Image description

অসচেতনতা, লোভ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের পরিবেশ এখন বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। নদী-খাল, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য ও কৃষিজমি একযোগে চাপে রয়েছে। উন্নয়নের নামে কাটা হচ্ছে গাছ। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভের পানির স্তর। মরূকরণের পথে দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় জোয়ারের সঙ্গে লবণাক্ত পানি চলে আসছে দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত, যা ধ্বংস ডেকে আনছে কৃষির। এ ছাড়া বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দদূষণ কমানোই যাচ্ছে না। দুই যুগ আগে নিষিদ্ধ হওয়া পলিথিনের রাজত্ব দমাতে পারছে না কোনো সরকার। পরিবেশের এই নাজুক পরিস্থিতিতেই আজ বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণা : জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারিভাবে র‌্যালি, আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রতি বছর দিবসটি ঘটা করে পালিত হলেও দেশের পরিবেশের রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয় না। সংকট মোকাবিলায় কেবল আইন নয়, প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন ও সামাজিক সচেতনতা।

মরূকরণের ঝুঁকি : ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নদী-খালের নাব্য হারানোর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পানি সংকট তীব্র হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ১৫৩টি ইউনিয়নকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, গত ৫০ বছরে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রায় ২৩০ ফুট নিচে নেমে গেছে।

বাড়ছে তাপমাত্রা : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বাড়ছে। চলতি বছরও অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। বর্তমানে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা তাপপ্রবাহের কবলে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছ কাটা, জলাশয় ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ স্থানীয় উষ্ণতা আরও বাড়াচ্ছে।

প্লাস্টিক ও পলিথিনের আগ্রাসন : ২০০২ সালে নিষিদ্ধ হলেও পলিথিনের ব্যবহার থামেনি। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক কৃষিজমি, নদী ও জলাশয়ে জমে পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জামিলুর রহমান বলেন, পলিথিন মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট করে এবং ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এটা বন্ধ না করলে কৃষি ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংকটে পড়বে। মাইক্রোপ্লাস্টিক ইতোমধ্যে মাছ ও খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

সবুজ হারাচ্ছে দেশ : উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক সম্প্রসারণ ও দখলের কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার গাছ কাটা হচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে ১ লাখ ৮১ হাজারের বেশি গাছ কাটা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতিতে গত বছর এ সংখ্যা কমে ৫২ হাজারে নেমে এলেও পরিবেশবিদদের মতে, প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। গাছ কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণ বাড়ছে।

হুমকিতে জীববৈচিত্র্য : পরিবেশ ধ্বংসের কারণে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৯ প্রজাতির পাখি স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। একসময় ৫০ হাজারের বেশি শকুন থাকলেও বর্তমানে সংখ্যা নেমে এসেছে কয়েকশতে। গত এক শতকে বাংলাদেশ থেকে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে।

অস্তিত্ব সংকটে নদী : সরকারি তালিকায় ১ হাজার ৪০০-এর বেশি নদী থাকলেও গবেষকদের মতে, এর বড় অংশের অস্তিত্বই নেই। নদী দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে দেশের জলপ্রবাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, যা কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি। বর্তমান সরকার খাল খননের মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও নদী না বাঁচলে খালও বাঁচবে না।

বায়ু, পানি ও ই-বর্জ্য দূষণ : বায়ুদূষণে বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরীর তালিকায় নিয়মিত রয়েছে ঢাকা। শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন ও রাসায়নিক দূষণে নদী-খালের পানি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। পাশাপাশি প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও নজরদারির অভাবে এর ৯০ ভাগই নিরাপদ পুনর্ব্যবস্থাপনার বাইরে থাকছে।

শব্দদূষণের নীরব বিপদ : আইন থাকলেও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি নেই। হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন ‘নীরব এলাকা’তেও হর্নের দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শব্দ শিশুদের মানসিক বিকাশ ব্যাহত করছে এবং উচ্চ রক্তচাপসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশিষ্ট পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. এ আতিক রহমান বলেন, ‘পরিবেশ সুরক্ষায় আইন রয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি বড় সমস্যা। শুধু আইন করলেই হবে না, বাস্তবতার সঙ্গে মিল রেখে তা কার্যকর করতে হবে।’ তাঁর মতে, পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।