ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা করতে আগ্রহী মো. শাহজালাল উদ্দীন। তিনি বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সরকারি কলেজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রভাষক (নন-ক্যাডার) হিসেবে কর্মরত। ২০২২-২৩ সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি ডিপার্টমেন্টে ক্যান্সার গবেষক হিসেবে এমফিল কোর্সে ভর্তি হন। এই কলেজটি ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২১ সালে জাতীয়করণ হয়। তিনি বলেন, কলেজ বেসরকারি থাকাকালীন সভাপতি-প্রিন্সিপালের অনুমতি নিয়ে এক বছরের শিক্ষা ছুটির জন্য আবেদন করেছিলাম মাউশিতে (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর)। কিন্তু চাকরি স্থায়ীকরণ না হওয়ার কারণে তা মঞ্জুর হয়নি।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন পিএইচডি করতে আগ্রহী। কিন্তু চাকরি স্থায়ীকরণ না হওয়ায় তিনি আবেদনই করতে পারছেন না। তিনি বলেন, আমি তো আবেদনই করতে পারছি না, কারণ শিক্ষা ছুটি পাবো না। আবার প্রতিষ্ঠান থেকে বারবার প্রতিষ্ঠান প্রধান পরিবর্তন হওয়ায় বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) জমা দেয়নি। তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন পিএইচডি করার। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আটকে আছি।
বগুড়ার শাহজাহানপুর এলাকার সরকারি কমরউদ্দিন ইসলামিয়া কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন মোস্তাফিজুর রহমান। সমাজ বিজ্ঞানের এই শিক্ষক ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিলের জন্য মনোনীত হন। একাডেমিক শর্ত অনুযায়ী তাকে এক বছর স্টাডি লিভ নিতে হবে। কিন্তু তাদের চাকরি স্থায়ীকরণ না হওয়ায় তিনিও ছুটি পাচ্ছেন না। এই শিক্ষকরা দিন কাটাচ্ছেন অনিশ্চয়তায়।
সূত্র মতে, ২০১৮ সাল থেকে শুরু হয়ে কয়েকবারে ৩৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আত্তিকরণ করা হয়। কিন্তু এরপরও এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি। তারা দফায় দফায় করেছেন আন্দোলন। কিছু শিক্ষক মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতনদের বিশেষ সুপারিশের মাধ্যমে পিএইচডি বা এমফিলের সুযোগও পেয়েছেন। তবে অধিকাংশ শিক্ষক বঞ্চিত হচ্ছেন। শিক্ষকরা ছুটির আবেদন করে মাউশি’র মাধ্যমে। মাউশি বলছে, নিয়মে না থাকায় তারা ছুটির আবেদন মঞ্জুর করতে পারছেন না।
এক শিক্ষক জানান, স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশ নিয়ে ঘুরছেন বিশেষ আবেদনের জন্য। প্রায় সপ্তাখানেক ধরে ঘুরছেন মন্ত্রণালয়ে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকদের এত পরিমাণ ভিড় থাকে যে সচিবসহ ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে দেখা পাওয়াটাই দায় হয়ে গেছে। আমার হাতে সময় কম। দুই সপ্তাহের মধ্যে চিঠি মঞ্জুর করতে হবে। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি’র সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এ বিষয়ে মাউশি’র সহকারী পরিচালক (কলেজ-২) ফজলুল হক মনি বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী চাকরি স্থায়ীকরণ ছাড়া এই ছুটি কেউ পেতে পারেন না। এটা আমাদের নিয়মের পরিপন্থি। আমরা চাইলেও তাদের ছুটির আবেদন মঞ্জুর করতে পারি না। মাউশি’র উপ-পরিচালক (কলেজ-১) মো. নুরুল হক সিকদার পিএইচডি-এমফিল করতে না পারাটা দুঃখজনক উল্লেখ করেন এবং বলেন, নানা কারণে আমরা চাইলেও আত্তীকরণকৃত প্রতিষ্ঠান শিক্ষকদের স্থায়ী করতে পারছি না। নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষকদের এসিআর দুই বছরের পাঠাতে হয়। কিন্তু নানা ধরনের জটিলতার কারণে তারা এটা পাঠাতে পারেন না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষকের এসিআর একসঙ্গে পাঠাতে হয়। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে বলেন, এক অধ্যক্ষ শুধুমাত্র তার বলয়ের কিছু লোকের এসিআর পাঠিয়েছেন। এরপর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিছু শিক্ষকের সঙ্গে তার বিরোধিতার কারণে তিনি পাঠাননি।
এ ছাড়াও অনেক শিক্ষকের নামে মামলা থাকলে তথ্য গোপন করা হয়, আবার মামলা না থাকলেও মামলার তথ্য উল্লেখ করা হয়। এসব নানা কারণে শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ করা সহজ হয় না। তিনি আরও বলেন, আমরা স্থায়ীকরণ করতে চাই। এর জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বিশেষ করে এসিআর প্রয়োজন। যথাযথ তথ্য নিয়ে আসার আবেদন জানান তিনি।
নিয়ম অনুযায়ী, মাউশি থেকে স্বাক্ষরকৃত ফাইল যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে- সেখানে আরেক দফা যাচাইয়ের পর যায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি)। পিএসসি থেকে ফাইল স্বাক্ষর হয়ে ফের আসে মন্ত্রণালয়ে। দীর্ঘমেয়াদি এই কর্মযজ্ঞে খুব দ্রুত কাজ হলেও লেগে যায় কয়েক মাস।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (কলেজ) কাজী নূরুল ইসলাম বলেন, স্থায়ীকরণের কাজ চলমান রয়েছে। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণের কাজ আমরা করছি। পিএইচডি-এমফিলের পাশাপাশি স্থায়ীকরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষক অবসরকালীন সুবিধার জন্যও সমস্যার সম্মুখীন হন। আমরা বিষয়টি নিয়ে অবগত এবং প্রতিনিয়ত কাজ করছি।