জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও এখনও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি। দলটির সাংগঠনিক পরিসর দিনদিন বড় হলেও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তি নতুন এই দলটিতে যোগ দিচ্ছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলের পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। তবে ‘আগে নির্বাচন, পরে দলের কাজ’— এমন নীতিতে চলায় আত্মপ্রকাশের ১৫ মাস পরও এনসিপি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি।
দলীয় সূত্র বলছে, দলের নিবন্ধন ও প্রতীক পেতেই দীর্ঘ সময় লেগেছে। এরপর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের মনোযোগ দিতে হচ্ছে। নির্বাচন আর দ্রুত বিস্তারের পথে হাঁটতে গিয়ে দলটি এখনও পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো গঠনে দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারেনি। কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে দল বড় হলেও সাংগঠনিক ভিত দুর্বল থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন দলটির সিনিয়র নেতারাই।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমাদের আহ্বায়ক কমিটি প্রতিনিয়ত বর্ধিত হচ্ছে। এটি এখন একটি চলমান ও ক্রমবর্ধমান কমিটি। এই মুহূর্তে যদি আমরা কাউন্সিল করি, তাহলে একটি সমস্যা তৈরি হবে। কারণ, আজও মানুষ দলে যোগ দিচ্ছে, আগামীকালও যোগ দেবে। আজ কাউন্সিল করলে আগামীকাল যারা যোগ দেবে, তারা দলের নেতৃত্ব নির্ধারণে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় একটি রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার নজির খুব কম। সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের আহ্বায়ক কমিটিকে আগে একটি স্থিতিশীল জায়গায় আনতে হবে। এরপর যারা ভোটাধিকারপ্রাপ্ত হবেন, তাদের ন্যূনতম একটি সময় দলের সদস্য ও কাউন্সিলর হিসেবে পরিপক্ব হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তারপর আমরা কাউন্সিল আয়োজন করতে পারব।’

আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘এখন যদি কাউন্সিল দেওয়া হয়, তাহলে কাউন্সিলরদের যোগ্যতা ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মূল সমস্যা হবে। কারণ, দল এখনও ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই অবস্থায় কাউন্সিল করে কমিটি গঠন করা হলে, ভবিষ্যতে সেই কমিটিও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। সে কারণেই আমি মনে করছি, বর্তমান আহ্বায়ক কমিটিকে আরও সম্প্রসারণ, শক্তিশালী ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এরপরই আমরা কাউন্সিলের দিকে এগোতে পারব।’
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে গঠিত দলটি আত্মপ্রকাশের দিনই দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। দল ঘোষণার সময় প্রথমে ১৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে সেটি বাড়িয়ে ১৭১ সদস্য এবং পরবর্তীতে ২১৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। এখনও প্রতিনিয়ত কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির আকার বাড়ছে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশের পর ১৫ মাস পেরিয়ে গেলেও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনও পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করতে পারেনি। ‘আগে নির্বাচন, পরে দলের কাজ’— এই নীতিতে চলায় দলটির সাংগঠনিক কাঠামো এখনও আহ্বায়ক কমিটিনির্ভর রয়ে গেছে। কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত অধিকাংশ ইউনিটেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় সাংগঠনিক ভিত দুর্বল থেকে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন খোদ দলের সিনিয়র নেতারা
দলীয় সূত্রমতে, বর্তমানে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যক্রম এখনও মূলত আহ্বায়ক কমিটিনির্ভর। কেন্দ্র থেকে জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে একের পর এক আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে দৃশ্যমান কার্যক্রমের অগ্রগতি কম। দ্রুত সাংগঠনিক বিস্তারে গুরুত্ব দেওয়ায় এখন পর্যন্ত অধিকাংশ ইউনিটেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। দলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন আখতার হোসেন। এছাড়া মুখ্য সমন্বয়ক, যুগ্ম সমন্বয়ক ও বিভিন্ন অঙ্গ-সংগঠন নিয়েও দলটি সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

এনসিপি আত্মপ্রকাশের পর থেকেই নতুন রাজনৈতিক ধারা ও তরুণ নেতৃত্বের বার্তা দিয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন জেলা সফর, কর্মসূচি, রাজনৈতিক সংলাপ এবং নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে দলটি দ্রুত জনভিত্তি তৈরির চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে জাতীয় যুবশক্তি, জাতীয় ছাত্রশক্তিসহ অঙ্গ-সংগঠন গঠনের কাজও শুরু করেছে।
দলের ভেতরের একাধিক নেতা বলেন, দ্রুত সম্প্রসারণের চেয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করা জরুরি ছিল। পূর্ণাঙ্গ কমিটি, সদস্য সংগ্রহ, ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণে গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেক জায়গায় দলীয় কার্যক্রম ব্যক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে অনেকে দল থেকে চলে গেছেন। তাদের ফেরানোর তাগিদ না থাকলেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দলে ভেড়াতে চাচ্ছে এনসিপি। প্রতিষ্ঠার সময়ের নেতৃবৃন্দ ফিরলে নতুন নেতৃত্ব হারানোর ভয়েও তাদের ভেড়াচ্ছেন না বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির সিনিয়র এক নেতা বলেন, এনসিপি অল্প দিনের মধ্যে বড় দল হওয়ার চেষ্টা করছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রতিনিধি সংসদে গেছে। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকাও দেখা মতো। আমরা সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই। আমাদের দলের ভিশন কী, তা মানুষকে আগে বোঝাতে চাই। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা গঠিত হয়েছি। আমাদের দলকে গুছিয়ে নিতেও সময় একটু লাগবে।
তবে, দলটি দ্রুত বড় হলেও সাংগঠনিক কাঠামো এখনও দুর্বল— স্বীকার করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন আহ্বায়ক কমিটির ওপর নির্ভরশীল থাকায় সমন্বয়হীনতা ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের অভিযোগও রয়েছে। জামায়াতের সঙ্গে জোটের নামে দলকেও ভেঙে ফেলা হয়েছে। সেটি রিকভারি করে উঠতেও সময় লাগবে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি, সদস্য সংগ্রহ অভিযান ও নিয়মিত সাংগঠনিক কার্যক্রম সক্রিয় রাখা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে থাকা কঠিন হতে পারে।
এসব বিষয়ে এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মিডিয়া সেক্রেটারি ইয়াসির আরাফাত ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘সাংগঠনিক অন্যান্য কাজের চাপে এ বিষয়টি হয়ে ওঠেনি। তবে, অচিরেই এ বিষয়েও কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেবেন এবং তা সবাই জানতে পারবেন।’