ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘিরে জামায়াতে ইসলামীর ব্যানারে যে রাজনৈতিক জোট গড়ে উঠেছিল, তা টেকসই হচ্ছে না। ভাঙনের বার্তা দিয়ে কদিন আগে বেরিয়ে গেছে খেলাফত মজলিস। এখন এ জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) চিন্তা করছে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপির ভেতরে চলছে জোটের রাজনীতির লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা। একই সঙ্গে কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিকল্প জোট গঠনের সম্ভাবনাও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দলটির একাধিক নেতার ভাষ্য, এনসিপির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য একটি বৃহৎ জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। তাদের মতে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে সে সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। বিপরীতে নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে সেখানে নেতৃত্বের জায়গায় থাকতে পারবে এনসিপি।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র আওতায় ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট এক জায়গায় আনার লক্ষ্য নিয়ে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে। পরে এনসিপি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হলে সেটি ১১-দলীয় জোটে রূপ নেয়। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচন শুরুর আগেই জোট ছাড়ে। এরপর জামায়াতের নেতৃত্বে বাকি দলগুলো নির্বাচন করলেও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে জোটের ভেতরে অস্বস্তি ক্রমেই প্রকাশ্যে আসতে থাকে।
গত ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিসের আনুষ্ঠানিক বিদায়ের পর সেই অস্বস্তি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন এনসিপিও নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করছে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে থাকা, নাকি নতুন রাজনৈতিক মেরূকরণে যুক্ত হওয়া— দুই বিষয়েই গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
দলের একাধিক সূত্র বলছে, কওমি ঘরানার ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে একসঙ্গে পথচলা এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সংস্কার, বিচার এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমন্বয়ের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। নতুন কোনো সমঝোতা হলে সেখানে এনসিপির ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘রাজনৈতিক পর্ষদের’ একজন সদস্য আগামীর সময়কে বলেছেন, কওমি ঘরানার কয়েকটি দলের সঙ্গে সংস্কার, বিচার ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে; কিংবা সেখান থেকে বেরিয়ে এলে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি কী হতে পারে, তাও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। জুলাইয়ের কর্মসূচি শেষ হলে দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
এনসিপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতার মতে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য ছিল মূলত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে একটি নির্বাচনী সমঝোতা। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে এনসিপি অন্তত ঢাকার একটি সিটিতে সমঝোতা চাইলেও জামায়াত এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। বরং দুই দলই আলাদাভাবে প্রার্থী নির্ধারণের পথে এগিয়েছে। ফলে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার মধ্যেই ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগ। কওমি ঘরানার দলগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্যে গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় সাতটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে সংগঠনটি। সেখানে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট এবং নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। হেফাজতের পক্ষ থেকেও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সিনিয়র নেতারা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিটি দলকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে লিখিতভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐক্যের রূপরেখা জানাতে বলা হয়েছে। এরপর নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের কাঠামো, নেতৃত্ব, কর্মসূচি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ভবিষ্যৎ জাতীয় নির্বাচনে সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
একাধিক সূত্র বলছে, এ উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে এনসিপিও। এরই মধ্যে দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কওমি ঘরানার কয়েকটি দলের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। সেখানে সংস্কার, বিচার ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এনসিপির নির্বাহী কমিটির এক সদস্য আগামীর সময়কে বললেন, কওমি দলগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শেষ হয়েছে। এখন সংস্কার ইস্যুতে তাদের অবস্থান পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিএনপির জোটে থাকা একাধিক ইসলামি দলের অবস্থানও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সম্প্রতি খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের সঙ্গে কথা বলেছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এর আগে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠক ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন জোটের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
যদিও আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন আলেম ও রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কোনো সমন্বয়ের বিষয় থাকলে সেটি হবে দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।
স্থানীয় সরকার নিয়ে ভিন্ন কৌশল
জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সবচেয়ে আগে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে এনসিপি। এরই মধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। পাশাপাশি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ে কাজ করছে দলের স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। দলীয় নেতাদের দাবি, ১০০টির বেশি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ১০০ প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে লড়বেন দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ঢাকা উত্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। এ ছাড়া কুমিল্লায় তারিকুল ইসলাম, রাজশাহীতে মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেটে আবদুর রহমান আফজালকে প্রার্থী করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ঘিরে। কারণ রাজধানীর দুই সিটিকেই রাজনৈতিক শক্তি যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে জামায়াত ও এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণে এরই মধ্যে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে (মো. আবু সাদিক) প্রাথমিকভাবে প্রার্থী করেছে জামায়াত। গত ২২ জুন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে তাকে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। এরপর ১৩ জুলাই ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব ছাড়েন তিনি। নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
অন্যদিকে এনসিপির ভেতরেও বিকল্প কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে। দলটির একটি দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বাস্তবায়িত হলে আগের ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। সেক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদকে ঢাকা উত্তর এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রার্থী করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। এর কারণ হিসেবে অভ্যন্তরীণ দলীয় জরিপে দেখা গেছে, উত্তর ঢাকার তরুণ ভোটারদের মধ্যে আসিফ মাহমুদের গ্রহণযোগ্যতা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচন করায় দক্ষিণাঞ্চলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর রাজনৈতিক পরিচিতি ও সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলে রাজধানীর দুই সিটিতেই প্রার্থী বিন্যাসে পরিবর্তন আসতে পারে বলে দলটির ভেতরে আলোচনা চলছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার আগামীর সময়কে বললেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা চলছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা জোটের পক্ষে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয়েছে। তারা আগ্রহ দেখিয়েছেন বলেও শুনতে পেয়েছি। তবে তারা নতুন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নই। আমরা আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে আমাদের প্রস্তাবনা হেফাজতে ইসলামের কাছে লিখিতভাবে জানাব।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের একটি অংশ মনে করছে, তাদের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে দলগুলোকে বের করে নেওয়ার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা বা দূরত্ব থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে ঐক্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছে বলে তাদের ধারণা। এনসিপির তৎপরতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এটি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতের এ নেতা বললেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয়ভাবে সমঝোতা হয়েছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সে সুযোগ নেই। কোথাও সমঝোতা হলে সেটি স্থানীয় পর্যায়ে হবে।’