কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কিছুটা উচ্ছ্বসিত। ভয়-শঙ্কার মধ্যেও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। গ্রেফতারও হচ্ছেন। প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের জানাজায় অংশ নেওয়া কয়েকজন ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। নোয়াখালীতে পৃথক দু’টি স্থানে মিছিলের জের হিসেবে ৫ জুন শুক্রবার রাতে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের ২৪ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। একই দিনে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় বিদ্যুৎ ভবনের সামনে বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ, চট্টগ্রাম মহানগরের ব্যানারে মিছিল করে আওয়ামী লীগ। মিছিলে অংশ নেওয়া কেউ কেউ মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। এ সংক্রান্ত এক মিনিটেরও কম সময়ের একটি ভিডিও প্রচারিত হয় সামাজিক মাধ্যমগুলোতে। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর দেশে পলাতক নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা খানিকটা বেড়েছে বলা যায়।
প্রতিদিনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা ধরণের প্রচারণা চালাচ্ছেন। এদের বেশিরভাগই পলাতক বা আন্ডারগ্রাউন্ড অবস্থায় আছেন। ক্ষমতাসীন দলের কোনো দোষ-ত্রুটি পেলেই পুলকিত হন, মেতে ওঠেন তীব্র সমালোচনায়। আর প্রচারণা চালান, যেকোনো সময় দেশে ফিরে আসছেন ভারতে পালিয়ে থাকা তাদের নেত্রী শেখ হাসিনা। দলটির কোনো কোনো এক্টিভিস্ট অবশ্য হাসিনার দেশে ফিরে আসার ডেডলাইনও দিচ্ছেন। আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগেই দেশে ফিরবেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন প্রচারণাও চলছে। খুব ভোরে বা রাতের অন্ধকারে কয়েকজনের ঝটিকা মিছিল ও সামাজিক মাধ্যমে সরব থাকলেও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরা এই মুহূর্তে মোটেও সহজ হবে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, তাকে দেশ ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যারা রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন এই গ্রুপগুলো এখনও সক্রিয় ও শক্তিশালী। দেশি এবং বিদেশি কোনো শক্তিশালী পক্ষই আওয়ামী লীগ এবং দলটির পালিয়ে থাকা নেত্রীকে সাপোর্ট দেওয়ার মতো চিন্তায় নেই। ফলে আওয়ামী লীগ কর্মী বা সমর্থকরা নেত্রী (হাসিনা) ফিরবেন আওয়াজ তোলার চেষ্টা করলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ফাঁসির দড়ি ঝুলন্ত থাকাবস্থায় হাসিনা ফিরবেন এমন আশা করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, দেশ ছেড়ে যে পালিয়ে যেতে হবে তা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালেও জানতেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন বলেই, নিজের সব আত্মীয়-স্বজনকে আগেই নিরাপদে দেশ থেকে গোপনে সুবিধাজনক স্থানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফলে স্বজনদের নিয়ে শেখ হাসিনার কোনো মাথাব্যথা নেই। নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা খুবই উৎসাহী তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা বা শেখ হাসিনা কারো সাথেই কোনো যোগাযোগ নেই। বিদেশে পালিয়ে বেড়ানো নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা তথ্য-অপতথ্য ছড়িয়ে কর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করছেন।
জুলাই-গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়ার মামলাগুলোতে হাজার হাজার লোকজনকে আসামি করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের, সরাসরি আওয়ামী লীগ করেন না এমন অনেক ব্যক্তিও আসামি হয়েছেন শত্রুতাবশতঃ। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় অনেকেই জামিনে বের হয়ে এসেছেন। প্রকৃত আসামিদের সঙ্গে অনেক নিরপরাধীকে আসামি করায় নানা সমালোচনাও হয়েছে এবং হচ্ছে। অথচ যখন মামলাগুলো হয়েছে তখন শুধু অপরাধী এবং প্রকৃতপক্ষে খুনের সঙ্গে জড়িতদের আসামি করলে বাণিজ্য হতো না, সমালোচনা থেকেও বাঁচা যেত।
আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এরা মনে করেন বিদেশি কোনো শক্তি, বিশেষ করে ভারত তাঁদেরকে (আওয়ামী লীগ) আবারও ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। কিন্তু দলটির সেই অবস্থা এখনও আছে কিনা কর্মী ও সমর্থকদের সেই বিচার-বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। তাছাড়া, ভারতেরও এখন সেই অবস্থা আছে কিনা, সেটা ভেবে দেখতে হবে। ভারত নিজেরাই এ মূহূর্তে ভূ-রাজনীতির সংকটে পড়তে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো ক্রমেই চাইবে না আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক। তিন টার্ম পুরো ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনাকে সাহায্য করেছে, আর নয়- এটা হলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মার্কিন বর্তমান অবস্থান। বরং তারা আওয়ামী লীগের ফিরে আসার কোনো পথ খুলে দিতে চাইবে না, এটা স্বাভাবিক।
এদিকে আওয়ামী লীগের সিনিয়র, মাঝারি, এমনকি নিচের পর্যায়েরও যেসব নেতা গ্রেফতারের বাইরে আছেন এদের প্রায় সকলেই বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন। প্রত্যেকেই বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হয়েছেন বিগত দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট আমলে। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরিবেশ তৈরি করতে হলে এদেরকে দেশে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু এরা কেউই দেশে ফিরবেন বলে মনে হয় না, অন্ততঃ ভালো কিছু না দেখা পর্যন্ত। শেখ হাসিনা নিজের জীবনকে কতটা ভালোবাসেন এটা দেখা গেছে ওয়ান ইলেভেনের সময়। ‘টু মাইনাস’ ফর্মূলার অংশ হিসেবে ওয়ান ইলেভেন সরকার দুই নেত্রীকে বিদেশ পাঠানোর কৌশল নিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও বেগম খালেদা জিয়াকে বিদেশ পাঠানো যায়নি। কিন্তু, শেখ হাসিনা কারান্তরীণ থেকে ছাড়া পেয়েই বিদেশ পাড়ি জমিয়েছিলেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ডের আসামি। ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে তিনি হাসিমুখে ফিরে আসবেন, এটি আকাশকুসুম কল্পনা। তিনি নিজেকে ও তাঁর পরিবারকে দেশ ও দলের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন, এটা কে না জানে। দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, এটা যদি হাসিনা না জানতেন তাহলে চমৎকার একটা পরিকল্পনা সাজিয়ে তাঁর পরিবার ও আত্মীয়দের আগেই বিদেশে পাঠিয়ে দিলেন কীভাবে! এ রকম স্বজনপ্রেম দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। থেকে গেলেন এবং ধরা খেলেন শুধু একজন আত্মীয়, আমির হোসেন আমু। ‘সংস্কারবাদী’ হয়ে তিনি হাসিনার চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। আর থেকে গেলেন অনেক নেতা-কর্মী, যাঁদের কাছে আওয়ামী লীগ হলো ‘ধর্ম’।
মহিউদ্দিন আহমদ-এর বিশ্লেষণ হচ্ছে- “হাসিনা স্বেচ্ছায় ফিরবেন না। ‘সাহস থাকলে দেশে আয়’ বলে হুংকার দিলেও তিনি আসবেন না। শতভাগ নিরাপত্তার আশ্বাস না পেলে কেউ আসে না। হাসিনার মনে কী আছে, কে জানে। তবে আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করেন, বাইরের কোনো শক্তি তাঁদেরকে আবারও ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এই আশার পিদিম জ্বালিয়ে তাঁরা মাঝেমধ্যে ‘জয় বাংলা’ বলে চেঁচিয়ে ওঠেন এবং নিজেদের অবস্থান জানান দেন।”
নিরপরাধ অনেকে জুলাই হত্যা মামলার আসামি হলেও আওয়ামী লীগের চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ এবং যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ’ এনে মামলা করা যেত, কিন্তু সেটি করা হয়নি। ফলে শূন্য থেকে বুর্জুয়া বনে যাওয়া লোকেরা নতুন করে ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন দেখছেন। নানা ষড়যন্ত্রেও লিপ্ত হচ্ছেন। কিন্তু এদের এই ষড়যন্ত্র ও স্বপ্ন আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা পূর্ণ শক্তিতে ফেরার পক্ষে কোনোই সহায়ক হবে না। কোনো কারণে বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম না হলেও অথবা ব্যর্থ হলেও, প্রতিবিপ্লবের মতো কিছু হলেও তাতে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার পুনরুত্থানের কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শীর্ষনিউজ