Image description

‘আমার প্রশ্ন আপনার (এসপি) কাছে, আপনাদের গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন কী করে? আপনি গাজীপুর জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। আমাদেরই যদি সব তথ্য আপনাদের দিতে হয়, তাহলে আপনাদের দরকার নেই। আপনার গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কাজ কী? মাদকের সঙ্গে কারা জড়িত, আপনাদের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যদের মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করুন। আমাদের দলের নেতাকর্মীরাও যদি জড়িত থাকে, তাদের গ্রেফতার করুন। উপজেলা বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা যদি মাদক কারবারি বা ব্যবসায়ীদের পক্ষে তদবির করে, আমরা সম্মিলিতভাবে তাদেরও অবাঞ্ছিত ঘোষণা করবো।’

রবিবার (২ আগস্ট) বিকাল সাড়ে ৪টায় গাজীপুরের শ্রীপুর থানা ভবন প্রাঙ্গণে সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপারকে উদ্দেশ করে এসব কথা বলেন শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আক্তারুজ্জামান শামীম।

তিনি বলেন, ‘প্রায় ১৫-২০ দিন আগে পাশের ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলা থেকে কয়েকজন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এসে বরমী ইউনিয়নের গাড়ারন গ্রামে মিছিল করে। পরে আমি এবং দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ওই মিছিল থেকে ছয়জনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিই। এই ঘটনায় আমাদের বরমী ইউনিয়নের আরও ৭ থেকে ৮ জনকে চিহ্নিত করে নাম-ঠিকানা দিলেও পুলিশ ধরছে না। আপনাদের কাছে জবাব চাই, কেন তাদের ধরা হলো না। আমরা সাধারণ মানুষ যদি ছয়জনকে ধরে দিতে পারি, তাহলে আজ পর্যন্ত বরমী ইউনিয়ন এলাকা থেকে একজন আসামিকেও কেন গ্রেফতার করা হয়নি? আমরা নাম দিয়েছি, কিন্তু একজনকেও পুলিশ গ্রেফতার করেনি। ওইসব লোকজন বিকেলে এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। এরাই এলাকার মাদকের মদদদাতা। বিগত ১৭ বছরের জঞ্জাল আমরা ছয় মাসে শেষ করতে পারবো না।’

এসময় কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আতাব উদ্দিন আতা বলেন, ‘সমস্যা এক জায়গায়। পুলিশ আর জনগণ আমরা বন্ধু হতে পারিনি। তার কারণে সন্ত্রাস ও মাদক বেচাকেনা চলছে। যতক্ষণ পর্যন্ত পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করবে, মাদক ততদিন থাকবে। সুতরাং, আমার মতো নেতা এবং আপনাদের মতো পুলিশ—এই দুইয়ের সমন্বয়েই আজ মাদক বেচাকেনা চলছে। যদি প্রমাণ চান, আমি প্রমাণ দেব। আপনার শ্রীপুর থানার দুই-একজন উপপরিদর্শক (এসআই) আছেন, তারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা নেন। তারা সন্ত্রাস পালন করে—আমার মতো নেতা এবং আপনাদের মতো পুলিশ। তবে বর্তমান ওসি সাহেব আসার পর মাদক বেচাকেনা কিছুটা কমেছে। যারা খেটে খাওয়া মানুষ, তারা সন্ত্রাস করে না। সন্ত্রাস করে নেতারা এবং প্রশাসনের লোকেরা। সুতরাং, আপনারা যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের বন্ধু না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত এলাকা মাদকমুক্ত হবে না।’

এ সময় সভায় কয়েকজন অভিযোগ করেন, মাদক কারবারিদের বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই তথ্য মাদক কারবারিদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে অনেক সময় অভিযুক্তদের আটক করতে পারে না।

 

সন্ত্রাস ও মাদকবিরোধী মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আমি অভিযোগ শুনতে আসিনি, আপনাদের কাছে অভিযোগ দিতে এসেছি। সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শ্রীপুর থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আমাকে নিয়মিতভাবে ভাবতে হচ্ছে। আপনাদের শ্রীপুর থানা নিয়ে আমার ঘুম হারাম। জেলার অন্য কোনো থানা নিয়ে আমার এত পেরেশানি নেই। অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের উদ্দেশে পুলিশ সুপার বলেন, ‘আপনারা কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, থানায় এসে তদবির করেননি?’ তিনি অপরাধীদের পক্ষে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক তদবির না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আগে নিজের ঘর থেকেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত কেউ সন্ত্রাস ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। পুলিশের একার পক্ষে সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত শ্রীপুর গড়া সম্ভব হবে না।’

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনূর আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন শ্রীপুর পৌর বিএনপির সদস্য সচিব বিল্লাল হোসেন বেপারী, যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আহসান কবির, শ্রীপুর পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মামুন আকন এবং সাংবাদিক রাতুল মণ্ডল। শ্রীপুর থানা পুলিশের আয়োজনে সভায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।