‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ এবং আহত হয়েছেন, তারা জাতির গর্ব। তাদের আত্মত্যাগের কারণে বাংলাদেশ একটি নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়েছে। রাষ্ট্র তাদের কাছে চিরঋণী থাকবে’, আজ শনিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের স্মরণে আয়োজিত এক স্মরণসভায় এসব কথা বলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
জুলাই কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয় মন্তব্য করে ইশরাক বললেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি সার্বজনীন আন্দোলন। এ আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। তাই কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের এ আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করার সুযোগ নেই। জুলাই গণঅভ্যুত্থান কারো পৈতৃক সম্পত্তি নয়। আপনারা জুলাইকে বিক্রি করবেন না। জুলাই সার্বজনীন আন্দোলন ছিল, সেটিকে সেভাবেই রাখতে হবে। জুলাইয়ের সব শহীদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে, বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।’
‘আন্দোলনে বিএনপির পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন। তাদেরও অনেকে শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন। তাই এ আন্দোলনের ইতিহাস কোনোভাবেই এককভাবে দাবি করা উচিত নয়। ৭১-এর ইতিহাস যেন আমরা বিকৃত না করি, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও যেন বিকৃত না করি।’
আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও চিকিৎসার বিষয়ে জোর দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। ‘আহত, অঙ্গহানি হওয়া, দৃষ্টিশক্তি হারানো, চোখে গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্যও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আহত জুলাই যোদ্ধাদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে পুনর্বাসন ও ভাতা দেওয়ার কার্যক্রম চলছে। দেশের সরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, রাশিয়া ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে গুরুতর আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে। বিদেশে এখনো অনেকের চিকিৎসা চলছে।’
শহীদ পরিবারের বিষয়ে তিনি জানান, শহীদ পরিবারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এককালীন ৩০ লাখ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানসহ বৈধ উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ওই অর্থ বণ্টন করা হয়েছে। নতুন অর্থবছরেও শহীদ এবং গুরুতর আহত ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণ করা জুলাই যোদ্ধাদের জন্য বিনামূল্যে আবাসনের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তার ভাষ্য, আহত জুলাই যোদ্ধাদের শুধু সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখতে চায় না সরকার। তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কেউ ছোট ব্যবসা করতে পারবেন, কেউ খামার করতে পারবেন, আবার যারা শারীরিকভাবে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন কিন্তু অন্য সক্ষমতা রয়েছে, তাদের ডেস্ক জবের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ লক্ষ্যে ১৭টি মন্ত্রণালয়কে সমন্বয় করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীতে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের দাবির প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন জানাচ্ছিলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ী ছিল আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট। এখানে অনেক মানুষ আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং অনেকে শহীদ হয়েছেন। তাদের স্মৃতি ধরে রাখতে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের যে দাবি উঠেছে, তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। আমি বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী অতি শিগগিরই অনুমোদন দেবেন।
গত ৫ আগস্ট একটি জাতীয় অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় সমালোচনাও করেন তিনি। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে জানিয়ে বলছিলেন, বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। কোনো বক্তব্য বা অভিযোগ থাকলে যোগাযোগের অনেক পদ্ধতি ছিল। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।
তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন কোনোভাবেই যেন হিংসা, প্রতিহিংসা বা বিভাজনের রাজনীতির কারণে ব্যাহত না হয়। ভবিষ্যতে যেন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ জনগণের ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এতে আরও বক্তব্য রাখেন, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক নবী উল্লাহ নবী। অনুষ্ঠানে যাত্রাবাড়ী এলাকার বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য, আহত জুলাই যোদ্ধা এবং স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।