Image description

সাম্প্রতিক সময়ে একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত করতে মরিয়া। পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দুর্বৃত্তায়িত শাসনকালকে ভুলিয়ে দিয়ে তাদের নরমালাইজ ও পুনর্বাসন করার মিশনে নামা গোষ্ঠীটি হেন কোনো অশালীন ও কটু বাক্য নেই, যা ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে না। চব্বিশের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকালে গণহত্যা চালানোর সময় গণপ্রতিরোধে ৪০ জনের মতো পুলিশ সদস্য নিহত হন। ড. ইউনূস তখন ফ্রান্সে চিকিৎসাধীন। ৮ আগস্ট তার কাঁধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। অথচ অবলীলায় ড. ইউনূসকে পুলিশ হত্যাকারী বলা হচ্ছে। ড. ইউনূসের কোনো রাজনৈতিক দল নেই। নেই মাঠের জনশক্তি। টালমাটাল সময়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রতিরোধমূলক ঘটনাগুলোকে ‘মব সন্ত্রাস’ নাম দিয়ে বলা হচ্ছে—‘ড. ইউনূস মব সন্ত্রাসের জনক।’ এভাবে যেসব ঘটনা তার দায়িত্ব গ্রহণের আগে সংগঠিত হয়েছে, কিংবা তার দূরতম সম্পর্কও ছিল না, তার দায়ও চাপিয়ে গালাগাল করা হচ্ছে হাসিনার ভাষায়। সংঘবদ্ধ এ প্রোপাগান্ডায় কিছু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট যেমন আছে, তেমনি ফ্যাসিবাদের দোসর মিডিয়াও অংশ নিচ্ছে।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের পর এক চরম অনিশ্চয়তা ও টালমাটাল পরিস্থিতিতে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান-পরবর্তী চরম ক্রান্তিকালে সেই সরকারের কাঁধে চেপেছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্র পুনর্গঠন এবং একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

ড. ইউনূসের সরকার রাষ্ট্রকাঠামোয় যে পরিবর্তন এনেছে, বা আনার চেষ্টা করেছে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় যেসব আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদাকে যেভাবে সমুজ্জ্বল করেছে—তা সমকালীন ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গতিপথ নির্ধারণে এক গভীর রেখাপাত করেছে। ড. ইউনূসের সরকারের মূল দর্শনই ছিল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। তার অগ্রাধিকারের শীর্ষে ছিল স্ট্রাকচারাল রিফরমেশন। ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা ঠেকাতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ড. ইউনূসের সরকার বেশ কয়েকটি সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল অনেকগুলো সংস্কার কমিশন গঠন করে কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারের পথরেখা তৈরি করা। রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে ঢেলে সাজাতে ড. ইউনূস সংবিধানে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বেশ কয়েকটি পৃথক ‘সংস্কার কমিশন’ গঠন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার। এই কমিশনগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি রূপরেখা তৈরি করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার ফ্যাসিবাদের রূপ ধারণ করতে না পারে।

অতীতে নির্বাচন কমিশনকে যেভাবে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, বিতর্কহীন নির্ভুল ভোটার তালিকা, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধন এনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সুগম করা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করা হয় এই সরকারের আমলে। ড. ইউনূস তার শাসনকালে অন্য কোনো সফলতা যদি দেখাতে নাও পারতেন, সেক্ষেত্রে শুধু ইতিহাসসেরা একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যই জাতির কাছে তার পূজনীয় হয়ে থাকার কথা। এমন একটি জাতীয় নির্বাচন তিনি করেছেন, যাতে উল্লেখ করার মতো কোনো সহিংসতা ঘটেনি, একটি লাশও পড়েনি এবং ভোটগ্রহণ স্থগিত করতে হয়নি।

৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পলায়নের আগে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকব্যবস্থাকে ধ্বংস করে গেছে। খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার এবং ব্যাংক খাতের হরিলুটে জড়িতদের জবাবদিহি করতে এবং আইনের আওতায় আনতে ড. ইউনূসের সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরাতে টাস্কফোর্স গঠন করা হয় এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পেশাদারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হয়। তিনি মূল্যস্ফীতি ডবল ডিজিট থেকে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনেন। রিজার্ভ ১৫ বিলিয়ন থেকে দ্বিগুণ করে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে যান।

ড. ইউনূসের শাসনামলে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যেসব আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, বর্তমান বাংলাদেশ তার সুফল ভোগ করছে। এই সংস্কারগুলোর সুফল মূলত তিনটি ক্ষেত্রে এখন দৃশ্যমান। অতীতে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বিচারালয়কে মুক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয় ড. ইউনূসের হাত ধরেই। উচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত পর্যন্ত দলবাজি থেকে মুক্ত করে বিচারক নিয়োগে মেধা ও যোগ্যতার নীতিমালা কঠোর করা হয়। এর সুফল হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই নাগরিকদের বহুলাংশে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আইনের চোখে সবাই সমান—এই ধারণার পুনর্জাগরণ ঘটেছে, যা সমাজে এক ধরনের স্বস্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ তৈরি করেছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি শক্তিশালী স্বাধীন সংস্থায় রূপ দেওয়া হয়। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বড় বড় অর্থ পাচারকারী ও ব্যাংক খাতের মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ সুগম হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার সহায়তায় দেশ থেকে পাচার হওয়া বিলিয়ন ডলার ফেরত আনার যে আইনি কাঠামো ড. ইউনূসের সরকার তৈরি করেছিল, বর্তমান বাংলাদেশ তার সুফল পাচ্ছে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা এসেছে।

যেসব কালো আইন নাগরিকের কণ্ঠরোধ করতে ব্যবহার করা হতো, ড. ইউনূসের সরকার সেই আইনি ফাঁদগুলো বাতিল বা সংশোধন করে। মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের ওপর থেকে অহেতুক সেন্সরশিপ তুলে নেওয়ার ফলে বর্তমান বাংলাদেশে একটি প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ ও মুক্ত সংবাদমাধ্যম ক্রমাগতভাবে শক্তি সঞ্চয় করছে। এছাড়া জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের বিভিন্ন প্রটোকলে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুমের সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটানোর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্যতম বড় শক্তি ছিল তার বিশ্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। তার শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুগামী না হয়ে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’—এই নীতির আধুনিক ও বাস্তবমুখী প্রয়োগ ঘটান। প্রতিবেশী আধিপত্যবাদী শক্তির চোখে চোখ রেখে প্রথমবারের মতো দেশের মর্যাদাকে সমুন্নত করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রেখে ভারত, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদে বাংলাদেশে বৈদেশিক সাহায্য, জলবায়ু তহবিল এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের দুয়ার খুলে যায়, যা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে।

ফ্যাসিস্ট শাসকের পতনের পর যখন দেশে পুলিশ ছিল না, প্রশাসন স্থবির ও ভঙ্গুর এবং অর্থনীতি ছিল দেউলিয়া হওয়ার পথে, তখন তিনি তার প্রজ্ঞা ও বৈশ্বিক ইমেজ ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করেছেন। তিনি ছিলেন ভাঙা তরীর সেই কান্ডারি, যিনি দেশকে প্রতিবিপ্লব, সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধ বা সামরিক শাসনের অন্ধকার থেকে রক্ষা করে একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে নিয়ে গেছেন। সাময়িক জনপ্রিয়তার সস্তা রাজনীতি না করে ড. ইউনূস দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে মনোযোগ দিয়েছিলেন। ইতিহাস তাকে মূল্যায়ন করবে বাংলাদেশের ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের’ ভিত্তি স্থাপনকারী হিসেবে। নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ এবং সংবিধানে তিনি যে সংস্কারের বীজ বুনে গেছেন, তার ওপর দাঁড়িয়েই আজকের বাংলাদেশ একটি উদার গণতন্ত্রের সুফল ভোগ করছে। ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে তার নেওয়া আইনি পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক।

ড. ইউনূস সবসময় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব তরুণ প্রজন্ম বা জেন জি’কে দিয়েছেন। ইতিহাসে তিনি এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চিহ্নিত হবেন, যিনি তরুণদের মেধা ও চিন্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। তিনি তরুণদের শুধু ভোটার বা আন্দোলনকারী হিসেবে দেখেননি, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের অংশীদার বানিয়েছিলেন। এটাও ঠিক, ইতিহাসের বিচার সবসময় নিরপেক্ষ ও কঠোর। ড. ইউনূসের অনন্য সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও ইতিহাসে মূল্যায়িত হবে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দ্রুত সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনার ক্ষেত্রে তার সরকারকে তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচনে যাওয়ার চাপ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের গভীরতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার যে কঠিন পরীক্ষা তাকে দিতে হয়েছে, ইতিহাস তারও চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে।

সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়াই তাকে ‘বিশ্ব বাটপাড়’ বা ‘ইতিহাস ব্যর্থ শাসক’ কিংবা ‘মব সন্ত্রাসের জনক’ বলে গালমন্দ করা যাবে। তিনি প্রতিবাদ করেননি, করবেনও না। বাস্তবতা সবার জানা। তার প্রতি আক্রোশের রহস্যও বোদ্ধাদের অজানা নয়। বিশ্ব যাকে সম্মান দেয়, নিজ দেশের গুটিকয় ফ্যাসিবাদের পক্ষে সম্মতি উৎপাদনকারী তাকে খাটো করার চেষ্টা করলে ক্ষতিটা দেশেরই হয়, ব্যক্তি ইউনূসের নয়। ড. ইউনূসের কাজের স্বীকৃতি আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই অন্ধ সমালোচনা বা বিষোদ্‌গার কেবল সমালোচকদের নিজেদের দেউলিয়াত্ব ও হিংসাকেই ফুটিয়ে তোলে। মহাত্মা গান্ধীর একটি উক্তি এখানে প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘প্রথমে তারা তোমাকে উপেক্ষা করবে, তারপর তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে, কটাক্ষ করবে, তাচ্ছিল্য করবে, তারপর তোমার সঙ্গে লড়াই করবে এবং তারপর তুমি জিতে যাবে।’ অর্থাৎ, ‘যারা আজ বিষোদ্‌গার করছে, তারা আসলে একসময় সত্যের কাছে পরাজিত হবে’—ইতিহাস এটাই বলে।

আত্মভোলা বা বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি হিসেবে আমরা এখন যা-ই বলি না কেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। তিনি এমন এক সময়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যখন চারদিকে ছিল ক্ষোভ, হতাশা আর ধ্বংসের চিহ্ন। সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের এক নতুন বয়ান তৈরি করেছেন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের জন্য যে মসৃণ পথ তৈরি করে দিয়েছেন, তার সুফল আজ দেশের প্রতিটি নাগরিক পাচ্ছে। ইতিহাস ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কোনো সাধারণ শাসক হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো আমূল বদলে দেওয়ার এক দূরদর্শী রূপকার ও ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদায় স্মরণ করবে।

ড. ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষেরা যখন নিন্দা করে, তখন তা তাদের নিজেদের যোগ্যতার সীমাবদ্ধতাকেই প্রকাশ করে। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন যেমনটি বলেছেন, ‘মহান ব্যক্তিত্বরা সবসময় সাধারণ মনের মানুষদের কাছ থেকে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছেন।’ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও সম্মানিত একজন মানুষ যখন তার কর্মগুণে এগিয়ে যান, তখন পেছন থেকে কিছু মানুষের অহেতুক চিৎকার বা বিষোদ্‌গার তার মর্যাদাকে বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ণ করতে পারে না। যিনি সমাজ ও পৃথিবীর জন্য অবদান রাখেন, সমালোচনা বা আঘাত তার দিকেই বেশি আসে। সুমিষ্ট ফলদ গাছে বেশি ঢিল মারার অর্থ এই নয় যে, গাছটি খারাপ; বরং এটি গাছটির গুরুত্ব ও সফলতারই প্রমাণ। একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্বের গায়ে কলঙ্ক লেপন করার অপচেষ্টা আসলে যারা করছে, তারা নিজেদের পঙ্কিল মানসিকতাই সমাজের সামনে উন্মোচিত করছে।

সমালোচকেরা তার প্রতি যতই নির্দয় ও আক্রোশাত্মক হোন না কেন, ইতিহাসের পাতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মূল্যায়ন হবে বহুমুখী এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি কেবল একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বা ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা হিসেবেই নন, বরং অবক্ষয়িত একটি জাতিকে পুনর্গঠনের মূল কারিগর বা ‘ক্রাইসিস ম্যানেজার’ হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এমন একজন নেতা হিসেবে তাকে স্মরণ করতেই হবে, যিনি নিজের জীবনের শেষভাগে এসে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রয়োজনে এক চরম ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

 

লেখক : এম আবদুল্লাহ

যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ এবং সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট