গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন অপরাধের বিচার দাবিতে রাজপথে আরও কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে জোটটি। রাজধানীকে কেন্দ্র করে বড় কর্মসূচির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে লংমার্চ, রেলযাত্রা ও সমাবেশের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
জোটের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর এবং ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে যশোর ও কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ হবে। ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত হবে রেলযাত্রা। আর ১৪ নভেম্বর রাজধানীতে আয়োজন করা হবে বড় ধরনের মহাসমাবেশ। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করা হবে।
নভেম্বরের মহাসমাবেশ সামনে রেখে বড় ধরনের জনসম্পৃক্ততার পরিকল্পনা করছে ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের নেতাদের লক্ষ্য, ওই সমাবেশে অন্তত ১০ লাখ মানুষের জমায়েত ঘটানো। এজন্য গ্রামগঞ্জ থেকে নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষকে রাজধানীতে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর আগে লংমার্চ, রেলযাত্রা ও স্থানীয় পর্যায়ের কর্মসূচির মাধ্যমে ধীরে ধীরে আন্দোলনের পরিধি বাড়াতে চায় তারা।
জোটের নেতারা বলছেন, এতদিনের আন্দোলনে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দাবিগুলো প্রাধান্য পেলেও এবার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিষয়গুলোকে সামনে আনা হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যের মতো ইস্যুতে মানুষের ক্ষোভকে রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করতে চায় ১১ দল।
জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান বললেন, ‘এবার আমরা আর ছোটখাটো কর্মসূচিতে থাকছি না। জুলাই সনদ, গণভোট, গ্যাস-বিদ্যুৎসহ জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতে লংমার্চ ও মহাসমাবেশের মতো বড় কর্মসূচিতে যাচ্ছি। ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশের চিন্তা রয়েছে। গ্রামগঞ্জ থেকে সব পর্যায়ের মানুষকে আমরা এতে যুক্ত করতে চাই।’
গত ৬ আগস্ট গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে চুলা, হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে সচিবালয় অভিমুখে মিছিল করেছিল ১১ দলীয় ঐক্য। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে মিছিলটি জিপিও মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ সেটি আটকে দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে মৃদু ধাক্কাধাক্কির পর মিছিলকারীরা সরে যান। জোটের নেতারা বলছেন, ঘোষিত লংমার্চ ও পরবর্তী কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হলে আন্দোলন আরও কঠোর করা হবে।
১১ দলের আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বিভাগভিত্তিক লংমার্চ। রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে চায় জোটটি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য জনগণের ন্যায্য দাবি আদায় এবং দেশের মানুষের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করা। লংমার্চে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করেছেন, কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হলে তা আরও শক্তিশালীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবে।
তবে ১১ দলীয় ঐক্যের আন্দোলনের রাজনৈতিক কেন্দ্রে রয়েছে গণভোটের রায় ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবি। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। ফলে এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
এ বিষয়টিকেই রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। জোটের নেতাদের অভিযোগ, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে। তাদের দাবি, গণভোটে দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না করা হলে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল হবে এবং এতে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট আরও গভীর হতে পারে।
১১ দলীয় ঐক্যের মুখপাত্র হামিদুর রহমান আযাদ বললেন, সরকার গণভোটে দেওয়া অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেনি। গণরায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়নি। তার ভাষায়, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধাপে ধাপে কর্মসূচি চলবে। সরকার রায় মেনে না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবে ১১ দলীয় ঐক্য।
রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে এবার জ্বালানি ও জনজীবনের সংকটও আন্দোলনের সামনে নিয়ে এসেছে জোটটি। দলগুলোর নেতাদের অভিযোগ, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও কর্মসংস্থানের সংকটেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতায় আসার পর গত পাঁচ মাসে সরকার একের পর এক ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করাকে তিনি সরকারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রেও সরকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এসব সমস্যার সমাধান এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে সরকারের ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদের ভেতরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি তোলার পাশাপাশি এবার সেই আন্দোলন রাজপথে আরও জোরালো করতে চাইছে ১১ দলীয় ঐক্য। সেপ্টেম্বরের লংমার্চ থেকে শুরু করে অক্টোবরের রেলযাত্রা এবং নভেম্বরের মহাসমাবেশ— তিন মাসের এই ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে আন্দোলনের চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে জোটটি।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দাবির সঙ্গে মানুষের নিত্যদিনের সংকটকে যুক্ত করে ১১ দল এবার আন্দোলনের নতুন পরিসর তৈরি করতে চাইছে। শেষ পর্যন্ত সেপ্টেম্বর-নভেম্বরের কর্মসূচি কতটা জনসম্পৃক্ত হয় এবং নভেম্বরে ঘোষিত ১০ লাখ মানুষের সমাবেশ কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।