Image description

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং দলটিকে চাপে রাখতে বিএনপির সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ছে হেফাজতে ইসলাম। একই সঙ্গে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা করছে সংগঠনটি।

 

জামায়াতের কিছু আকিদা বা বিশ্বাস ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন দাবিতে নানা সময়ে দলটির বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন হেফাজতের নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সম্পর্কে সংগঠনটির মনোভাব অনেকটাই ইতিবাচক।

 

এর ধারাবাহিকতায় রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজতের আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে হেফাজতকে আগের মতো বিএনপির সঙ্গে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

 

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত নির্বাচনের সময় আমরা একসঙ্গে থেকে কাজ করে দেশকে বিপদের হাত থেকে মুক্ত করেছি। আপনাদের যারা আছেন, সহকর্মীবৃন্দ, তারা কাজ করেছেন। ফলে আমরা দেশকে একটা বিপদ থেকে রক্ষা করতে পেরেছি।’

 

প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজত আমিরসহ সংগঠনটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠককে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কওমি আলেমদের একাংশ। তারেক রহমানের দেশপ্রেম, ইসলামপ্রীতি ও আলেমদের সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ককে সাধুবাদ জানাচ্ছেন তারা।

 

জামায়াতকে কোণঠাসা করতে গত নির্বাচনে বিএনপির পাশে ছিল হেফাজতে ইসলাম। এমনকি জামায়াতকে ভোট দেওয়া হারাম বলে মন্তব্য করেছিলেন আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।

 

জামায়াতের সঙ্গে মিলে যেসব ইসলামি দল ১১ দলীয় ঐক্য করেছিল, তাদেরও সমালোচনা করেছিলেন হেফাজত আমির। প্রকাশ্যে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিলেন তার সংগঠনের অনেক নেতা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটি বিএনপিকে বাড়তি সুবিধা এনে দেয়।

নির্বাচনের পরও আগের অবস্থান ধরে রাখে হেফাজত। গত ১৬ জুলাই সাতটি ইসলামি দলকে নিয়ে জোট গঠনের উদ্যোগ নেয় তারা। এর মধ্যে ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা দলও রয়েছে। মূলত জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে ইসলামপন্থিদের পৃথক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলাই এর উদ্দেশ্য।

 

এর মধ্যেই রোববার প্রধানমন্ত্রী বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান হেফাজতের আমির। আল্লামা শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরীকে বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া চান প্রধানমন্ত্রী।

 

এ সময় হেফাজতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মহান আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলামের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে সংসদে আইন পাস, শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার, কওমি সনদের স্বীকৃতির যথাযথ মূল্যায়নসহ ৯ দাবি তুলে ধরা হয়।

 

কওমি ঘরানার ইসলামি দলগুলো গত নির্বাচনে মূলত তিন ভাগ হয়ে অংশ নিয়েছে। বিএনপির সঙ্গে ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম আর জামায়াতের সঙ্গে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।

 

দলগুলোর বিভক্তির কারণে কওমি ধারার রাজনীতি অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এখন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি বাড়ানো এবং সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ের ওপর জোর দিচ্ছেন হেফাজতের নেতারা।

 

সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম স্বতন্ত্র ধারার অরাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ছিল না, এখনও নেই। ইসলামি দলগুলার ঐক্যের বিষয়ে হেফাজতের আমির সবসময় সোচ্চার ছিলেন, আছেন। ইসলামি দলগুলোর কেউ বিএনপি, কেউ জামায়াতের পক্ষে এবং কেউ স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছে। এ জন্য আমরা দুর্বল হয়ে পড়েছি। হেফাজতের আমির চান, ইসলামি শক্তিকে আগের মতো বলীয়ান করতে।’

 

কারও রাজনৈতিক জোট ভাঙা বা কাউকে ঘায়েল করা হেফাজতের উদ্দেশ্য নয় বলে জানান আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে ও পরে হেফাজত আমিরের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। এর অংশ হিসেবে দেখা করেছেন। হেফাজত তাকে সাধুবাদ জানিয়েছে। কাউকে কোণঠাসা করা আমাদের লক্ষ্য নয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার সঙ্গে হেফাজত ভালো সম্পর্ক রাখছে।’

ইসলাম ও দেশের জন্য কাজ যদি কারও কোণঠাসা হওয়ার কারণ হয়, এ জন্য হেফাজত দায়ী নয় বলে মনে করেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মীর ইদরীস। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হেফাজত রাজনৈতিক দল নয়। হেফাজতে ইসলাম, দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করে। ইসলাম ও দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে কার বিরুদ্ধে গেল, কে বেজার হলো, কোন দল কোণঠাসা হলো, সেটা আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়।’

 

জামায়াত কি চাপে পড়ছে?

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কওমি ধারার দলগুলো জোটগতভাবে ভোট করার উদ্যোগ নেয়। এ নিয়ে সমমনা ছয় ইসলামি দলের বৈঠক হয়। পরে জামায়াতকে নিয়ে নির্বাচনে আসন সমঝোতার মোর্চা গঠন করা হয়। একপর্যায়ে ‘আদর্শের দ্বন্দ্বের’ কথা বলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল থেকে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন।

 

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম নির্বাচনি সমঝোতা করে বিএনপির সঙ্গে। নির্বাচনের কিছু দিন আগে ১১ দল থেকে সরে একক প্রার্থী দেয় বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে আসন সমাঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি।

 

কিছু দিন আগে ঘোষণা দিয়ে ১১ দল থেকে সরে দাঁড়ায় খেলাফত মজলিস। বর্তমানে জামায়াতে সঙ্গে আছে শুধু বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি। হেফাজতের আমিরের ডাকে সাত দল এক হলে এ দুটি দলও জামায়াত থেকে বেরিয়ে যায় কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে।

 

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জোট ভাঙাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছেন। তবে তারা মনে করছেন, ১১ দল থেকে ইসলামি দলগুলোর বেরিয়ে যাওয়া জামায়াতের জন্য মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে। তাদের ওপর চাপ বাড়বে। কারণ, ভোটের মাঠে ইসলামি দলগুলোর প্রভাব রয়েছে।

 

বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘হেফাজত নিজেদের অরাজনৈতিক দল দাবি করে। নির্বাচনে একটি দলের পক্ষ নিয়ে নগ্নভাবে আরেকটি দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেছে।’

 

হেফাজত আমিরের উদ্যোগে কওমি ধারার সাত দলের জোট হলে জামায়াতের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘হেফাজত আমির তো ইসলামি সাত দলকে ধর্মীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন। এ ধরনের ঐক্য হলে জামায়াতের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না।’