এমনকি সাকিব আল হাসান ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের বাড়িতে হামলা-অগ্নিসংযোগে জড়িতদের বিচারও ভারতের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে।

ভারতীয় এনকে টিভি বাংলার এক প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে বলা হচ্ছে, শর্ত সাপেক্ষে শেখ হাসিনাকে ঢাকায় ফেরাতে চায় ভারত। শর্ত অনুযায়ী, দেশে ফিরলে কোনো মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা যাবে না, নজরবন্দি রাখা যাবে না এবং তার বিরুদ্ধে থাকা সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। তাকে স্বাধীনভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দিতে হবে এবং আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলতে হবে। এসব শর্তের বিনিময়ে বাংলাদেশকে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত। তবে তারেক রহমান সরকার বলছে, ‘র’-এর প্রধানের ঢাকা সফর একটি রুটিন প্রক্রিয়া। ডিজিএফআই কর্মকর্তারাও ভারত সফর করেন। এনকে টিভির দাবি, গত দুই দশকে ‘র’-এর কোনো প্রধানের ঢাকা সফরের নজির নেই। শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরার আগে ভারত তাকে শর্তের বার্তা দিয়ে ঢাকায় পাঠিয়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরানোর গুজব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এই ধরনের গুজব এখন পর্যন্ত সরকারের কানে আসেনি। যে বিষয় কানে আসেনি, তা এখন পর্যন্ত আমলে নিতে চাচ্ছি না। আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সরানোর তথ্য সঠিক নয়।

ভারতের ‘স্ট্র্যাট নিউজ গ্লোবাল’ বলছে, পরাগ জৈনের ঢাকা সফর দুই দেশের নিরাপত্তা সম্পর্কের নীরব বিন্যাস ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যে নিরাপত্তা চ্যানেল সচল রাখার প্রয়াস। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলা হচ্ছে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিয়ে প্রকৃত বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালন করবে এবং ক্ষমতায় পুনরায় বিএনপিকে আনতে ভারত সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। অর্থাৎ দেশের নির্বাচনে জনগণ কাকে নির্বাচিত করবে, তা নিয়ে অতীতে সুজাতা সিংয়ের ফর্মুলা বাস্তবায়ন থেকে ভারত অবস্থান বদলায়নি—এমন বক্তব্যও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।

ভারতের ‘স্কিল বাংলা’ চ্যানেলের একটি এপিসোডে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে বাংলাদেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচ লাখ নেতাকর্মী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকার পথে মার্চ করবেন। সীমান্তে এলেই তাকে স্বাগত জানাবেন। ভারতের মূল উদ্দেশ্য বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর শেখ হাসিনা বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের ঘোষণা দিলে সেখানে লাখ লাখ সমর্থকের সমাবেশ হতে পারে। এত বিশাল জনস্রোত যেকোনো প্রশাসনের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে বড় পরীক্ষা হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সঙ্গে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলেও জানানো হয়।

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পলাতক নেতা সাদ্দাম হোসেনের সাক্ষাৎকার নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য প্রিন্ট’ বলছে, খুব শিগগিরই বাংলাদেশে ‘জেন জি আলফা রেভল্যুশন’ ঘটবে। জুলাই আন্দোলন আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্র ছিল এবং তা নস্যাৎ করতে ‘জেন জি আলফা রেভল্যুশন’-এর প্রস্তুতি চলছে ভারত ও বাংলাদেশে। আনন্দবাজার পত্রিকায় পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজেসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর একযোগে দেশে উত্তাল গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টির আভাস দিয়েছেন। তাদের টার্গেট ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরেই। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে জয়লাভের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছিলেন, শেখ হাসিনা শাহজালাল বিমানবন্দরে মর্যাদার সঙ্গে ফিরবেন এবং লাখো জনতা তাকে স্বাগত জানাবেন।

বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে জাতীয় পার্টির নেতা শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপ তারেক রহমান সরকার সহ্য করতে পারবে না। ‘মানচিত্র’ চ্যানেলে শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নার আলোচনার মূল বক্তব্য, সরকার চাইবে না শেখ হাসিনা এখনই ফিরুন। কারণ সরকার রাজনৈতিকভাবে এখনো শক্তিশালী বা গুছিয়ে ওঠার অবস্থায় নেই।

শামীমের মতে, শেখ হাসিনা ফিরলে তার অনুসারী বা আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং বিরোধী মব বা জামায়াত-সমর্থিত গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত হতে পারে, যা দেশকে ছোটখাটো গৃহযুদ্ধ বা অস্থিরতার দিকে নিতে পারে। শামীম দাবি করেন, পুলিশ বাহিনী যথেষ্ট ডিমোরালাইজড বা মনোবলহীন থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে পুরোদমে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হতে পারে।

শামীম আরও অভিযোগ করেন, পুলিশে সংস্কার হয়নি, সেনাবাহিনীকে দিয়ে পুলিশের কাজ করানো হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ থেকে ৮ আগস্টের ঘটনায় সাধারণ পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করেন, তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। পুলিশ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হলে এবং অসন্তোষ দূর না করলে ভবিষ্যতে এটি বিপ্লব বা বিদ্রোহের কারণ হতে পারে।

টিভি টকশোতে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইনক্লুসিভ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দেশে ইনক্লুসিভ নির্বাচনের কথা তখন প্রথম বলেন ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। তিনি বলেছিলেন, ইনক্লুসিভ নির্বাচন হলেই তা ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে রচিত হবে, তখন দেখা যাবে।

এখনো আলোচকেরা সেই ধারা অনুসরণ করে বলছেন, আওয়ামী লীগকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে দিতে হবে। দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে ফিরবে এবং তার আগেই শেখ হাসিনা দেশে ফিরে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাদের আভাসের সঙ্গে ভারতীয় বিশ্লেষকদের বক্তব্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে। ভারতীয় ইউটিউব চ্যানেল ‘স্কিল বাংলা’র উপস্থাপক বলছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে না থাকলে দেশটি পাকিস্তানের দখলে চলে যাবে এবং এর প্রভাব ভারতেও পড়বে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফরের সম্ভাবনা আপাতত বাতিল হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম গতকাল রোববার এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত ফেরত পাঠাতে, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ এই জবাবের অপেক্ষায় আছে।’

তবে ভারতীয় ব্লগার, সাংবাদিক ও বিশ্লেষকেরা দাবি করছেন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিষয়ে ভারতের শর্ত পূরণে ঢাকা রাজি না হওয়ায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর আপাতত বাতিল। তবে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আশাবাদ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। রোববার রাতে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ‘আরও দ্রুত হওয়া উচিত’।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যারা ভারতে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, তারা সঠিক পরামর্শ দিচ্ছেন না। রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত থাকার কারণে ভারতকে তিনি ভালোভাবে জানেন। আমন্ত্রণ জানানোর পর কেউ তা প্রত্যাখ্যান করলে ভারতীয়রা বিষয়টি সহজভাবে নেন না।

বাংলাদেশ ও ভারতের বিশ্লেষকেরা সামাজিক মাধ্যম, ইউটিউব ও গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার পুনর্বাসন ও দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ধারা নিয়ে যে বিতর্ক তুলেছেন, এসব তথ্যের কতটা সত্যি, কতটা অনির্ভরযোগ্য, কতটা গুজব—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাস্তবে তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রিসেট, নাকি শেখ হাসিনাকে ভারতে রেখেই আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন—কোনটি চূড়ান্ত করবে, তা নিয়ে ভারতের অবস্থানে মনে হচ্ছে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।