Image description

ইতোমধ্যে তিন মাস অতিক্রম করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকার। এই সময়ে সামাজিক ও অবকাঠামো খাতে কিছু সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সাংগঠনিক কার্যক্রমে কিছুটা মন্থরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে ধারণা করছেন রাজনীতির বিশ্লেষকরা।

বিশেষ করে দলীয় কোন্দল থামাতে না পারা, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব, দলের সাংগঠনিক নেতারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করায় আগের মতো সংগঠনকে সময় দিতে না পারা, নির্দেশনা অমান্য করে ভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের দলে ভিড়ানো এবং ‘হাইব্রিড’দের আধিপত্য— সব মিলিয়ে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা কাজ করছে। সর্বশেষ গত ৩ জুন গোপালগঞ্জে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১২০০ নেতাকর্মীর বিএনপিতে যোগদানের বিষয়টিও ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। কারণ এ বিষয়েও দলের নিষেধাজ্ঞা ছিল।

এমনটি চলতে থাকলে দলে ত্যাগীরা উপেক্ষিত হন কিনা বা দলীয় কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে কিনা—সে বিশ্লেষণও করছেন কেউ কেউ। সব মিলিয়ে দল আর সরকার কি এক হয়ে গেলো? এ প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।

এ নিয়ে সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচনের পর বিএনপিতে অনেকে যোগ দিয়েছেন এটা সত্য। তবে এখনও হাইব্রিডদের তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। নতুন আগতদের বিষয়ে অবশ্য দলকে সতর্ক থাকা উচিত। আর বিএনপির মাঠ কাঁপানো অনেক নেতা সরকারে যোগ দেওয়ায় দলীয় কাজ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর মধ্যে নজরুল ইসলাম খান ও রিজভীর মতো নেতাদের হয়তো দলীয় কাজে সেভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ তাদের মতো নেতারা সব সময় নেতাকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতেন। অপরদিকে অনেক ক্ষেত্রে ত্যাগীদেরও মূল্যায়ন করা হচ্ছে না, এমন আলোচনাও আছে। বিশেষ করে হাবিব উন নবী খান সোহেলের মতো নেতাদের মূল্যায়ন না করায় তৃণমূলের অনেক নেতার মধ্যেও হতাশা তৈরি করতে পারে। আবার স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ীদেরও কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে—এটাও বোধহয় ঠিক হচ্ছে না।’’

তিনি বলেন, ‘‘জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্ব থাকলে সামনে দল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে এখনই দলের হাইকমান্ডকে ভাবা উচিত।’’

ভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের ভেড়ানোর অভিযোগ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অন্য দলের নেতাকর্মীদের দলে ভেড়ানোর বিষয়ে করা নিষেধাজ্ঞা এখনও প্রত্যাহার করেনি বিএনপি। তবে তৃণমূলে তা কমই মানা হচ্ছে। বরং দলে ভেড়ানো হচ্ছে অন্য আদর্শের নেতাকর্মীদের।

সর্বশেষ গত ৩ জুন গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. কে এম বাবরের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলাম শেখের নেতৃত্বে ১২০০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।

এছাড়া গাজীপুরের টঙ্গীতে জাতীয় পার্টির (জি এম কাদের) থানা সভাপতি সাইফুল ইসলাম খান, সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক, সহসভাপতি সালাহউদ্দিন, মজিবুর রহমানসহ শতাধিক নেতাকর্মী শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন সরকারের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এর বাইরেও চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী এবং কুমিল্লায়ও বিভিন্ন দলের বেশ কিছু নেতাকর্মী দলে যোগ দিয়েছেন।

দলীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের তিন দিন পরই ৮ আগস্ট নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ অন্য দলের নেতাকর্মীদের বিএনপিতে না নেওয়ার নির্দেশনা জারি করে দলীয় হাইকমান্ড।

সেদিন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা চিঠিতে বলা হয়, ‘‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিএনপির ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায়ের কোনও কমিটিতে অন্য রাজনৈতিক দলের কেউ বা অরাজনৈতিক কেউ যোগ দিতে পারবেন না।’’

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আবারও একই বার্তা দিয়ে নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়। কিন্তু বছর না যেতেই তা মানছেন না তৃণমূলের অনেকেই।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘অন্য দলের নেতাকর্মী বিএনপিকে যোগদানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এখনও বলবৎ রয়েছে। আমি মনে করি, সবাইকে দলের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। এরপরও যারা যোগ দিচ্ছেন, তাদের ব্যাপারেও নজরদারি থাকা উচিত।’’

থামছে না অভ্যন্তরীণ বিরোধ

বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই বেশ কয়েকটি জেলায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির খবর পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি তৃণমূল পর্যায়ে দলের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। আবার কোথাও খুনের ঘটনাও ঘটেছে।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঝিনাইদহের শৈলকূপার বিষ্ণুপুর গ্রামে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৬২ জন আহত হয়েছেন। এর আগে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী জেলা ও মহানগরে। সেখানে প্রতিপক্ষের হামলায় দুই জন নিহত হন। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়েছে।

এছাড়া হবিগঞ্জের মাধবপুর, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির চেয়ারপারসনের এক উপদেষ্টা জানান, মূলত ইদানীং তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের যোগাযোগ কম হওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। হয়তো সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলের দিকে আরও নজর দেবেন।

সাংগঠনিক নেতারা সরকারে থাকায় দলে প্রভাব পড়ছে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপির অনেক শীর্ষ সাংগঠনিক নেতা সরকারের বিভিন্ন পদে থাকায় মাঠকর্মীদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কারণ এসব নেতা ছিলেন কর্মীবান্ধব। তাছাড়া সব সময় মাঠের রাজনীতিতে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। ঢাকার বাইরেও তৃণমূলের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। কিন্তু কর্মীবান্ধব এই নেতারা সরকারে থাকায় আগের মতো দলকে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

এর মধ্যে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সামলাচ্ছেন এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের মতো বড় দফতর। তাই একান্ত কর্মসূচি ছাড়া তিনি খুব একটা দলকে সময় দিতে পারছেন না। একই অবস্থা স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর। তারাও দায়িত্ব পালন করছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে। তাদের মতো নিবেদিতপ্রাণ বিকল্প নেতৃত্বেরও কিছুটা সংকট মনে করছেন কেউ কেউ। এ কারণে দল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিনা—তাও পর্যালোচনা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘‘সরকার মাত্র তিন মাস অতিক্রম করলো। এ সময়ে সব কিছু পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে এক ধরনের পর্যালোচনা হচ্ছে। একটি নতুন সরকারের বেলায় এটি স্বাভাবিক। অতীতে বিভিন্ন সরকারের শুরুতেও এ ধরনের চিত্র দেখা গেছে। আমি মনে করি, দলের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব না কমালে সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতিশীলতা থাকবে না।’’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ বেশি দিন হয়নি। এ সময়ে তৃণমূলের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে আমার বিশ্বাস—সব কিছু গুছিয়ে নিশ্চয়ই দলের পক্ষ থেকে তৃণমূলকে আরও ঢেলে সাজানো হবে।’’