Image description

বিশ্বখ্যাত দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয়ে চট্টগ্রামে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জালিয়াত চক্র। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই এ চক্রটির সঙ্গে এর মধ্যে প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) তথ্য যাচাই না করে বৈদেশিক বিনিয়োগ-সংক্রান্ত প্রকল্প ভেবে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। শুধু এটুকুই নয়, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়নে দ্রুত সহযোগিতা করতে সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়কেও চিঠি দিয়েছেন বিডার পরিচালক ড. মো. হুমায়ুন কবির খান।

যে প্রকল্পের কাজ পেতে জালিয়াত চক্র চেষ্টা করছে, সেটি চট্টগ্রাম নগরে মনোরেল নির্মাণ নিয়ে। নগরে মেট্রোরেল চালুর জন্য প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সেটি শেষ না হতেই ‘রহস্যজনকভাবে’ মনোরেলের প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে সিটি করপোরেশন ও বিডা।

এ জালিয়াত চক্রের মূল হোতা কাউছার আলম চৌধুরী। তিনি নিজেকে মিসরের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’ এবং বৈশ্বিক নির্মাণ জায়ান্ট ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন’-এর একমাত্র অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছেন। মজার ব্যাপার হলো, দুটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানেরই নাম ও লোগো জালিয়াতি করে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। কিন্তু ওরাসকম কর্তৃপক্ষ আগামীর সময়কে স্পষ্ট জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কোনো স্থানীয় প্রতিনিধি নেই। কাউছার আলম নামে কোনো ব্যক্তি ওরাসকমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন।

জালিয়াত চক্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের এমন চুক্তি প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, ‘এটি ভয়াবহ জালিয়াতি। বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ ইতিবাচক। কিন্তু এর সুযোগে যেন কোনো প্রতারক চক্র সুবিধা নিয়ে মানুষকে প্রতারিত করতে না পারে, সেজন্য বিনিয়োগে আগ্রহীদের ন্যূনতম ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই-বাছাই করা উচিত।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘যারা সমঝোতা স্মারক কিংবা চুক্তি সই করবেন, তাদের দায়িত্ব কার সঙ্গে তারা চুক্তি করছেন, তা যাচাই করে নেওয়া। সরকারি সংস্থায় এ ধরনের ঘাটতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের ২৪ জুন ‘চট্টগ্রাম মনোরেল ম্যাস ট্রানজিট ইনিশিয়েটিভ’ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সিটি করপোরেশনের পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম-পেনিনসুলা কনসোর্টিয়ামের’ পক্ষে অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন কাউছার আলম চৌধুরী।

প্রকল্পের নথিতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ব্যয় ১৫০ কোটি টাকা। বিল্ড অপারেট ট্রান্সফার (বিওটি) ও পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে ৭১ দশমিক ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চারটি রুটে ৭০টি স্টেশনসহ এ প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখা দেখানো হয়েছে।

পরদিন ২৫ জুন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের কাছে একটি চিঠি পাঠান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। চিঠিতে মনোরেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়নের অনুমোদন চেয়ে মেয়র উল্লেখ করেন, ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য অতি জনগুরুত্বপূর্ণ মনোরেল প্রকল্প বৈদেশিক বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিডার অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’

প্রকল্পটির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবদের কাছে চিঠি দেন বিডার পরিচালক (স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট ইউনিট) ড. মো. হুমায়ুন কবির খান। তিনি উল্লেখ করেন, ‘চট্টগ্রাম নগরবাসীর গণযোগাযোগব্যবস্থা ও গণপরিবহন চাহিদা পূরণে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে মনোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন মর্মে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে অবহিত করা হয়েছে।’

২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর বিডার চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব ফিরোজ মাহমুদ স্বাক্ষরিত আরেক চিঠিতে প্রকল্পের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয় সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে। অন্য দুই মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। বিষয়টি একই বছরের ২৯ অক্টোবর বিডাকে অবহিত করেন সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। পরের মাসের ১৬ নভেম্বর দুই মন্ত্রণালয়ে তাগাদাপত্র পাঠায় বিডা। এরপরও সাড়া না পাওয়ায় ২০২৬ সালের ৫ মে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্বয়ং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজের কাছে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠিয়ে এই প্রকল্পের জন্য ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ ও দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ জানান।

এর আগে ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রকল্পটি নিয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সমন্বয় সভা হয়। তাতে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী। সভায় উপস্থিত ছিলেন আরেক বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইন উদ্দিনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সর্বশেষ গত ৬ জুন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রেস্টহাউজে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. মো. মশিউর রহমান এবং অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (ম্যাস ট্রানজিট) ও যুগ্ম সচিব আবদুল লতিফ খান উপস্থিত ছিলেন।

এসব সভায় দি আরব কন্ট্রাক্টরস গ্রুপ ও ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে কাউছার আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

ওরাসকমের সাফ জবাব— ‘বাংলাদেশে আমাদের কোনো প্রতিনিধি নেই’: দি আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের অনুমোদিত প্রতিনিধি কাউছার আলম চৌধুরী আসলে কে? আদৌ কি দি আরব কন্ট্রাক্টরস ও ওরাসকম কনস্ট্রাকশন এ ধরনের বিনিয়োগ করছে? তা জানতে গত ১১ জুন ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) তামের শফিক ও নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান (বিজনেস ডেভেলপমেন্ট) জিম ওয়েলসের কাছে ইমেইল করা হয়। ১৪ জুন ফিরতি মেইলে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন গ্রুপের কায়রোর প্রধান কার্যালয়ের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর শেরিফ শ্যারোবিম সাফ জানিয়ে দেন, বাংলাদেশে ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের কোনো উপস্থিতি, ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা অনুমোদিত প্রতিনিধি নেই। কাউছার আলম চৌধুরী তাদের পরিচিত কোনো ব্যক্তি নন; তিনি ওরাসকম কনস্ট্রাকশন কিংবা এর গ্রুপভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা কর্মচারী নন এবং কখনোই ছিলেন না।

ওরাসকম কর্তৃপক্ষ আরও স্পষ্ট করে বলেছে, তথাকথিত ‘আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর সঙ্গে ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং তারা এই মেগা প্রকল্পের কোনো সমঝোতা স্মারক বা আলোচনার সঙ্গে জড়িত নন। তাদের নাম ব্যবহার করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অননুমোদিত উল্লেখ করে ওরাসকম এ বিষয়ে আইনি অধিকার সংরক্ষণ করে বলে জানান।

নথিপত্র নেই চসিকের কাছে, বিডা পরিচালকের অজুহাত ‘মনে নেই’: কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর ৩৭৯ ধারা এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৬ অনুযায়ী, যেকোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শাখা বা লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় বিডা ও যৌথ মূলধনি কোম্পানি ফার্মগুলোর পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কাউছার চৌধুরীর এ-সংক্রান্ত কোনো অনুমোদন কিংবা দি আরব কন্ট্রাক্টর ও ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের বোর্ডসভার সিদ্ধান্ত বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কোনো নথি বিডা কিংবা সিটি করপোরেশন দেখাতে পারেনি।

কোনো ধরনের যাচাই ছাড়ােই মিসরের বৈশ্বিক জায়ান্টের নাম ভাঙানো একটি ভুয়া কনসোর্টিয়ামের ফাইল কীভাবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলো, তা জানতে চাওয়া হয় বিডার বিনিয়োগ গবেষণা ও অর্থনীতি পর্যবেক্ষণ এবং নীতি ও পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক (উপসচিব) ড. মো. হুমায়ুন কবির খানের কাছে। তিনি বলেছেন, ‘এটি অনেক দিন আগের বিষয়, আমি এখন রিকল করতে (মনে করতে) পারছি না।’

সমঝোতা চুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আশরাফুল আমিন বলেছেন, ‘যতটুকু জেনেছি, তারা প্রথমে বিডায় আবেদন করেছিল এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই সিটি করপোরেশন এই চুক্তি করেছে।’ জালিয়াত চক্রটি সরকারি নীতিনির্ধারণী সভার সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তার প্রমাণ মেলে সিইওর বক্তব্যে, ‘মনোরেল-সংক্রান্ত সর্বশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ সভায় কাউছার আলম চৌধুরী সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। সরকারের অতিরিক্ত সচিব ও ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল, চট্টগ্রামের যে রুটে মেট্রোরেল বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না, সেখানে মনোরেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।’

তবে ওরাসকম বা আরব কন্ট্রাক্টরসের পক্ষ থেকে কাউছার আলম চৌধুরীর অনুকূলে দেওয়া কোনো বৈধ ‘অথরাইজেশন’ বা ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ চসিকের নথিপত্রে সংরক্ষিত আছে কি না— এ প্রতিবেদকের এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তার কার্যালয় থেকে এর সপক্ষে কোনো বৈধ প্রাতিষ্ঠানিক নথি সরবরাহ করতে পারেননি।

টঙ্গীতে ‘ওরাসকমের’ অফিস, কাউছার দেখালেন গাজীপুরের ট্রেড লাইসেন্স: মিসরের মূল ওরাসকম কর্তৃপক্ষের লিখিত অস্বীকৃতির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশে এই কনসোর্টিয়ামের কথিত অথরাইজড রিপ্রেজেনটেটিভ কাউছার আলম চৌধুরী এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, বাংলাদেশে ‘ওরাসকম কনস্ট্রাকশন বাংলাদেশ’ নামে তাদের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর সপক্ষে তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশন থেকে নেওয়া একটি ট্রেড লাইসেন্স দেখান। লাইসেন্সটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০২৫ সালের জুনে।

গাজীপুরের টঙ্গীর মধ্য আউচপাড়ার ‘২৯/এসএস একাডেমি রোড’ ঠিকানায় নেওয়া ওই ট্রেড লাইসেন্সে ব্যবসার ধরন উল্লেখ রয়েছে ‘প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ও সরবরাহকারী’। তার বাড়ি নোয়াখালী সদরের তাজ মাহতাবপুরে। তবে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের শাখা বা লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বা আরজেএসসিএর যে বাধ্যতামূলক অনুমোদন প্রয়োজন, তার কোনো নথিপত্র তিনি দেখাতে পারেননি।

ওরাসকমের প্রধান কার্যালয়ের বক্তব্যের বিপরীতে নিজের অবস্থান দাবি করে কাউছার আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম মনোরেল প্রকল্পে মূলত ‘দি আরব কন্ট্রাক্টরস’ মূল বিনিয়োগকারী এবং প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। ইপিসি ঠিকাদার হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন করবে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন।’ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করে তিনি আরও বললেন, ‘বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে আরব কন্ট্রাক্টরসের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করেছে। সরকারের আমন্ত্রণে তাদের একটি টেকনিক্যাল টিম এরই মধ্যে বাংলাদেশ সফর করে মনোরেল প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করেছে।’ তবে ওরাসকম কায়রো অফিস কেন ওনাকে এবং এই চুক্তিকে সম্পূর্ণ ‘অবৈধ’ বলছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যা বা মিসরের মূল অফিসের কোনো বোর্ড অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেননি।

সেনাবাহিনীতে অবাঞ্ছিত ও দণ্ডপ্রাপ্ত প্রতারকও ছিলেন এই কনসোর্টিয়ামে: গত বছরের ১ জুন নগরের আগ্রাবাদ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সমঝোতা স্মারক নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে মনোরেল নিয়ে যে ডকুমেন্টারি উপস্থাপন করা হয়, সেখানে এম আলী নাজির শাহীন নামের একজনকে পেনিনসুলা কনসোর্টিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

২০২২ সালের ৬ আগস্ট দুপুরে এম আলী নাজির শাহীনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। পরদিন সংবাদ মাধ্যমে র‌্যাবের পক্ষ থেকে তার ছবিসহ প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়। একই সঙ্গে র‌্যাব-১-এর ফেসবুক পেজেও বিষয়টি শেয়ার করা হয়। তাতে উল্লেখ রয়েছে, চট্টগ্রামের ডিওএইচ এলাকায় অ্যামেজিং হোল্ডিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয় দিয়ে সামরিক বাহিনীর লোকজনের কাছ থেকে প্রায় ২ থেকে ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন শাহীন। এ ঘটনায় হওয়া মামলায় তাকে ২০১৬ সালে ১ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড ও ৪১ লাখ ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন চট্টগ্রাম যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালত। রায় ঘোষণার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ২০১৭ সালের ২২ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব সেনানিবাস এলাকায় তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। প্রেস রিলিজের সঙ্গে আলী নাজির শাহীনের ছবিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে তখন প্রচারিত হয়। শাহীনের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউছার আলম চৌধুরী বললেন, ‘তার সঙ্গে এখন আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

খুলনা ও মোংলা বন্দরেও জাল ছড়িয়েছে এই চক্র: ২০২৫ সালের ২৬ জুলাই খুলনা ক্লাবে সুন্দরবন ডেল্টা গ্রোথ ইনিশিয়েটিভের (এসডিজিআই) সঙ্গে দি আরব কনস্ট্রাকশন ও ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি হিসেবে চুক্তি করেন কাউছার আলম চৌধুরী। খুলনায় ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে এ সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে এসডিজিআইর সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন আলী নাজির শাহীন। একই বছরের ১১ আগস্ট মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে এসডিজিআই। সেখানে সদস্য সচিব হিসেবে আলী নাজির শাহীন ও দি আরব কনস্ট্রাকশন এবং ওরাসকম কনস্ট্রাকশনের প্রতিনিধি হিসেবে কাউছার আলম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। তারা মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে জার্মানির প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে আগ্রহী বলে কর্মকর্তাদের লোভ দেখান।