Image description

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক ‘ট্যাগিং’ বা তকমা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ থেকে ছিটকে পড়ছেন, শিক্ষকদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে, সংগঠিত হয়রানির শিকার হচ্ছেন নারী আন্দোলনকারীরা।

‘ট্যাগিং’-এর নাম বদলালেও প্রয়োগের পদ্ধতি রয়ে গেছে আগের মতোই। কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক তদন্ত, প্রমাণ বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘আওয়ামী লীগপন্থী’, ‘জুলাই-বিরোধী’ বা রাজনৈতিকভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

অনেকের জন্য এ ধরনের ‘ট্যাগিং’ পাওয়ার অর্থ হলো ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়া, সহিংস হুমকির মুখে থাকা, পরীক্ষায় বসতে না পারা, পেশাগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং সাইবার বুলিং বা অনলাইন হয়রানির শিকার হওয়া।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় পঞ্চম স্থান অর্জন করেও ক্যাম্পাসে পা রাখতে পারছেন না এহসান আহমেদ আকাশ। অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিকভাবে ট্যাগিংয়ের শিকার হওয়ায় অনলাইনে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।

‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে আকাশ বলেন, ‘যদি কোনো অপকর্মের অভিযোগ থাকে, তবে আইনের অধীনে তদন্ত করা হোক। কিন্তু একটি অভিযোগও প্রমাণিত হওয়ার আগেই আমাদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী অর্ণব বৈরাগীর অবস্থাও একই রকম। গত ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন সরকার সমর্থক ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও সহিংস কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি। তা সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে তার ছবি ছড়িয়ে দিয়ে নিচে লিখে দেয়া হয়-‘হত্যার যোগ্য’।

অর্ণব আক্ষেপ করে প্রশ্ন করেন, ‘আমার কি আর পড়াশোনা করার অধিকার নেই?’

এই হুমকি কেবল অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নেই। গত সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী তিন শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আম্মারকে বেলচা হাতে এক শিক্ষার্থীকে তাড়া করতে দেখা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান এস এম এ ফায়েজ এই পরিস্থিতিকে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘একটি নতুন রাজনৈতিক পটভূমিতে শুরুতে কিছু ছোটখাটো সমস্যা বা বিশৃঙ্খলা হওয়াটাই স্বাভাবিক।’

তবে এই ব্যবস্থার অবসান চান জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজনীতিভিত্তিক তকমা দেয়া এবং সব ধরনের হয়রানিমুক্ত একটি ক্যাম্পাস চাই।’

অন্যদিকে জুলাই আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের যুক্তি দেন, বহিষ্কৃত অনেক শিক্ষার্থী তাদের আগের কর্মকাণ্ডের ভয়ে এবং সহপাঠীদের প্রত্যাখ্যানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিষিদ্ধ হওয়া ছাত্রলীগও একসময় তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শিক্ষা জীবন থেকে বাদ দিতে ঠিক একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করত।

এই ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিজ্ঞতার ফলে সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, ক্যাম্পাসের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ক্ষমতা পরিবর্তন হলেও ‘ট্যাগিং’ করার এই সংস্কৃতি বারবার ঘুরেফিরে আসছে।

তদন্তের স্থান দখল করছে তকমা

শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের জায়গা দখল করে নিচ্ছে রাজনৈতিক তকমা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলেও তার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার অধিকার থাকে।

তিনি সতর্ক করে দেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন থেকে বাদ দিলে একটি হতাশ ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে ক্যাম্পাস নিরাপত্তা ও সামগ্রিক সমাজের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কারও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া যায় না।

তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেয়া, পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেয়া কিংবা ছাত্রত্ব বাতিল করা একদমই উচিত নয়।’

সাংবাদিক মাসুদ কামাল বর্তমান আন্দোলনের নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘অন্যদের ওপর এখন যে মাপকাঠি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, বর্তমান আন্দোলনকারীরা নিজেরা কি সেই পরীক্ষায় টিকতে পারবেন? সমন্বয়ক সারজিস আলম একসময় বঙ্গবন্ধুকে প্রশংসা করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিলেন বলেই কি তাকেও ফ্যাসিবাদীদের সহযোগী তকমা দেয়া হবে?’

তিনি সতর্ক করে বলেন, লাগামহীন ট্যাগিং এবং রাজনৈতিক হয়রানি বা ‘উইচ-হান্ট’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক অশনি সংকেত।

লক্ষ্যবস্তু শিক্ষকরাও

শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকদের ওপরও রাজনৈতিক তকমা এঁটে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়া থেকে শুরু করে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

গত ১৯ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদী গুলিতে নিহত হওয়ার পর প্রতিবাদ চলাকালে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, ‘আওয়ামী লীগপন্থী’ শিক্ষকদের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বেঁধে রাখা হবে।

বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৮০ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ জন এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষক ক্যাম্পাসে আসতে পারেন না। এ ছাড়া জগন্নাথ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষককে ক্যাম্পাসে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়েছে।

গত ১৬ জুলাই ‘জুলাই ওয়ারিয়র্স’ নামের একটি দল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে জোরপূর্বক তার কক্ষ থেকে বের করে দেয়। জাতীয় ছাত্র শক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার প্রধান সংগঠক ফেরদৌস শেখ এই ঘটনার সমর্থনে বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে জুলাই-বিরোধী কোনো শিক্ষককে বরদাশত করব না।’

অনুরূপ অবস্থান নেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসুদ। তিনি বলেন, “ফ্যাসিস্টদের এখানে কোনো স্থান হবে না।”

তবে সমালোচকদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত ছাড়াই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিতে ‘জুলাই-বিরোধী’ বা ‘ফ্যাসিস্ট’-এর মতো নামগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অধ্যাপক মামুন শিক্ষকদের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের এই ধরনের আইন হাতে তুলে নেওয়ার সমালোচনা করে বলেন, ‘শিক্ষকদের তাড়া করা, অপমান করা বা জোরপূর্বক বের করে দেয়া শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয় এবং শিক্ষকতা পেশার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।’

মাসুদ কামালও রাজপথের এই ধরনের তকমাবাজির নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘নিজেদের অপকর্ম বা সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতে প্রতিনিয়ত মানুষকে ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করা কখনোই গণতন্ত্র হতে পারে না।’

চরিত্রহননের শিকার নারী কর্মীরা

জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা নারী আন্দোলনকারীরা এখন এক ভিন্নধর্মী ট্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছেন। চরিত্রহনন, সাইবার বুলিং এবং বাস্তব জীবনে হেনস্তার মাধ্যমে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ নির্বাচন চলাকালীন নারী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে দিতে এবং তাদের প্রভাব কমাতে অনলাইনে অপপ্রচার চালানো হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই সংগঠিত নারীদের অংশগ্রহণকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পেছনে ঠেলে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যখনই নীতি নির্ধারণে নারীদের ক্ষমতায়ন বা অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে এলো, তখনই সচেতনভাবে নারীদের অবস্থানকে প্রান্তিক করে ফেলা হলো।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক নারী আন্দোলনকারী জানান, নারী হওয়ার কারণেই মূলত তাদের রাজনৈতিক তকমা দেয়া হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘শুধু নারী হওয়ার কারণে আমাদের শরীরে রাজনৈতিক তকমা লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে, যা এই আন্দোলন বা অভ্যুত্থানের মূল চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’

এসব ঘটনা প্রমাণ করে, রাজনৈতিক ট্যাগিং এখন আর কেবল দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং সমাজে নারীর নৈতিকতা, আনুগত্য এবং তাদের জনপরিসরে অংশগ্রহণকে প্রশ্নবিদ্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে এটি ব্যবহার হচ্ছে।

যে সংস্কৃতি ভাঙা কঠিন

রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং সক্রিয় আন্দোলনকারীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এই ট্যাগিংয়ের বিষাক্ত সংস্কৃতি থেকে বের করে আনার তাগিদ দিচ্ছেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম প্রধান সংগঠক ও সংসদ সদস্য মাহমুদা মিতু বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো এই ‘তকমাবাজির নোংরা সংস্কৃতি’ থেকে বেরিয়ে আসা।

অধ্যাপক মামুন সতর্ক করে বলেন, প্রতিশোধমূলক এই ট্যাগিং প্রক্রিয়া চলতে থাকলে কেবল ক্ষমতার হাতবদলই হবে, কিন্তু মূল সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, ‘যদি এই তকমা দেয়া এবং প্রতিশোধ নেওয়ার অন্যায় চর্চা চলতে থাকে, তবে প্রতিবার ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন রূপে কেবল বৈষম্যই ফিরে আসবে।’

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—রাজনৈতিক তকমাই কি ঠিক করে দেবে কে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করবে, কে শিক্ষকতা করবে, কিংবা কে কথা বলবে?

স্বচ্ছ তদন্ত, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং একাডেমিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে, রাজনৈতিক ট্যাগিং ক্যাম্পাসে একদলকে সরিয়ে আরেক দলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্থায়ী হাতিয়ারে পরিণত হবে।