Image description

বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস বা ১৮০ দিন পূর্ণ হয়েছে ১৬ আগস্ট। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভঙ্গুর অর্থনীতি ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়ে সরকার গঠন করে দলটি। ছয় মাসে নানা অগ্রগতির দাবি সরকারের পক্ষ থেকে করা হলেও গত কয়েক মাসে অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা, জ্বালানি সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে।

ছয় মাস পূর্তিকে সামনে রেখে সরকার এখন পুরো মেয়াদের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করার পথে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অগ্রাধিকারভিত্তিক ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি শিগগিরই জাতির সামনে উপস্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে গত ছয় মাসে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বাস্তবায়িত উদ্যোগ, নীতিগত সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল্যায়নও তুলে ধরা হবে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের ধারাবাহিক বৈঠক হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন। সেখানে এসব বিষয় তুলে ধরা হতে পারে।

সরকারের ভাষ্যে পাঁচ মাসে বহুমাত্রিক অগ্রগতি

গত ১৮ জুলাই সরকারের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পাঁচ মাসে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রশাসনিক সংস্কারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার প্রথম ১৫০ দিনে রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, সুশাসন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সরকারের বক্তব্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মাত্র ১৫০ দিনেই সরকার জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনীতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে বলেছেন, বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অতীতে সূচক ইতিবাচক ধারায় ছিল, যা গত ১৬ বছরে ধূলিসাৎ করা হয়েছে। বর্তমান সরকার রিজার্ভ পুনর্গঠন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগ ফেরাতে কাজ করছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো ছয় মাসের মধ্যে চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকার গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম মাসেই নারীকেন্দ্রিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। এছাড়া বড় আকারে কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, ফুয়েল পাস, এলপিজি কার্ড ও ক্রীড়া কার্ড আলোচনায় এসেছে।

নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী রেলপথ মন্ত্রণালয় ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছরের পৃথক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। অচল ডেমু সচল, নতুন আন্তনগর ট্রেন চালু এবং বুলেট ট্রেন সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান সাফল্য হিসেবে ইউএনজিএ প্রেসিডেন্সি অর্জনের কথা বলা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং প্রকাশিত ই-বুক অনুযায়ী, প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে প্রায় ২০০টি উদ্যোগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যার ফলে জনজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সরকার ১৫০ দিনে সব মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির কথা বললেও বিশ্লেষকদের মতে, আইনশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনদুর্ভোগ কমানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

সরকারের প্রথম ১৫০ দিন নিয়েই বিশ্লেষণ ছিল ভগ্ন অর্থনীতি ও উচ্চ প্রত্যাশা পূরণের চ্যালেঞ্জ। ওই সময়ের মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, সরকার কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নিলেও অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি।

আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বললেও পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন হয়নি। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রশাসন পরিচালনায় ব্যর্থতা ও গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে অক্ষমতার কারণে সরকার দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।

মূল্যায়ন কেন জরুরি

ছয় মাস পূর্তির পর সরকারের নজর এখন দৃশ্যমান বাস্তবায়নে। আগামী ১৬ আগস্টকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিসভায় রদবদলের জোর গুঞ্জন চলছে। প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার মুখে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের তোড়জোড় চলছে এবং একাধিক মুখ বাদ পড়তে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

সরকারের ভাষ্যে পর্যবেক্ষণ শেষ, এখন অ্যাকশন শুরু। জনগণের প্রত্যাশা, প্রতিশ্রুত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ছয় মাসের সরকারের পরবর্তী পথচলা কতটা মসৃণ হবে।

বর্তমান সরকারের ছয় মাসের অঙ্গীকারের লক্ষ্য অনুযায়ী মোটামুটি সবগুলোই পূরণ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নয়াপল্টনে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচি নিয়ে ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, কোথাও হয়তো ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়নি, তবে ৯০ কিংবা ৯৫ শতাংশ হয়েছে। সরকারের ছয় মাস পূর্তিতে অঙ্গীকারগুলোর কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, তার একটি লিখিত বিবরণ দেওয়া হবে।

সরকারের প্রথম ছয় মাসকে প্রস্তুতি ও প্রশাসন গুছিয়ে নেওয়ার সময় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিতে সময় লেগেছে।’

পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরও জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে বলে প্রত্যাশা জানান তিনি। রিজভী বলেন, ‘পরবর্তী ছয় মাস আরও জোরালোভাবে এটা অ্যাক্সিলারেট হবে এবং কর্মসূচিগুলো সফল বাস্তবায়ন হবে।’

তবে সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা শুধু ছয় মাসের অগ্রগতি যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একটি সরকারের, বিশেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের, পুরো মেয়াদের বিভিন্ন সময়ে মূল্যায়ন খুব জরুরি। এটি শুধু বাংলাদেশেই হয় এমন নয়, গণতান্ত্রিক দেশগুলোরও একই রকম বৈশিষ্ট্য বা চরিত্র রয়েছে। এই মূল্যায়নের প্রধান কারণ হলো, সরকারকে তার মূল কাজ, নির্বাচনি ইশতেহার এবং জনগণের প্রয়োজনের দিকে মনোযোগী রাখা।

তিনি বলেন, অঙ্গীকার অনুযায়ী কী অর্জন হয়েছে, কাজের মাধ্যমে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এই প্রক্রিয়াগত মূল্যায়নের মাধ্যমে সরকারকে জনস্বার্থে কাজের গতি বাড়ানো এবং মূল অঙ্গীকারের ধারায় কর্মশীল রাখা যায়। যদিও অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, কোনও সরকারই ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বা পাঁচ বছরের মূল্যায়নকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

তার মতে, ৫ আগস্টের পরে এটি প্রথম নির্বাচিত সরকার। তাই এই সরকারের কাছে প্রত্যাশার জায়গাটি আগের সরকারগুলোর তুলনায় ভিন্ন। ৫ আগস্টের পরের প্রথম নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি তার অঙ্গীকারের জায়গাগুলোতে শতভাগ সতর্ক থাকবে বলে তিনি মনে করেন। সমালোচনার বিষয়গুলো সাদরে গ্রহণ করে সংশোধন ও নতুন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের প্রত্যাশা ও জনস্বার্থ পূরণ করতে হবে।

তিনি বলেন, জনস্বার্থে সরকারকে সঠিক ধারায় রাখা এবং জনগণ কী বলছে, কী ভাবছে, সে বিষয়ে সরকারকে অবগত করার জন্যই মূল্যায়ন প্রয়োজন। সরকার যত বেশি এই মূল্যায়ন গ্রহণ করবে ও বোঝার চেষ্টা করবে, তত বেশি জনগণের পালস বা উপলব্ধি বুঝতে পারবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও সরকারের কার্যক্রমে নজরদারি ও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘মূল্যায়ন করা জরুরি। কারণ, ক্ষমতার কতগুলো বৈশিষ্ট্য থাকে। ক্ষমতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার হয় এবং সরকারের হাতে অগাধ ক্ষমতা, সরকারের বৈধভাবে বল প্রয়োগের ক্ষমতা আছে। সরকার অনেক কিছু করতে পারে তাই নজরদারি দরকার।’

তিনি বলেন, ‘নজরদারি অনেক দিক থেকে দরকার, যেমন নজরদারি করার জন্য সংসদ একটা কাঠামো, তারপরে বিচার একটা কাঠামো, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আছে। তারা নজরদারি করে সরকার যাতে কোনও অন্যায় না করে, কোনোরকম ক্ষমতার ব্যবহার না করে, মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে এবং একইসঙ্গে এই গণমাধ্যমও নজরদারির জন্য বড় প্রতিষ্ঠান, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নাগরিক সমাজ গুরুত্বপূর্ণ যে তারা সরকার যে যাতে বাড়াবাড়ি না করে মানুষ অধিকার ক্ষুণ্ণ না করে, মানুষের প্রতি কোনোরকম অন্যায় আচরণ না করে। এ জন্য যে নজরদারি দরকার, এটা সেই নজরদারির অংশ।’

প্রতিদিনই মূল্যায়নের পক্ষে মত

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, মূল্যায়ন এক বছরভিত্তিক জরুরি, এমনটা তিনি মনে করেন না। এমনকি প্রথম দিন থেকেই মূল্যায়ন হতে পারে। মূল্যায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে মানুষ পরে মূল্যায়ন করে, কারণ সবকিছুরই একটি ‘হানিমুন পিরিয়ড’ থাকে। ছয় মাস হয়তো খাপ খাওয়াতে ও বিষয়গুলো বুঝতে সময় লাগে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, প্রথম দিন থেকেই সরকারের মূল্যায়ন করা উচিত।

তিনি বলেন, সরকার যখনই ভুল করবে, তখনই প্রতিবাদ করা উচিত। ভালো কিছু করলে তখনই প্রশংসা করা উচিত। এটি যেকোনও সময় করা যায়। তবে এখন ১৮০ দিনের একটি লক্ষ্য ধরে সরকার কিছু বিষয়ে অর্জন করতে চায়। প্রধানমন্ত্রী একটি লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিলেন বলেই হয়তো ছয় মাস পর সবাই বিচার-বিশ্লেষণ করছে, এই সময়ে সরকার যতটা এগোতে চেয়েছিল ততটা এগোতে পেরেছে কিনা।

তবে তিনি মনে করেন, এ ধরনের সময়সীমার খুব একটা অর্থ নেই। প্রতিদিনই সরকারের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতে হবে এবং প্রতিদিনই এক ধরনের জবাবদিহি থাকতে হবে।