বিএনপির ভাগ কত, এনসিপির ভাগ কত, জামায়াতে ইসলামীর ভাগ কত—এভাবেই জুলাইয়ের ‘স্টেক’ ভাগাভাগি হয়েছে, হচ্ছে বলে মনে করেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর খালি হাতে ঘরে ফিরে গেছেন—এমন পাঁচ শতাধিক ‘বিপ্লবীকে’ নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক মেসেঞ্জারে কৃতজ্ঞতার বার্তা পাঠিয়েছেন। নাহিদ ইসলামের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে নাহিদ ইসলাম ব্যক্তিগতভাবে এসব বার্তা পাঠিয়েছেন। যাঁদের বার্তা দিয়েছেন, সেই বার্তায় তিনি তাঁদের প্রত্যেককে ‘এক দফার আসল ঘোষক ও জুলাইয়ের আসল মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বার্তায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জুলাইয়ে ভূমিকার কথাও স্মরণ করা রয়েছে। নাহিদ ইসলামের এমন বার্তার বিষয়টি ফেসবুকে আলোচনা তৈরি করেছে।
বার্তা পাঠানো শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ‘বেশ কিছুদিন ধরেই একটা জিনিস ভাবছিলাম। জুলাইয়ে আমার জন্য দোয়া করেছিল, আমার জন্য স্ট্যাটাস দিয়েছিল, আমার মুক্তির জন্য গান গেয়েছিল, ছবি এঁকেছিল এমন অনেক মানুষ, যাদেরকে আমি চিনি না। রাস্তায় পানির বোতল এগিয়ে দেয়া খুদে ব্যবসায়ী, আহতদের হাসপাতালে নেওয়া রিকশা-ভ্যান চালক, পুলিশের চোখ এড়িয়ে হাসপাতালে আহত ভাইদের চিকিৎসা দেওয়া ডাক্তার, এমন অনেক মানুষ যাদের আমি চিনি না। যেই ছেলেটা প্লেস্টেশন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির বাইরে কিছু বোঝে না, যে মেয়েটার জীবন কিয়োশি থেকে ক্রিমসন কাপ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, যারা কখনো সরকারি চাকরি করার কথাই ভাবেনি, বিএএফ শাহীন কলেজের যেই শহীদ আহনাফের ছাত্র রাজনীতি করারও বয়স হয় নাই, সেই ছেলেমেয়েরা জুলাইয়ে আবাবিল পাখির মত নেমে এসে আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছে।’

কিন্তু জুলাইয়ের পর তাঁদের বেশির ভাগই ঘরে ফিরে গেছেন বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তাঁদের সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘তারা কোন রাজনৈতিক দলেই নাই। জুলাইকে আমরা রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভাগবটোয়ারা করে ফেলেছি। বিএনপির ভাগ কত, এনসিপির ভাগ কত, জামাতের ভাগ কত—এভাবেই জুলাইয়ের স্টেক ভাগাভাগি হয়েছে এবং হচ্ছে।’
নাহিদ ইসলাম আরও লিখেছেন, ‘কিন্তু জুলাই তো শুধু রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ছিল না। জুলাই ছিল সর্বস্তরের সব মানুষের। এপলিটিকাল জনগোষ্ঠীর। আই হেট পলিটিক্স জনগোষ্ঠীর। সুইং ভোটার জনগোষ্ঠীর। সবার। তাদের অংশগ্রহণ ছাড়া জুলাই কখনো সফল হতো না।
‘অথচ কাউকেই এখন আর মিছিল-মিটিঙে পাওয়া যায় না। সভা-সেমিনারে পাওয়া যায় না। কোন সংবর্ধনার আয়োজন করলেও তারা আসেন না। তারা ঘরেই থাকেন।’
জুলাইয়ের পর একদম খালি হাতে ঘরে ফিরে যাওয়া এই মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য কী করা যায়, সেই ভাবনা থেকেই গত দুই দিন যতটা সম্ভব কৃতজ্ঞতা বার্তা পাঠিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম।
নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, অনেকেই হয়তো তাঁর সেই মেসেজ (বার্তা) পেয়েছেন। আবার অনেকেই স্প্যাম ফোল্ডারে মেসেজটা চলে যাওয়ার জন্য হয়তো খেয়াল করেননি। আবার অনেকের মেসেজ অপশন বন্ধ থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মেসেজ করতে পারেননি। তাঁর ইচ্ছা, বাংলাদেশের ষোলো কোটি বিপ্লবীকেই টেক্সট করা, তাঁদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করা, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। কিন্তু মানবিক সীমার কারণে চাইলেও সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা সংগত কারণেই সম্ভব নয়। তিনি এ জন্য সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
নাহিদ ইসলামের বার্তা যাঁরা পাননি, তাঁদের সবার প্রতি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন। নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ‘কিন্তু নিশ্চিত থাকুন, আমি আপনাদের ভুলে যাই নাই।’
জুলাইয়ের পর বহু স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি বলে উল্লেখ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি লিখেছেন, ‘আপনাদের প্রত্যাশার পরিবর্তনও এখনো অনেক দূরে। আমি স্বীকার করছি, আমাদের প্রচেষ্টার সীমাবদ্ধতা ছিল। তবে বিশ্বাস করুন, আমরা চেষ্টা করেছি। বহুপক্ষীয় বাধার কারণে অনেক কিছুই অর্জন করতে পারিনি। আমরা আমৃত্যু নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম জারি রাখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন।’
নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ‘আপনাদের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাধ্যমতো চেষ্টা করুন। দেশ-জাতির যেকোনো প্রয়োজনে আপনারা আবারও সরব হবেন। জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখবেন।’
নাহিদের বার্তা পাওয়া অনেকেই ফেসবুকে সেই বার্তার স্ক্রিনশট পোস্ট করে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (পুনাব) সহসভাপতি লাবিব মুহাম্মদও আছেন। বার্তার স্ক্রিনশট পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘নাহিদ ইসলাম ভাই আমি লিটারেলি কানতেছি।’