Image description

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩১ হাজার সন্দেহজনক লেনদেন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এর মধ্যে বহুল আলোচিত ১০ গ্রুপ ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবারের পাচার হওয়া ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের ভেতরে ৫৭ হাজার কোটি টাকা এবং বিদেশে ১৯ হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদন প্রকাশকালে এ তথ্য জানান বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন।

পাচার হওয়া অর্থ ফেরতে অগ্রগতি কতোটা, এই প্রশ্নে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, আমাদের প্রক্রিয়া চলমান আছে। আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করছি এই বছরের শেষের দিকে দেশবাসীকে একটা সুসংবাদ দিতে পারবো। অর্থ পাচারের ঘটনার তদন্ত কার্যক্রমে গতি আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং ১০টি গ্রুপকে অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত শুরু করে সংস্থাগুলো। গঠন করা হয় ১১টি যৌথ তদন্ত কমিটি। এই ১১টি ঘটনার তদন্তে এখন পর্যন্ত ৯৮টি মামলা করা হয়েছে তুলে ধরে বিএফআইইউ প্রধান বলেন, এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন।

শেখ হাসিনার পরিবারের কতো সদস্য রয়েছেন? জবাবে ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, সুর্নিদিষ্ট করে বলা সম্ভব না। আমরা তো কারও রাজনৈতিক বা অন্য কোনো পরিচয় দেখে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করি না। অভিযোগ আসলেই তদন্ত করা হয়। এখানে কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে আসলে আমরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করছি না।

বিএফআইইউ প্রতিবেদনে জানানো হয়, দেশে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে মোট ৩০ হাজার ১৯৯টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫২৪টি ছিল সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (এসটিআর) এবং ৯ হাজার ৬৭৫টি ছিল সন্দেহজনক কার্যক্রমের (এসএআর) প্রতিবেদন। আগের অর্থবছরের তুলনায় যা ৮০ শতাংশ বেশি।

জানানো হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫টি সন্দেহজনক প্রতিবেদন জমা পড়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৯টিতে। আর ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে মাত্র ৫ হাজার ২৮০টি প্রতিবেদন জমা পড়েছিল, সেখানে ৪ বছরের ব্যবধানে এ সংখ্যা প্রায় ৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২, যা ২০১৫ সালে সংশোধিত হয় এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ অনুযায়ী রিপোর্টিং সংস্থাগুলো সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিল করতে আইনগতভাবে বাধ্য। কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা কার্যক্রম শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিলম্ব না করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সন্দেহজনক প্রতিবেদন বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর তদারকি, আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা বৃদ্ধি, লেনদেন পর্যবেক্ষণ ও সন্দেহজনক আচরণ শনাক্তে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা বৃদ্ধি। পাশাপাশি অনলাইন জুয়া ও বাজি, বৈদেশিক মুদ্রা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন এবং ডিজিটাল হুন্ডির মতো সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম বাড়ায় এসব লেনদেনের ওপর নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিলে দেশের ব্যাংকিং খাতই সবচেয়ে এগিয়ে। গত তিন অর্থবছরে মোট প্রতিবেদনের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসেছে ব্যাংকগুলো থেকে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ হার ছিল ৯১ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো ২৮ হাজার ৭৫৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ১৫ হাজার ৯৯১টির তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১২ হাজার ৮০৯টি প্রতিবেদনের তুলনায় এ সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি।

সুইস ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাবে সাড়া নেই: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক এগমন্ট গ্রুপের সদস্য দেশ হওয়ার পর ২০২৩ সালে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাব দেয় বিএফআইইউ। প্রতিবেশী দেশ ভারত এই বিষয়ে চুক্তি করতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি। সেই প্রক্রিয়ার অগ্রগতি কতোটা হলো? জবাবে বিএফআইইউ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন বলেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো আপডেট নাই। এগমন্ট গ্রুপের সদস্য হিসেবে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বিএফআইইউ’র সমঝোতা স্মারক আছে, বলেন তিনি। তবে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি না থাকায় সুইস ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের অর্থের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারছে না বিএফআইইউ।