বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি’র ভূমিধস বিজয় এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে নিয়েছে ভারত সরকার। দেশটি এটিকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। তবে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে দিল্লি সরকার।
বৃহস্পতিবার (৩০শে জুলাই) ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটি এক প্রতিবেদনে এমন মূল্যায়ন করেছে।
টাইমস অব ইন্ডিয়াসহ ভারতের একাধিক মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, লোকসভা ও রাজ্যসভায় ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে করা কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন লোকসভার বিরোধী দল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শশী থারুর।
এতে ঢাকার নবনির্বাচিত সরকার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভারত পরিমিত ও হিসাবনিকাশভিত্তিক অ-হস্তক্ষেপ নীতি অনুসরণ করে।
তবে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি ভারত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে।
নির্বাচনে জয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে টেলিফোনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা।
তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি ব্যক্তিগত শুভেচ্ছা বার্তাও হস্তান্তর করেন এবং সুবিধাজনক সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বৃহস্পতিবার ভারতের সংসদীয় কমিটি দিল্লি সরকারের এমন পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে।
এ নিয়ে তারা বলেছে, বাংলাদেশের নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে এবং অমীমাংসিত বিষয়গুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমাধান করার জন্য এটি একটি দারুণ সুযোগ।
এ ছাড়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থানের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এনিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান ‘মানবিক বিবেচনা ও ভারতের দীর্ঘদিনের আশ্রয়দান নীতির’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তাকে ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।
ভারতের মূলনীতি হলো নিজেদের ভূখণ্ডকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক কাজের জন্য ব্যবহার করতে না দেয়া।
এ ছাড়া শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেয়ার বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের বিষয়ে এদিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটিকে বলেছে, ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন ও প্রতিষ্ঠিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী অনুরোধটি পর্যালোচনা করছে।
পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যুতে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ ও বিজিবি’র মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ টহল জোরদার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি ও আগস্টে দুই বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে দিল্লির সংসদীয় কমিটি বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান ‘অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত’ সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মোংলা বন্দরের উন্নয়নে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
এ ছাড়া ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি চীনের সহায়তায় উন্নত করা হচ্ছে, যা ভারতের কৌশলগত শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য একটি বড় শঙ্কার কারণ। পাশাপাশি পেকুয়ায় চীনের সহায়তায় নির্মিত সাবমেরিন ঘাঁটি নিয়ে উদ্বেগের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটি দিল্লি সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে যে, তারা যেন বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির কার্যকলাপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভারতের অবস্থান আরও দৃঢ় করার তাগিদও দিয়েছে কমিটি।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরই শেষ হতে যাচ্ছে তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে এ চুক্তির নবায়নকে দুই দেশের ‘অন্যতম অগ্রাধিকার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বলা হয়, চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতি হিসেবে ভারতের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিতে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
কমিটি গঙ্গা চুক্তির অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে শিগগিরই এ বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয় প্রতিবেদনে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা তিস্তা চুক্তির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সরকার তাদের সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোর (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ) সঙ্গে আলোচনা করে এমন একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় যা সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রমকে দুই দেশের সম্পর্কের ‘অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে কমিটি। ২০২৪ সালের আগস্টের পর নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের ভিসা কেন্দ্রগুলো থেকে ভারতীয় কর্মীদের প্রত্যাহার করে নেয়ায় ভিসা কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে বলে কমিটিকে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের পাঁচটি ভিসা কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার ভিসা দেয়া হচ্ছে, যার প্রায় ৮০ শতাংশই চিকিৎসা সংক্রান্ত। কমিটি বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে সীমিত পরিসরে ভিসা কার্যক্রম চালু থাকায় দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালুর সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ওদিকে ভারতের লাইন অব ক্রেডিটের আওতায় বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও পর্যবেক্ষণ দিয়েছে কমিটি।
২০২৫ সালের ৫-৬ই মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২৩তম এলওসি পর্যালোচনা বৈঠকে উভয় পক্ষের সম্মতিতে প্রাক্-বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকা ১২টি প্রকল্প বাতিল হওয়ার কথা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পগুলোর মধ্যে আটটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কমিটির মতে, উন্নয়ন সহযোগিতার প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা গেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনাকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেছে কমিটি।
এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৮ই মে পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর ২ হাজার ৪৪৬টি হামলার তথ্য কমিটির নজরে এসেছে। এ বিষয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করেছে।
কমিটির পর্যবেক্ষণ হলো, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে বাংলাদেশ সরকারের পদক্ষেপ অব্যাহত থাকা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয় স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির (সাফটা) আওতায় ভারতে অধিকাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা ভোগ করছে।
তবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এ সুবিধার অবসান ঘটতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির আলোচনা দ্রুত শেষ করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।