অতীত অভিজ্ঞতা থেকে এবারও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন—এমনটি ধারণা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। তবে সংসদে বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট প্রার্থী ঘোষণা করায় ফের ভোটে গড়াচ্ছে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল রোববারই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে অনির্ধারিত বৈঠক করেছে ইসি। দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
ইসি সূত্র জানায়, গতকাল রোববার সিইসি কার্যালয় থেকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। তবে তারা কার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদিকে দলীয়ভাবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আবারও জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে।
দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা জানান, আগামী বুধবার দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। এ বিষয়ে মির্জা ফখরুলের বরাত দিয়ে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, মহাসচিবকে এ বিষয়ে অবহিত করার পর তিনি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে কিছু জানেন না। দলের পক্ষ থেকে উনাকে কিছু বলা হয়নি।
উল্লেখ্য যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। পাশাপাশি তিনি দলের মহাসচিব পদেও রয়েছেন। তিনি দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হলে একই সঙ্গে তিনটি খুব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শূন্যতা তৈরি হবে। সেগুলো হচ্ছে—বিএনপির মহাসচিব পদ, স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রী এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য।
এদিকে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য জোটের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নাম চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার বাসভবনে জোট শরিকদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ কথা জানান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে দ্বিতীয় বারের মতো নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেড় যুগের বেশি সময় পর বিএনপি ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। এখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব চাইবে এমন একজনকে রাষ্ট্রপতি করতে, যিনি রাষ্ট্রের সংকটময় মুহূর্তে শক্ত হাতে হাল ধরতে সক্ষম ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। কেননা, দেশের যে কোনো সংকটকালে রাষ্ট্রপতিকে অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। সেই বিবেচনায় মির্জা ফখরুলের নামটি সর্বাধিক আলোচিত হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) তপশিল অনুযায়ী, ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন হওয়ার কথা। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ইসি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি পদে একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার বিধান আছে। কারণ, একটি মনোনয়নপত্রে কোনো ভুলত্রুটি থাকলে যাতে অন্যটি বিবেচনায় নেওয়া যায়। সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও এমনটা করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন সংসদ সদস্যরা। সচরাচর ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। বিরোধী দল সাধারণত এ পদে প্রার্থী দেয় না। তাই ভোটাভুটির দরকার হয় না। তবে এবার জাতীয় সংসদের বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট হয়েছিল। এরপর সব নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন। গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের পর বিগত কয়েকটির নির্বাচনের মতো এবারও সরকার দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হবে—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছিল রাজনৈতিক মহলে। ইসির প্রস্তুতিও তেমনটি ছিল বলে সূত্র জানায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেয় জামায়াত জোট। গতকাল রোববার জোটের বৈঠকে প্রার্থীও চূড়ান্ত করা হয়। অন্যদিকে প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করলেও ইসি থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি।
বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্য ২৫০ জন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ জন। ৮ জন স্বতন্ত্র এবং ইসলামী আন্দোলনের একজন এমপি রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি পদে বিজয়ের জন্য ১৭৬ ভোট প্রয়োজন। আর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে সংসদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা বিএনপি প্রার্থীই বিজয়ী হবেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন তা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। সম্প্রতি এক বৈঠকে এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে চূড়ান্ত প্রার্থী বাছাইয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামটিই বেশি আলোচিত হচ্ছে। স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য আলাপকালে জানান, মির্জা ফখরুলকেই বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হবে, যা আগামী বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগও রাষ্ট্রপতি পদে দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিল। সদ্য পদত্যাগকারী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নামে দুটি মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে একটি বৈধ হলে অন্যটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। একজনের একাধিক মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার সুযোগ আছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের জন্য জামানত দিতে হয় না।
জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পছন্দের বহু কারণ রয়েছে। কেননা, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের কঠিন সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলের বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালনে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তার সুচিন্তিত বক্তব্য ও শান্ত রাজনৈতিক কৌশল দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক মহলে তাকে একটি বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। এ ছাড়া দেশের ভেতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তার সমন্বয়ক ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে মির্জা ফখরুলের ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা তাকে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক অভিভাবকের পদে সম্ভাব্য বিবেচনায় শীর্ষ সারিতে রেখেছে।
তাছাড়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি করার যৌক্তিকতা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। তার মধ্যে অন্যতম তিনটি কারণে এগিয়ে আছেন তিনি। জানা গেছে, মির্জা ফখরুলের প্রত্যাশা ছিল— (১) ফ্যাসিবাদ আমলে নির্যাতনের শিকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি, (২) বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন এবং (৩) একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া। এসবের তিনটিই প্রত্যক্ষ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আলংকারিক ও মর্যাদাপূর্ণ পদ ‘রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আসাটা সর্বমহলেই প্রত্যাশিত। এর পেছনে মূলত তার রাজনৈতিক ত্যাগ, পরিচ্ছন্ন ইমেজ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপিতে বিশ্বস্ততা ও দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে মির্জা ফখরুল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন ‘সাদামাটা ও সজ্জন’ রাজনীতিবিদ হিসেবে সমধিক পরিচিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আজ পর্যন্ত মেলেনি। শুধু তা-ই নয়, রাজনৈতিক বিতর্কে শালীনতা বজায় রাখা এবং মার্জিত আচরণের জন্য তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছেও সমানভাবে শ্রদ্ধেয়। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএনপির চরম দুঃসময়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন মির্জা ফখরুল। শত শত মামলা, হামলা ও কারাবরণ সত্ত্বেও জিয়া পরিবারের প্রতি তার অবিচল আনুগত্য এবং সাংগঠনিক কর্মতৎপরতা তাকে নেতাকর্মীদের কাছে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এসব কারণে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে তাকে একজন যোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক নেতাকর্মী ও সমর্থক।
১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রয়েছে বর্ণাঢ্য পারিবারিক ইতিহাস। তার বাবা মরহুম রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন কৃষি প্রতিমন্ত্রী। তার বড় চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ১৯৭৮ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন।