Image description

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আওতাধীন হাটবাজার, বাসস্ট্যান্ড, ঘাট, গণশৌচাগার এবং অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা কার্যক্রম নিয়ে নগরজুড়ে বইছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। সদ্যসমাপ্ত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের ইজারা কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ইজারাই পেয়েছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা।

ফলে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া এ প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে হতাশা। এতে ইজারা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সরকারি রাজস্ব আদায় নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে উঠেছে ভাগবাটোয়ারার মাধ্যমে দলীয় লোকজনকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, ইজারা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়নি। ফলে সরকার ও সিটি করপোরেশন সম্ভাব্য রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন প্রশাসন।

গত ১৪ জুন নগর ভবনের সম্মেলন কক্ষে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বিভিন্ন সায়রাত মহালের দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানসহ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।

দরপত্র অনুযায়ী, ইনস্টিটিউট রোড পার্শ্বস্থ অস্থায়ী কাঁচাবাজার (মীর জুমলা সড়ক বাদে) সর্বোচ্চ এক কোটি ২২ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন আবু সালেহ আহম্মেদ সনেট। স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি বিএনপি নেতা বদিউজ্জামান বদুর ভাগিনা এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা জাকির খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ১৮ লাখ পাঁচ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন। নিউ মেট্রো হলের সামনে সড়ক বাসস্ট্যান্ড ৩০ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মো. নজরুল ইসলাম।

নিতাইগঞ্জ ও থানা পুকুরপাড় এলাকায় রাস্তার ক্ষতিপূরণ ফি আদায়ের ইজারা ২৩ লাখ টাকায় পেয়েছেন মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।

গণশৌচাগারের মধ্যে সৈয়দ আলী চেম্বার সংলগ্ন গণশৌচাগার দুই লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৩ টাকায় ইজারা পেয়েছেন মাহাবুব আলম সুমন। কেন্দ্রীয় পৌর শহীদ মিনার সংলগ্ন গণশৌচাগার ছয় লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন প্রয়াত বিএনপি নেতা ডেভিডের ভাই ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহেব উল্লাহ রোমান। ধর্মতলা গণশৌচাগার পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ টাকায় ইজারা পেয়েছেন ফয়সাল আবেদ হিমু। তবে পঞ্চবটি ট্রাক টার্মিনালের দরপত্রে ত্রুটি থাকায় ওই মহালের জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৩ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষে নাসিকের ২২টি অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা চূড়ান্ত করা হয়। সেখানেও বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে।

সবচেয়ে বেশি দর দিয়ে ৮নং ওয়ার্ডের গোদনাইল ইব্রাহিম টেক্সটাইল মিলসের খালি মাঠ ৪৬ লাখ টাকায় ইজারা নেন যুবদল নেতা মো. মমতাজ উদ্দিন। অন্যদিকে সর্বনিম্ন তিন লাখ ৩০ হাজার টাকায় ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের আলতাফ সাহেবের খালি জায়গা ইজারা পান আবদুল মান্নান শিকদার।

৫নং ওয়ার্ডের সাইলো রোডসংলগ্ন মোহর চান কন্ট্রাক্টরের খালি জায়গা সাত লাখ ১০ হাজার টাকায় ইজারা নেন মুক্তার হোসেন। একই ওয়ার্ডের বটতলা বাদশা মিয়ার মাঠ তিন লাখ ৫০ হাজার টাকায় পান সিরাজুল ইসলাম। ৬নং ওয়ার্ডের এসও রোড টার্মিনালসংলগ্ন খালি জায়গা তিন লাখ ৯৫ হাজার টাকায় ইজারা নেন মাজহারুল ইসলাম। সাত নম্বর ওয়ার্ডের নাভানা সিটি-১ মাঠ সাত লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা পান সোহেল মিয়া। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের জালকুড়ি দক্ষিণপাড়ার নতুন রোডসংলগ্ন খালি জায়গা ১৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকায় ইজারা নেন দেলোয়ার হোসেন। একই ওয়ার্ডের ডিএনডি খালসংলগ্ন খালি জায়গা ১৮ লাখ ১০ হাজার টাকায় পান বাবুল প্রধান।

এছাড়া নাসিকের আওতাধীন আরো বেশ কিছু খালি জায়গা, মাঠ, বালুর মাঠ ইত্যাদির ইজারার ক্ষেত্রে একই চিত্র দেখা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুল জব্বার বলেন, সিটি করপোরেশনের ইজারা জনগণের সম্পদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এখানে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ইজারা দেওয়া হলে তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক জুবায়ের শিকদার বলেন, ইজারা প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত। যদি রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সরকার রাজস্ব হারাতে পারে। সর্বোচ্চ দরদাতা ও যোগ্য ব্যক্তিদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে নাসিক প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, সিটি করপোরেশনের সব ইজারা সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এখানে কারো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, ‘যিনি সর্বোচ্চ দর দিয়েছেন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছেন, তিনিই ইজারা পেয়েছেন। বিরোধীরা রাজনৈতিক কারণে অভিযোগ তুলতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হলো পুরো প্রক্রিয়াই ছিল স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক।’

রাজস্ব হারানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের কারণেই সিটি করপোরেশনের আয় বেড়েছে। আমরা সর্বোচ্চ রাজস্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। কারো কাছে যদি অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকে, তাহলে তা প্রশাসনের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু জানান, সরকারি ইজারা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। বিএনপির কোনো নেতাকর্মী আইনানুগভাবে সর্বোচ্চ দর দিয়ে ইজারা পেলে সেখানে আপত্তির কিছু নেই। তবে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা অন্যায়ভাবে ইজারা পাইয়ে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কোথাও যদি অনিয়ম বা কারসাজির মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে, তাহলে সেটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। বিএনপি সবসময় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পক্ষে।

নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের ইজারাদার ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন বলেন, শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরাই ইজারা নিচ্ছেন এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সর্বোচ্চ দরদাতাই ইজারা পান। যদি কোথাও অনিয়ম বা কারসাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তাহলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি আরো বলেন, সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এ ধরনের বক্তব্যেরও বাস্তব ভিত্তি থাকতে হবে। কোনো ইজারা যদি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাহলে সেখানে রাজস্ব কম পাওয়ার প্রশ্ন আসে না। তবে কোথাও যদি প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত হয় বা কাউকে অংশ নিতে দেওয়া না হয়, সেটি অবশ্যই তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।

নগরবাসীর একটি অংশের মতে, ইজারা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার প্রায় সব বড় মহাল বিএনপি ঘরানার ব্যক্তি বা তাদের ঘনিষ্ঠদের হাতে যাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন নজর থাকবে, ইজারাগুলো থেকে সিটি করপোরেশন প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় করতে পারে কি না এবং নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত সেবা পায় কি না।