গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা পোষণ করেছেন আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমের কাছে। তবে তার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর নয়। সেটা বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের নীতি-নির্ধারণী মহলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবীরা। তারা বলছেন, ভারত সরকার যদি একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়, তাহলে প্রত্যর্পণ আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করে ফেরত পাঠাতে হবে। যদিও দেশে ফিরতে তার আইনি বাধা না থাকলেও এই মুহূর্তেই ফেরার কোনো বিশ্বাসযোগ্য সম্ভাবনা নেই। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্যই হয়তো তিনি এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন আইনজীবীরা। বিশ্বে পলাতক শাসকদের নজির বিবেচনায় তার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম বলেও মন্তব্য করেন তারা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়ে দেশের চারজন বিশিষ্ট আইনজীবী মানবজমিনকে এমন মন্তব্য করেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেছেন, একজন বাংলাদেশি নাগরিক যেকোনো সময় স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে পারেন। শেখ হাসিনা যদি নিজ ইচ্ছায় দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে সেটি তার নাগরিক হিসেবে দেশে প্রত্যাবর্তন হবে। সে ক্ষেত্রে তাকে ভারত সরকারের মাধ্যমে পাঠানোর বা বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আনার প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, বন্দিবিনিময় বা প্রত্যর্পণের প্রশ্ন তখনই আসে, যখন কোনো ব্যক্তি নিজে ফিরতে না চান এবং অন্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রক্রিয়া প্রযোজ্য নয়। দেশে ফিরলে সাজার বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ আছে কি না এ বিষয়ে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও আদালতে বিলম্ব মার্জনার (ঈড়হফড়হধঃরড়হ ড়ভ উবষধু) আবেদন করা যায়। আদালত যদি সেই আবেদন গ্রহণ করে, তাহলে বিলম্বে দায়ের করা আপিলও শুনানির জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, আদালতে প্রতিদিনই বহু বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা হয় এবং আদালত যথাযথ কারণ পেলে সেগুলো গ্রহণ করে থাকে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো আপিল করা হয়নি। তিনি পলাতক থাকায় আপিল করার সুযোগও নেই। ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়, সেই সময়সীমাও ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এই ধারায় একটা শর্ত আছে, যদি ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে ব্যর্থ হোন পরবর্তীতে আর আপিল গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিলম্ব মার্জনা করে আপিল করার সুযোগ আছে কি নাÑ এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, অতীতে যুদ্ধাপরাধের প্রায় ৫৫টি মামলা শেখ হাসিনার শাসনামলে নিষ্পত্তি হয়েছিল। সেখানে অনেক আসামির অনুপস্থিতিতে সাজা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেক আসামি পলাতকও ছিল। দেখা যায়, ২০১৯ সালে সাজা হয়েছে কিন্তু ২০২৩ সালে এসে আপিল ফাইল করেছে। সেই আপিলগুলো কিন্তু বিলম্বের গ্রাউন্ডে মঞ্জুর হয়নি। আইনগত প্রশ্নে নিষ্পত্তি হয়নি। ধারা ২১(৩) এর বিরুদ্ধে গিয়েই আপিলগুলো ফাইল হয়েছে। এসব মামলায় বিলম্ব মওকুফ করে আপিল গ্রহণেরও কোনো নজির সৃষ্টি হয়নি। আমাদের বিশ্বাস, শুনানিতে যদি কোনো নজির তৈরি হয় তবেই শেখ হাসিনার আপিল গ্রহণের বাধা দূূর হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ বা পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এই স্টেজে হবে না। আপিলটা যদি দায়েরেই আইনগত বাধা থাকে তবে কীভাবে এটি গ্রহণ হতে পারে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও বলেন, শেখ হাসিনা যে অভিযোগে খালাস পেয়েছিলেন, সেই অংশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই অভিযোগেও তাকে দোষী সাব্যস্ত করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে। বর্তমানে আপিলটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন এবং কয়েক মাসের মধ্যে শুনানির প্রস্তুতি নিয়ে তা সম্পন্ন করা হবে বলে জানান তিনি। চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা আশা করছি, এই আপিলেও শেখ হাসিনার সাজা বৃদ্ধি পাবে। এদিকে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। বর্তমানে তার সাজা স্থগিত রয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তিনি দেশে ফিরে আপিল ফাইল করেন। এটিসহ মোট ৩০টি সাজার বিরুদ্ধে আপিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পেন্ডিং আছে। কিন্তু বিচারপতিদের স্বল্পতার কারণে মামলাগুলোর শুনানি শুরু হচ্ছে না বলে জানান তিনি। কিন্তু যদি পৃথক বেঞ্চ হয় কিংবা বিচারপতিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তাহলে দ্রুত এগুলো নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন চিফ প্রসিকিউটর।
ওদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা যদি লুকিয়ে ট্রাইব্যুনাল পর্যন্ত আসতে পারেন তবেই কেবল আত্মসমর্পণের প্রশ্ন আসতে পারে। অন্যথায় নিজের ইচ্ছামতো দেশে এসে আত্মসমর্পণের কোনো সুযোগ নাই।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আওতায় আসামাত্র মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। আর প্রত্যর্পণ হলে তাকে গ্রেপ্তার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনের শর্ত অনুযায়ী পলাতক আসামিকে হাতের নাগালে পাওয়ামাত্র গ্রেপ্তার করতে হবে। যেহেতু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও দণ্ডাদেশ আছে তাকে গ্রেপ্তারে কোনো বাধা নেই বলে জানান সাবেক এই চিফ প্রসিকিউটর। এদিকে, ট্রাইব্যুনালের সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা এর আগেও দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরেননি। এখন তার দেশে ফেরার বিশ্বাসযোগ্য কোনো সম্ভাবনা নাই। দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্যই হয়তো এ ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন তিনি।
প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার আশা করছেন। তবে তার প্রত্যাবর্তন কী প্রক্রিয়ায় হবে, সে বিষয়ে এখনো সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি।