একের পর এক নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে সংবাদের শিরোনাম হচ্ছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। দুই সন্তান ও নিজের বংশের নামে ৩টি ইউনিয়নের নামকরণের পর নিজের নামে একটি স্কুলের নামকরণের প্রস্তাব করে সমালোচনার মুখে পড়েন এই প্রতিমন্ত্রী। এবার আলোচিত এই প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের জেরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্থানীয় ‘দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক রেজানুর ইসলাম (৪০)কে। বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুর জেলার গাছা থানার বোর্ড বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। শুক্রবার দুপুরে গ্রেপ্তারকৃত এই সাংবাদিককে আদালতের মাধ্যমে বগুড়া জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আতাউর রহমান জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা ও আইনি প্রক্রিয়া মেনেই আসামিকে গ্রেপ্তার ও আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান সরকারের পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তথ্য সম্বলিত প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহলে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। এর জেরে গত ১৫ই জুন বগুড়া প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এবং ‘দি নিউ নেশন’ পত্রিকার উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিনিধি তানভীর আলম রিমন বাদী হয়ে বগুড়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা করেন। মামলার আরজিতে পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশকসহ মোট ছয়জনকে আসামি করা হয়। আদালতের বিচারক মেহেদী হাসান বাদীর জবানবন্দি ও প্রাথমিক শুনানি শেষে অভিযোগটি আমলে নেন এবং বগুড়া সদর থানা পুলিশকে বিষয়টি নিয়মিত মামলা বা এজাহার হিসেবে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশের পর বগুড়া সদর থানা পুলিশ সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করে। পরবর্তীতে মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে এর তদন্তের দায়িত্বভার হস্তান্তর করা হয় বগুড়া ডিবি পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) রহমাতুল্লাহ মানিকের ওপর। এই মামলার এজাহারনামীয় অন্য আসামিরা হলেন, দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক মেহেদী হাসান, বার্তা সম্পাদক আশরাফ আলী ফারুকী, প্রতিবেদক সালেহ কায়সার, বগুড়া প্রতিবেদক মো. শামস এবং বগুড়া জেলা প্রতিনিধি সাব্বির হাসান।
মামলার বাদী তানভীর আলম অভিযোগ করেন, আসামিরা সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি ছাড়াই সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন। গত ১২ই জুন বগুড়া প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত একটি সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সাংবাদিক ছিলেন দাবি করে এবার সাংবাদিকদের উপদেশ দিলেন রাস্তাকাণ্ডে বিতর্কিত প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম’ শিরোনামে একটি উস্কানিমূলক পোস্ট ও সংবাদ প্রচার করা হয়। শুধু তাই নয়, গত ১৩ই জুন প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় সফরকে কেন্দ্র করে প্রতিমন্ত্রীকে জড়িয়ে ফেসবুকে আরও কিছু বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর মন্তব্য ছড়িয়ে দেয়া হয়। বাদীর দাবি, এই ধরনের পরিকল্পিত ও বানোয়াট প্রচারণার ফলে প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মামলা দায়েরের পর থেকেই আসামিদের গ্রেপ্তারে তৎপরতা শুরু করে পুলিশ।
বগুড়া ডিবি’র ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল বাহার জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তদন্তকারী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ডিবি’র একটি বিশেষ টিম বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে গাজীপুর জেলার গাছা থানার বোর্ড বাজার এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালায়। সেখান থেকে মামলার ২ নম্বর আসামি রেজানুর ইসলামকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত রেজানুর ইসলাম গাজীপুরের জয়দেবপুর উপজেলার বসুরা এলাকার জলিল মিয়ার ছেলে।
ডিবি পুলিশ শুক্রবার দুপুরে রেজানুরকে বগুড়া আদালতে হাজির করলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রহমাতুল্লাহ মানিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই মামলার অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছে। বাকি আসামিদের আইনের আওতায় আনতে ডিবি পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এবার শাহে আলমের নামে স্কুলের নামকরণের প্রস্তাব
এদিকে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে একটি বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাব অনুযায়ী, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন নাম রাখা হতে পারে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ (বেসরকারি মাধ্যমিক শাখা-১) গত ৯ই জুন রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও বগুড়া জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো চিঠিতে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও মতামত দিতে নির্দেশ দেয়।
চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি সরজমিন পরিদর্শন করে নাম পরিবর্তনের যৌক্তিকতা যাচাই করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন পাঠাতে বলা হয়। পরে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রমজান আলী তদন্ত শেষে নাম পরিবর্তনের পক্ষে সুপারিশ করে বুধবার (১৭ই জুন) প্রতিবেদন জমা দেন।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সালমা ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। সেটি পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এরপর নাম পরিবর্তনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি স্থানীয়দের জমির উপর গড়ে ওঠে। তবে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি স্থানীয় অনেকের কাছে অজানা। কেউ কেউ এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আবুল কালাম নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, অর্ধশতাধিক বছর আগের বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তনের বিষয়ে আমরা জানি না। কেন নাম পরিবর্তন করতে হবে- তা আমার বোধগম্য নয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাজুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিকরণের দাবি জানানো হচ্ছিল। আমরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম- আমাদের বিদ্যালয়টি কেউ সরকারিকরণ করলে তার নামে নামকরণ করা হবে। প্রতিমন্ত্রী বিদ্যালয়টি সরকারিকরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই তার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রী তার নামে নামকরণ করতে আমাদের কিছু বলেননি।
এদিকে মন্ত্রীর দুই ছেলে সীমান্ত, দিগন্ত ও নিজের বংশের নামে ৩টি ইউনিয়নের নামকরণ করায় দেশ জুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। ইতিমধ্যে ওই ৩টি ইউনিয়নসহ নতুন ৪টি ইউনিয়নের প্রশাসকও নিয়োগ করা হয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলায় নবগঠিত মীরবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান, মোকামতলা উপজেলায় স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, সীমান্ত ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হোসাইন এবং দিগন্ত ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ পেয়েছেন শিবগঞ্জ উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আল মামুন।
এ বিষয়ে বগুড়া জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক রাজিয়া সুলতানা বলেন, নতুন চার ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন শিবগঞ্জের ইউএনও। প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চার ইউনিয়নে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে।