Image description

ক্ষমতাসীন দলের ডেপুটি স্পিকারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ অধিবেশন বর্জনের বিরল ঘটনা ঘটিয়েছেন কুমিল্লা-৬ আসনের বিএনপির এমপি মো. মনিরুল হক চৌধুরী।

গত ১৪ জুন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের এক সিদ্ধান্তে ‘ক্ষুব্ধ ও অপমানিত’ হয়ে ১৫ জুন থেকে টানা সংসদ অধিবেশন বয়কট করছেন তিনি। ২৫ জুন পর্যন্ত সংসদে না যাওয়া মনিরুল হক চৌধুরী ১৬ জুন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে চিঠি দিয়ে ডেপুটি স্পিকারের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

মনিরুল হক চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আমাকে সংসদে অপমান করা হয়েছে। স্পিকার ফোন করে সংসদে ফিরতে বললেও আমি এই অপমান এখনো হজম করতে পারছি না। যেদিন পারব, সেদিনই সংসদে যাব।’

ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এই অভিযোগ ও চিঠির বিষয়ে অবগত আছেন বলে জানিয়েছেন। তবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গিয়ে ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেও সাড়া মেলেনি। তার একান্ত সচিব রওশন কবির জানান, স্পিকার সংসদ পরিচালনায় ব্যস্ত।

তবে দেখা গেছে, ২৪ ও ২৫ জুন সকালের অধিবেশনগুলোতে সভাপতিত্ব করলেও বিকালের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেননি স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সাম্প্রতিক সময়ে বেশিরভাগ অধিবেশন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালই পরিচালনা করছেন।

ঘটনার নেপথ্যে যা ঘটেছিল

গত ১৪ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় মনিরুল হক চৌধুরী অষ্টম সংসদের (২০০১-০৬) সময় কুমিল্লার এমপিদের একটি অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করেন। সেখানে বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের তার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন।

মনিরুল হক চৌধুরী সংসদে বলেন, ‘আমি বউ নিয়ে যাইনি, কয়েকজন যায়নি। কিন্তু তাহের ভাই বউ নিয়ে গেছেন। ঢোকার পর দেখি একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বলি, তাহের ভাই, ভাবি কই? উনি বলেন, ‘‘এই যে!’’ তখন বলি, আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই, এটা কেমনে বুঝব?’

এরপর সংসদে বোরকা পরা জামায়াতের নারী এমপিদের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘সবাই মেধাবী, ভবিষ্যৎ আছে। কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা? আপনারা (বিরোধী দল) এদিকে (সরকার দল) দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে দেখলে কী আছে বুঝব না; এটা ঠিক না।’

এ সময় সরকারি দলের এমপিরা হাসলেও বিরোধী দলের এমপিরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। তখন মনিরুল হক চৌধুরীকে অন্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করেন অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

নিজ বক্তব্যের কৈফিয়ত দিতে দাঁড়িয়ে মনিরুল হক চৌধুরী জানান, তিনি শুধু অতীতের একটা গল্প বলেছেন। এতে কেউ ছোট হয়ে থাকলে এজন্য ক্ষমাও চান মনিরুল হক চৌধুরী।

তবে বোরকা নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের বিতর্কিত অংশটুকু কার্যবিবরণী থেকে বাদ (এক্সপাঞ্জ) করার ঘোষণা দেন ডেপুটি স্পিকার।

পরে মনিরুল হক চৌধুরী আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য ফ্লোর চাইলেও তাকে আর সুযোগ দেওয়া হয়নি।

পরে পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ফ্লোর নিয়ে বিষয়টিকে হালকা করার চেষ্টা করে বলেন, ‘সংসদে হাসি-ঠাট্টা করে অনেক কথাই হয়। বিদ্যুৎমন্ত্রীর বিয়ে নিয়েও কথা হয়েছে। এটিও তেমনই হালকা কথা।’ তবে ডেপুটি স্পিকার বলেন, রুলিং দেওয়ার পর বিষয়টি এখানেই শেষ।

এরপর সরকারি দলের চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলামও মনিরুল হক চৌধুরীকে ফ্লোর দেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল ‘পরবর্তীতে প্রয়োজন বোধ করলে ফ্লোর দেওয়া হবে’ বলে মনিরুল হক চৌধুরীকে বসিয়ে দেন।

মনিরুল হকের আপত্তি

মনিরুল হক চৌধুরী টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, ‘আমার বক্তব্যে একটিও অসংসদীয় বা অশ্লীল কথা ছিল না। অথচ বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ আমাকে বর্ণবাদী ও অপরাধী বললেন। আমার কোন শব্দটি অশালীন, তার ব্যাখ্যা চেয়েই আমি স্পিকারকে চিঠি দিয়েছি।’

এ বিষয়ে ২৪ জুন সংসদ ভবনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের সঙ্গে দেখা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

যোগাযোগ করা হলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘যেহেতু অভিযোগটি আমার বিরুদ্ধে, তাই মন্তব্য করা ঠিক হবে না। কোনো সংসদ সদস্য ক্ষুব্ধ হলে তিনি স্পিকারের কাছে প্রতিকার চাইতে পারেন।’

সাইফুর রহমানকেও ধমক দেওয়া হয়েছিল

সংসদের ইতিহাসে এমন ঘটনা অবশ্য প্রথম নয়। অষ্টম জাতীয় সংসদের এক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী। অধিবেশনের এক পর্যায়ে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি হেলেন জেরিন খান আওয়ামী লীগের এমপি শাজাহান খানকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করলে সংসদে হইচই শুরু হয়। তখন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান দাঁড়িয়ে হেলেন জেরিনকে কেন ফ্লোর দেওয়া হলো এনিয়ে ডেপুটি স্পিকারকে প্রশ্ন করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সাইফুর রহমানের মাইক বন্ধ করে তাকে ধমকের সুরে বসিয়ে দেন ডেপুটি স্পিকার।

সেই ঘটনার পর অভিমান করে কয়েকদিন অধিবেশনে যাননি অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। পরে স্বয়ং সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া উদ্যোগ নিয়ে সাইফুর রহমানের অভিমান ভাঙান।