সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ এবং সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতকে ঘিরে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও ব্লিটজ পত্রিকার সম্পাদক সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাতের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেছেন।
তিনি বলছেন, আরাফাত শুধু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ও অনলাইন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন না, বরং ভারতে অবস্থানরত দলটির সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরানো ঠেকিয়ে দলের নেতৃত্ব কাঠামো পরিবর্তনেরও পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছেন।
সাংবাদিক শোয়েব চৌধুরীর এই অভিযোগ ও দাবির সত্যতা সুখবর ডটকমের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বলে আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তি মোহাম্মদ এ আরাফাতের বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শোয়েব চৌধুরী বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্লেষণধর্মী মতামত দিয়ে আসছেন। তার লেখনী ও পর্যবেক্ষণ অনেক পাঠকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। সমসাময়িক রাজনীতি, ভূরাজনীতি ও কৌশলগত বিষয় বিশ্লেষণে তিনি একজন অভিজ্ঞ ও সাহসী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তার অনুসারীদের অনেকের মতে, ঘটনাপ্রবাহের গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
নিজের পোস্টে শোয়েব চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের সঙ্গে আরাফাত ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন একটি গোষ্ঠী জড়িত ছিল। এমনকি তিনি দেশের ইতিহাসের বহুল আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার সঙ্গেও এই গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন। সামাজিক মাধ্যমে তার এই বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রশ্ন আরও বেশি সামনে আসে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সময় সময় নেতৃত্বের পরবর্তী ধাপ, নতুন প্রজন্মের ভূমিকা এবং সাংগঠনিক পরিবর্তন নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে।
সালাউদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর অভিযোগ, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ওপর আরাফাত প্রভাব বিস্তার করছেন। তার দাবি অনুযায়ী, আরাফাত জয়কে নিজের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আওয়ামী লীগের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং দীর্ঘমেয়াদে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে জয়ের নেতৃত্বে নতুন ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করতে চাইছেন। যেখানে জয় হবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি, আরাফাত হতে চাচ্ছেন সাধারণ সম্পাদক।
যদিও আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি, তারপরও বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ, বর্তমানে রাজনৈতিক যোগাযোগ, প্রচারণা এবং জনমত তৈরির ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে দলীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা থাকলে সেটি ভবিষ্যতের নেতৃত্ব কাঠামোতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
শোয়েব চৌধুরীর পোস্টে আরও বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সম্ভাব্য ঘোষণা দেওয়ার পর আরাফাত গোষ্ঠী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। কারণ হিসেবে তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনার নাম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনা এবং কারাবন্দী নেতা-কর্মীদের সহায়তার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই অর্থের ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তিনি লেখেন, আরাফাত গ্যাং গত দুই বছর শেখ হাসিনার নাম ভাঙ্গিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও কারাগারে আটক আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের দেখভাল ও আইনি সহায়তা দেওয়ার নামে প্রতি মাসেই কমপক্ষে পঁচিশ কোটি টাকা সংগ্রহ করছে।
এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসার পর সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ কেউ এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন, আবার অনেকে একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, দলের সংকটময় পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি তৈরি এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন উসকে দিতেই এসব বক্তব্য প্রচার করা হতে পারে।
শোয়েব চৌধুরী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আরাফাত প্রথমে নেপাল, পরে ভুটান এবং সেখান থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তিনি প্রশ্ন তোলেন—একজন পলাতক ব্যক্তি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলেন এবং তার বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে কি না। যদিও এসব দাবির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পোস্টে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত প্রসঙ্গ। শোয়েব চৌধুরী তার পোস্টে ভারতের একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের প্রসঙ্গ তুলে দাবি করেন, এ ধরনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তি আরাফাতের ঘনিষ্ঠ। সেখান থেকে তিনি প্রশ্ন তোলেন, আরাফাত নিজেও কোনোভাবে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত কি না।
তার পোস্টে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে এবং তাকে কলকাতায় যাওয়া থেকেও বিরত রাখার জন্য নেপথ্যে তৎপরতা চলছে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক বার্তা ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকেও তিনি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
শোয়েব চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কাজ করছেন এবং আন্তর্জাতিক মহলে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। দলের বিভিন্ন স্তরের নেতারা দলীয় ঐক্য বজায় রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও আলোচনা করছেন বলেও তিনি জানান।
তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন, জুন মাসে শেখ হাসিনা যেন কোনোভাবেই দিল্লি থেকে কলকাতায় চলে না যেতে পারেন, এ বিষয়েও নানামুখী অপতৎপরতা চালাচ্ছে আরাফাত গ্যাং। ভারতের নীতিনির্ধারকদের বোঝানোর চেষ্টা করছে, পশ্চিমবঙ্গে গেলে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো খারাপ হবে।
তিনি জানান, আওয়ামী লীগের কিছু প্রভাবশালী নেতা, যেমন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, সাবেক সংসদ সদস্য রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বাস্তবায়িত করতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশের প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক এবং মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে তারা যোগাযোগ রাখছেন। শেখ হাসিনা নিজেও চান বাংলাদেশে ফিরে তার আইনি বিষয়গুলো মোকাবেলা করতে।
সব মিলিয়ে শোয়েব চৌধুরীর পোস্টে উপস্থাপিত অভিযোগগুলো দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্ক, সামাজিক মাধ্যমের আলোচনা এবং বিভিন্ন মহলের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও তথ্য বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য সামনে এলে পুরো বিষয়টির বাস্তবতা সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।