Image description

পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, দুই ঘণ্টার মধ্যে ওসিকে চেয়ার থেকে সরিয়েছেন এবং সেনাবাহিনীর মেজরকে পরিবর্তন করিয়েছেন। প্রতিপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিতে গিয়ে এই মন্তব্য করেছেন বলে দাবি করেছেন। তবে তার এই বক্তব্য প্রশাসনিক ও সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এমপি মাসুদের দম্ভোক্তির জোর কোথায়?

গত শনিবার দুপুরে বাউফল উপজেলার সূর্যমণি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এই বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। ওই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মজিবর রহমান বাচ্চু।

রাজনৈতিক অবস্থান

শফিকুল ইসলাম মাসুদ জামায়াতে ইসলামীর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা (ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি) এবং বর্তমান সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার দলগত অবস্থান এবং সংসদ সদস্য পদই এই ধরনের প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে অনেকে মনে করছেন।

স্থানীয় বিএনপির দুজন নেতা জানিয়েছেন, তিনি চাইলে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করতে পারেন। সরকারি কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মাঝেমধ্যে এ ধরনের উল্টোপাল্টা বক্তব্য দিচ্ছেন। তার এ ধরনের বক্তব্যের উৎস কী, খুঁটির জোর কোথায়, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি কেউ। 

অনেকেই বলছেন, বিভিন্ন সময় বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বার্তা দিচ্ছেন যে, তার কথা না শুনলে সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করে দিচ্ছেন। যেকোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তার অবধ্য হলে তাদের তিনি কঠোর ভাবে দমন করতে পারেন এবং ক্ষতিও করতে পারেন। 

ওই অনুষ্ঠানে নিজের সম্পর্কে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘ফাইজলামি করেন মিয়া। শফিকুল ইসলাম মাসুদ কী জিনিস, এইটা বাউফলের মানুষকে দেখানোর দরকার নাই; শেখ হাসিনার কাছে জাইনা নিয়েন। শেখ হাসিনার কাছে জিজ্ঞেস কইরা দেইখা নিয়েন, শফিকুল ইসলাম মাসুদ কী জিনিস। শফিকুল ইসলাম কী জিনিস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জাইনেন, ওখানকার সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসীর কাছে জিজ্ঞেস কইরেন, শফিকুল ইসলাম মাসুদ কী জিনিস। উল্টাপাল্টা কথা বইলা মটকা (মাথা) গরম করবেন না। মটকা গরম করলে সামলাইতে পারবেন না। এখন আবার নতুন আরেক গান শুরু করছেন, ভালো মানুষের খাওন নাই। কী একটা অসভ্য দেশে, কী একটা জাহেল, কী একটা মূর্খ। ভালো মানুষের খাওয়া আছে, খাওয়া থাকবে। ওই বাউফল না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। বেশি বললে সামলাইতে পারবেন না। দুই মিনিটে শেষ করে দেবো।’  

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় দুজন সাংবাদিক জানান, নির্বাচনের আগে তিনি খুবই ভদ্রভাবে কথা বলতেন, নির্বাচনের পরে আসল চরিত্র প্রকাশ পাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছেন।  

বাউফল উপজেলার একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন একজন বড় সন্ত্রাসী, তার অনেক ক্ষমতা। চাইলেই যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে বদলি করে দিতে পারেন। তার অবাধ্য হলে যেকোনো মানুষের ক্ষতিও করতে পারেন। আসলেই কী তার অনেক ক্ষমতা!’

দম্ভোক্তির জোর কোথায়?

বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীদের দুর্বল করার জন্য এসব হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের লোকদের তার দলে টানতে বিভিন্ন ধরনের কথা বলেন এবং ভয়ভীতি দেখান। যেভাবে কথা বলতেছে এতে মনে হচ্ছে একজন বড় সন্ত্রাসী। যেকোনো সময় সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি করেন। তার কথা না শুনলে সন্ত্রাসী কার্যক্রম ঘটাতেও পারেন। এগুলোর ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে তার ক্ষমতার জোর কোথায় তা জানি না।’  

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের শুরুতে পুলিশ ও প্রশাসন নিরপেক্ষ অবস্থায় ছিল। আমরাও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলাম। অনেক ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী বিজয় হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন পুলিশ, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর ওপরে বিভিন্ন ভাবে চাপ সৃষ্টি করেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ। ৮ ফেব্রুয়ারি মাসুদের নেতৃত্বে ইচ্ছাকৃতভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এতে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীরা আহত হন। পরে থানার সামনে গিয়ে মব সৃষ্টি করে এবং রাস্তা বন্ধ করে ওসি এবং বাউফল সেনা ক্যাম্পের ক্যাপ্টেনের বদলির দাবি করেন মাসুদ ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা। ওই সময় ক্যাপ্টেনেকে বদলি করা হয় এবং ওসিকে নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনী নির্বাচনে জামায়াতের পক্ষে কাজ করে। এতে তার জয় নিশ্চিত হয়ে যায়।’

পটুয়াখালী-২ আসনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী শহিদুল আলম তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাসুদকে শেখ হাসিনা চেনেন। রাজশাহীর বড় বড় সন্ত্রাসীরাও চেনেন, সেও একজন সন্ত্রাসী। বাউফলে কীভাবে এমপি হয়েছেন এটা এখন সবারই প্রশ্ন। তার এমপি হইতে ভোট লাগে নাই, এ কথা সভা-সমাবেশ বলে বেড়ান। নির্বাচনের শেষ দিকে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তার পক্ষে কাজ করেছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেক নির্যাতন করেছে সেনাবাহিনী ও পুলিশ প্রশাসনের লোকজন। ফলে ভোটের ফলও বদলে যায়।’

যা বলছেন শফিকুল ইসলাম মাসুদ

এমন বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মরহুম বাবা ও শ্বশুর এবং স্ত্রীকে নিয়ে যেভাবে মিথ্যা ও অশালীন কথাবার্তা সামাজিক যোগাযোগে প্রচার করা হচ্ছে, তা কোনও সুস্থ মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। তাদের উদ্দেশ্য করেই কিছু কথা বলেছি। তবে অনেক ভালো কথাও বলেছি, তাও প্রচার করা উচিত। বক্তব্যের একটি অংশ প্রচার করছে একটি পক্ষ।’

একজন এমপি কী এমন দম্ভোক্তি করতে পারেন?

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মাসুদের বক্তব্যটি শুনেছি। আমি মনে করি এ ধরনের দম্ভোক্তি শুধু সংসদ সদস্য নয়, কোনও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও দেওয়ার সুযোগ নেই। এসব আচরণের মাধ্যমে ব্যক্তির পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি ফুটে ওঠে।’

এক্ষেত্রে সংসদের পক্ষ থেকে কোনও পদক্ষেপ নেওয়ার বিধান আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সংদের বাইরে অনেক সদস্য অনেক কথা বলতে পারেন। এতে আমাদের কিছু করার থাকে না। তবে ভেতরে আচরণগত কোনও বিষয় থাকলে অবশ্যই নোটিশ করার রেওয়াজ আছে।’