Image description

জুলাই বিপ্লবের দুবছর পরও কুমিল্লায় শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশিত বিচার, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি, শহীদ পরিবারের অবমূল্যায়ন, আহতদের চিকিৎসা সংকট এবং জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগের অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধারা। তাদের দাবি, জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি কুমিল্লায় একটি ‘জুলাই জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা করে বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে হবে।

জুলাই বিপ্লবে জেলার বিভিন্ন স্থানে ৪০ জন শহীদ হন। সরকারি গেজেটভুক্ত আহত জুলাইযোদ্ধার সংখ্যা ৫৬৬। তবে শহীদ ও আহতদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, দুবছর পেরিয়ে গেলেও তারা কাঙ্ক্ষিত সম্মান, চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তা পাননি। অনেক পরিবার এখনো চিকিৎসা ব্যয় ও দৈনন্দিন জীবনের খরচ বহনে হিমশিম খাচ্ছে। একইসঙ্গে প্রকৃত জুলাইযোদ্ধাদের মূল্যায়নের পরিবর্তে সুযোগসন্ধানী কিছু ব্যক্তি বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে কুমিল্লার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা এতে যোগ দেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সিসিএন ইউনিভার্সিটি, সরকারি কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ ও কুমিল্লা জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ জায়গা থেকে আন্দোলনে যোগ দেন।

আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি বিশ্বরোডে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের পর দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ দিনটিকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয়ভাবে ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হলেও কুমিল্লায় ১১ জুলাই দিনটি বিশেষভাবে পালন করা হয়।

এরপর ৩ আগস্ট কুমিল্লায় ছাত্র-জনতার ওপর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ ব্যাপক হামলা চালায়। এতে কুমিল্লাজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরদিন ৪ আগস্টও জেলায় ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

শহীদ পরিবার ও আহত জুলাইযোদ্ধাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তাদের কেবল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে রাখা হয়। যথাযথ সম্মান তো দূরের কথা, অনেক সময় বসার চেয়ার পর্যন্ত পান না তারা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুমিল্লা মহানগরের আহ্বায়ক আবু রায়হান বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা কোনো রাজনৈতিক প্রদর্শনীর বস্তু নন। তাদের ছবি তুলে প্রচার চালানোর পরিবর্তে সারা বছর চিকিৎসা, শিক্ষা ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আহতদের উন্নত চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

 

জুলাই জাদুঘরের দাবি

জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য কুমিল্লায় একটি ‘জুলাই জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

শহীদ হামিদুর রহমান সাদমানের মা কাজী শারমিন আক্তার আমার দেশকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস সংরক্ষণে কুমিল্লায় একটি জুলাই জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে। পাশাপাশি আহত জুলাইযোদ্ধাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে অনেকেই কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন না।’

অন্যদিকে শহীদ মাসুমের বাবা শাহীন মিয়া তার ছেলের স্মৃতি ধরে রাখতে কুমিল্লা শহরের একটি সড়ক শহীদ মাসুমের নামে নামকরণের দাবি জানিয়েছেন।

 

৪২টির মধ্যে দুই মামলার চার্জশিট

জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতা হত্যা, মিছিলে হামলা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় মোট ৪২টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ১২টি হত্যা এবং ৩০টি হামলা, অগ্নিসংযোগ, অস্ত্র ও হত্যাচেষ্টার মামলা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও মাত্র দুটি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে পেরেছে পুলিশ।

বাকি ৪০ মামলার তদন্ত এখনো চলমান।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কোতোয়ালি মডেল থানায় ১৮টি, সদর দক্ষিণে ছয়টি, দাউদকান্দিতে চারটি, দেবিদ্বারে চারটি, বাঙ্গরা বাজারে দুটি এবং বরুড়া, নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, মনোহরগঞ্জ ও বুড়িচং থানায় একটি করে মামলা রয়েছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অধিকাংশ মামলায় বিপুলসংখ্যক আসামির নাম থাকায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিকে একাধিক ঘটনার আসামি করা হয়েছে এবং অনেক বাদী সব আসামিকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। ফলে সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করতে সময় লাগছে।

 

দ্রুত বিচার দাবি

বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, খুব দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দিতে হবে। যারা ছাত্র-জনতার ওপর নৃশংস হামলা চালিয়েছে, তাদের অনেকেই এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মামলাগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, চলতি আগস্ট মাসেই আরো কয়েকটি মামলার চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে।

দুবছর পেরিয়ে গেলেও বিচার, পুনর্বাসন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা কুমিল্লার শহীদ পরিবারগুলোর একটাই দাবি—জুলাই বিপ্লবের আত্মত্যাগ যেন কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং দ্রুত বিচার, যথাযথ সম্মান ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের ত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হোক।