কয়েক মিনিটের একটি দৃশ্য যেন গোটা দেশের আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই একটি হুডি পরে পুলিশের চলন্ত বাসের সামনে একা দাঁড়িয়ে রয়েছেন এক তরুণী। বাসের ভেতরে আটক আন্দোলকারী ছাত্রছাত্রীরা আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণী সরতে রাজি নন। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুব দ্রুতই আন্দোলনের সাহসী মুখ থেকে তিনি পরিণত হন কুৎসা, ট্রোলিং, চরিত্রহনন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে।
তিনি রিয়া আহির, মুম্বইয়ের ২৭ বছরের এক মডেল ও অভিনেত্রী। নিট প্রশ্নফাঁস বিতর্ক ঘিরে ককরোচ জনতা পার্টি-এর ডাকে দেশজুড়ে যে ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং ২০ জুলাই দিল্লির জন্তর মন্তরে যে বিক্ষোভ তৈরি হয়, সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন রিয়া। তবে শুধু রিয়াই নন। দিল্লি, মুম্বাই, আসাম, কলকাতাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু ছাত্রী, আইনজীবী, গৃহবধূ, চাকরিজীবী একই অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। তাদের অভিযোগ, আন্দোলন থেমে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে তাদের ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বিকৃত ছবি বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। আবার কোথাও কোথাও তাদের চিহ্নিত করে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর আহ্বানও ছড়ানো হয়।
রিয়ার আহির এর দাবি, গত ২২ জুলাই তিনি মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে আন্দোলনে যোগ দিতে যান। শিবাজি পার্কে পৌঁছে তিনি দেখেন যে পুলিশি বাসে বহু ছাত্রছাত্রীকে আটক করে রাখা হয়েছে। রিয়ার কথায়,তিনি দুই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে জানতে চান যে আটক রাখার কোনও লিখিত নির্দেশ রয়েছে কিনা। কিন্তু কোন পুলিশ কর্মকর্তাই স্পষ্ট জবাব দেননি।
ফলে বাসটি চলতে শুরু করলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন সামনে দাঁড়ানোর। রিয়ার ভাষায়,আমি যদি কিছু না করতাম, তাহলে সারা জীবন নিজের কাছেই অপরাধী হয়ে থাকতাম। নাগরিক হিসেবে আমি একজন ব্যর্থ নাগরিক ব্যর্থ হতাম। আমাকে যদি চাপা দিয়েও দিত, তবু আমি সরতাম না। সেই মুহুর্তে সেটাই হয়তো আমার জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে থাকত। যদিও এই ঘটনার আগেও তিনি সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট এবং জাতিসংঘের দপ্তরে ইমেল করে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু ঘটনার শুরু এখানেই, ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু। সামাজিক মাধ্যমে তার বিকৃত ছবি ছড়ানো হয়। এমনকি তিনি আপত্তিকর কনটেন্ট বিক্রি করেন - এমন মিথ্যা প্রচারও চালানো হয়। কটাক্ষের শিকার হন তার পরিবারের লোকজনও। এই ঘটনায় তিনি থানায় হেনস্তা ও মানহানির অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিষয়টি মহারাষ্ট্র সাইবার পুলিশও দেখছে বলে জানা যায়। মুম্বাই পুলিশের ডেপুটি কমিশনার দত্তা নালাওয়াড়ে জানিয়েছেন, অভিযোগটি গ্রহণ করে তদন্তের জন্য আন্ধেরি পূর্বের এমআইডিসি থানায় পাঠানো হয়েছে।
একই ছবি দেখা গেছে কলকাতাতেও। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্রী সুতিথি জানান, ২০ জুলাই জন্তর মন্তরের অভিযানের পরে এবং বিশেষ করে ২৪ জুলাই শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মিছিলে বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নেন। ষাটোর্ধ্ব নারীদেরও মিছিলে দীর্ঘ পথ হাঁটতে দেখা যায়। সুতিথির মতে এই প্রজন্মের ছাত্রীদের বিশেষত্ব শুধু সংখ্যায় নয়। আন্দোলনের যুক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার কথায়, যখন কোনও আন্দোলনের মূল দাবিকে খণ্ডন করা যায় না, তখনই নারীদের চরিত্র, পোশাক, ভাষা - এসবকেই আক্রমণের অস্ত্র বানানো হয়। পিতৃতন্ত্র তখন সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
মুম্বইয়েরই আর এক আন্দোলনকারী করিশ্মা কোদাজি, যিনি ১৮ জুলাই থেকে টানা তিনদিন আন্দোলনে অংশ নেন। তিনি বলেছেন, নারী হওয়ার কারণে আন্দোলনস্থলে তিনি নিজেকে অনিরাপদ মনে করেননি। তার মতে, সবচেয়ে বড় ভয় ছিল পুলিশের বলপ্রয়োগ। তবে আন্দোলনের পরে নারী অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, নোংরা ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন হেনস্তা ও অপমান তাকে বিস্মিত করেনি। তার কথায়, ভারতে এটাই বাস্তব।
তবে তিনি লক্ষ্য করেছেন , বহু নারী আন্দোলনকারী এই কুৎসার জবাব দিয়েছেন দৃঢ়তার সঙ্গে। তারা ভয় না পেয়ে আন্দোলনের বার্তাই আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। করিশ্মার দাবি, কয়েকজন নারী পুলিশকর্মী ব্যক্তিগতভাবে তাদের ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন। কারণ নিজেদের চাকরির কারণে তারা নিজেরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারেননি।
অন্যদিকে শুধু অনলাইন আক্রমণই নয়, আন্দোলনের সময় নজরদারি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফেমিনিজম ইন ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জন্তর মন্তরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক জেনএনইউ এর ছাত্রী পরিবারের ভয়ে ক্যামেরা এড়িয়ে চলছিলেন। আইআইটি দিল্লি ও আইআইটি মাদ্রাজ এর কয়েকজন ছাত্রীরও আশঙ্কা ছিল যে, এই ভিডিও ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার হতে পারে। এমনকি কয়েকজন পুলিশের চোখে মুখ শনাক্তকারী প্রযুক্তিযুক্ত স্মার্ট গ্লাসও দেখা গিয়েছিল।
এদিকে, প্রাক্তন জেনএনইউ ছাত্র সংগঠন এর সভাপতি ঐশি ঘোষ দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে অভিযোগ করেছেন, জন্তর মন্তরে স্থায়ী নজরদারি টাওয়ার বসিয়ে নারী আন্দোলনকারীদের লাগাতার ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে যে, আন্দোলনকারীদের ছবি তাদের পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে ২৩ জুলাই ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে আউটলুক ইন্ডিয়া জানায়, দিল্লি পুলিশ মুখ শনাক্তকারী প্রযুক্তিসম্পন্ন এ আই চালিত নজরদারি যান ব্যবহার করেছিল। যদিও সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা হাইকোর্টে জানান, এগুলি শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়েছে, নজরদারির উদ্দেশ্যে নয়।
এমনকি ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী একাধিক সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট নারী আন্দোলনকারীদের অসংস্কৃত বা ভারতীয় মূল্যবোধবিরোধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করে। অথচ একই ধরনের স্লোগান পুরুষ আন্দোলনকারীরাও দিয়েছিলেন। অলট নিউজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ জুবায়ের বলেছেন, শাহিন বাগ ও কৃষক আন্দোলনের সময়ও একই কৌশল দেখা গিয়েছিল। বিকৃত ছবি, বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং বিশেষ করে নারী আন্দোলনকারীদের চরিত্রহননের চেষ্টা। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট সরানোর নোটিস দিলেও, আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু নারী এখনও অনলাইন টার্গেটিং ও ব্যক্তিগত আক্রমণের মুখে রয়েছেন।