Image description

জহুরুল আলম ওরফে জসিম। উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ দলীয় কাউন্সিলর ছিলেন। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে পুরো আকবারশাহ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। পাহাড় দখল বেদখল, বিদ্যুৎ পানিসহ সেবা সংযোগ বেচাকেনা যাবতীয় বাণিজ্য হতো তার ইশারায়। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর আধিপত্যবাদেও রদবদল।

বিগত দুই বছর ধরে জসিমের স্থান দখলে নিয়েছেন থানা যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব ইলিয়াছ খান, মোহাম্মদ রাসেলসহ অন্যরা।

আকবরশাহ এলাকার মতো নগরের অন্যান্য সরকারি বেসরকারি পাহাড়গুলোতে চলছে এখন বিএনপির থানা-ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের আধিপত্য। জেলা প্রশাসনের হিসাবে নগরের ২৬ পাহাড়ে প্রায় আট হাজার পরিবারের অবৈধ বসতি রয়েছে। তবে সরকারি অন্যান্য সংস্থা এবং বেসরকারি হিসাবে পরিবারের সংখ্যা লাখের কাছাকাছি।

২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের অপমৃত্যু হয়েছিল। এরপর থেকে পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি বন্ধ করাসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সামনে আসে। নগরের শেরশাহ, বাংলাবাজার, মতিঝরনা, বাটালি পাহাড়, খুলশী, জালালাবাদ ও জঙ্গল ছলিমপুরের এসব পাহাড়ের অবস্থান। নিম্ন কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের লোকজন দিয়ে পাহাড়ে বসতি গড়ে তোলা হয়। এর পেছনে থাকে রাজনৈতিক পরিচয়ে মূল দখলদারেরা। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বিভিন্ন সভায় পাহাড় দখলদার গডফাদারদের তালিকা করার বিষয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই তালিকা হয়নি গত ১৭ বছরেও।

জানতে চাইলে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন বললেন, ‘এটা ঠিক যে, বসবাসকারীদের পেছনে ক্ষমতাশালী থাকে। সেটা আপনারাও জানেন। তাদের তালিকা করা হয়েছে কিনা এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

আকবরশাহ রেলওয়ের মালিকানাধীন পাহাড়গুলো হলো— ১ নম্বর ঝিল, ২ নম্বর ঝিল ও ৩ নম্বর ঝিল। এ ছাড়া জিয়া নগর, বিজয় নগর, কলাবাগান, বেলতলিঘোনা, শাপলা আবাসিকসহ বিভিন্ন পাহাড়ে বসতি রয়েছে। ২০২৩ সালে পাহাড় কাটার স্থান পরিদর্শনে গেলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের গাড়িতে ঢিল ছুড়েছিলেন জসিমের লোকজন। ওই মামলায় জসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়।

৫ আগস্টের পর জসিম পালিয়ে গেলে তার খামার থেকে লুট হয় শতাধিক গরু। দেড় দশকে যারা জসিমের রোষানলে ছিলেন তারা এ লুটপাটে নেতৃত্ব দেন। এখানে বর্তমান দখলদারদের মধ্যে অন্যতম ইলিয়াছ খান। আওয়ামী লীগ আমলে তিনি এলাকা-ছাড়া ছিলেন।

এ ছাড়া ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইউনুছ ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাদ্দাম হোসেন, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ রাসেল ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা নাছির উদ্দিনদের নিয়ন্ত্রণে এসব পাহাড়ে বাণিজ্য চলছে এখন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইলিয়াছ খানের দাবি, ‘এলাকায় এসে তদন্ত করেন। আমি পাহাড় ব্যবসায় জড়িত কি-না। আমি রড-সিমেন্টের ব্যবসা করি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে আমার নামে মিথ্যা রটনা চালানো হচ্ছে।’

এ ছাড়া ১ নম্বর ঝিলের বর্তমান সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২ নম্বর ঝিলের সমিতির নেতা বিএনপি নেতা মোহাম্মদ বেলাল এবং ৩ নম্বর ঝিলের নিয়ন্ত্রণ মোহাম্মদ ইলিয়াছের হাতে।

জঙ্গল ছলিমপুর পুরোটা পাহাড়ি এলাকা। ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড় কেটে এখানে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। অতীতে পাহাড়ধসে হতাহতের অনেক ঘটনাও ঘটেছে এই এলাকায়। ছিন্নমূল বাস্তুহারা সমিতি নামে একটি সংগঠন পাহাড়ের দখল, কাটা ও বেচাকেনা নিয়ন্ত্রণ করে। দুই বছর আগে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের দুই নেতা সাদেকুর রহমান ও গোলাম গফুর। গফুর জঙ্গল ছলিমপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।

২০২৪ আগস্টের ৫ আগস্টের পর এই সমিতির দায়িত্ব এখন বিএনপি নেতাদের হাতে। বর্তমান সভাপতি ছায়েদুল হক। তিনি নগর শ্রমিকদলের যুগ্ম সম্পাদক। সমিতির সাধারণ সম্পাদক বোরহান উদ্দিন জঙ্গল ছলিমপুর বিএনপি সভাপতি। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে আপসে এই পরিবর্তন হয়। এ ছাড়া এই সমিতির সঙ্গে যুক্ত আছেন নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাহান বাদশা।

সদ্য কারামুক্ত চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের নেতা মিজানুর রহমান ওরফে রাজু এ সমিতির নেতা। ৫ আগস্টের পর ছিন্নমূলে আরমান হোসেন ও মাসুদ নামে দুইজনকে খুন করা হয়। মিজানুর রহমানকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর অভিযানে গিয়ে সেখানে দখলদারের হামলায় মৃত্যু হয় এক র‍্যাব সদস্যের। র‍্যাব সদস্য হত্যা মামলায় ছায়েদুল হক ও বোরহান উদ্দিন কারাগারে রয়েছেন এখন।

বর্তমানে ২৮ হাজার পরিবারের বসবাস রয়েছে বলে সমিতির নেতারা জানান। শাহজাহান বাদশা বললেন, এখানে গরিব ছিন্নমূল মানুষজন বসবাস করছে। এ নিয়ে আদালতে রিট আছে।

জঙ্গল ছলিমপুরের আরেকটি অংশ হচ্ছে আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণে। এখানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহাম্মদ ইয়াছিন। কিছুদিন আগে সেখানে গড়ে তোলা র্যাব ও পুলিশের ক্যাম্প ভাঙচুর করা হয়। এর পর ইয়াছিনসহ দখলদারদের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

লালখান বাজারের মতিঝরনা ও বাটালি পাহাড় এলাকায় পাহাড়ের দখল বাণিজ্য রয়েছে। এখানে একসময় আওয়ামী লীগের সময়কার ওয়ার্ড কাউন্সিলর এএফ কবির মানিক এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা পাহাড়ের দখল বাণিজ্যে সম্পৃক্ত ছিলেন। মতিঝরনা এলাকায় এখন এসবের নিয়ন্ত্রণ করেন বিএনপি নেতা আবু তাহের। তিনি ইউনিট বিএনপির সম্ভাব্য সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। পাহাড় দখল করে গড়ে তোলা তার নিজের ভাড়া ঘর রয়েছে অন্তত ২০টি। একেকটি ঘরের মাসিক ভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। এখন এই এলাকায় পাহাড়ে বসবাসের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। আবু তাহের বললেন, ‘এখানে কোনো পাহাড়ই নেই। লোকজন সমতলে বসবাস করে।’