পুলিশের ‘নাটাই’ এখনো রাজনীতিকদের হাতে-চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এমন মন্তব্য অনেকে করতে চান না। বেশির ভাগ মানুষ বিশ্বাস করতে চান-সত্যিই এবার পেশাদার পুলিশবাহিনীর দেখা পাবে জনগণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো-পেশাদার পুলিশবাহিনী গড়ে তোলা এখনো অনিশ্চিত গন্তব্যের পথেই হাঁটছে। বর্তমান সরকারের মাত্র আড়াই মাসে এখনই এমন মন্তব্য করার সময় আসেনি বলা হলেও পূর্বাভাস ভালো মনে হচ্ছে না।
সারা দেশে পুলিশের মধ্যে একধরনের নিষ্ক্রিয়তা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে যুগান্তরের কাছে এমন মন্তব্য করেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তারা বলেন, আমাদের দেশে ঐতিহাসিকভাবে পুলিশকে নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করে থাকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। আবার পুলিশের মধ্যেও একশ্রেণির দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকেন।
জুলাইয়ের বর্ষা বিপ্লবের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল-এমন পুলিশ তারা আর দেখতে চান না। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নানা ব্যর্থতা এবং একধরনের রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে পুলিশ ওই অর্থে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ওপর। যে কারণে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ২০ মাসে চাঞ্চল্যকর বহু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিশাল জয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করার পর আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনাসহ পুলিশবাহিনীর মেরুদণ্ড আরও সোজা করতে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো-পুলিশবাহিনীতে ফের রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পুলিশের পদোন্নতি ও পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, পুলিশের কাউকে চেইন অব কমান্ড ভাঙতে দেওয়া হবে না।
তবে অভিযোগ উঠেছে, ইতোমধ্যে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দলীয় পরিচয় জাহির করে বিশেষ সুবিধা বাগিয়ে নিতে তৎপর। নীরবে একধরনের দলবাজি চলছে পুলিশে। এমনকি বহুল আলোচিত ‘ডিবি হারুন’ কিংবা বেনজীরের মতো ক্ষমতার ছড়ি ঘোরনোর খায়েশ ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মধ্যে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেশাদারির অভাবে অভ্যুত্থানের দীর্ঘ সময় পরও সেভাবে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না পুলিশবাহিনী। বরং পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে প্রকাশ্যে নানা ধরনের অপরাধ ঘটিয়ে দুষ্কৃতকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। থানায় জানালেও যথাসময়ে আইনগত সহায়তা মিলছে না। এছাড়া অস্ত্র, মাদক উদ্ধার এবং তালিকাভুক্ত দাগি অপরাধীদের গ্রেফতারে সেভাবে পুলিশি উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
এত বড় রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পরও পুলিশকে সম্পূর্ণ পেশাদার বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলা যাচ্ছে না কেন-এমন প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সংস্কার কমিশনের অন্যতম সদস্য এবং সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি গোলাম রাসূল বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের রাজনৈতিক ব্যবহার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি। এক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের স্বেচ্ছা বিচ্যুতিও কম দায়ী নয়। তবে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দলীয় পরিচয় নিয়ে সামনে আসা কর্মকর্তাদের তেমন একটা প্রাধান্য দেন না বলে শুনেছি। এটা আমাদের আশান্বিত করে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন আরও কিছুদিন টিকিয়ে রাখার পক্ষে আমরা মতামত দিয়েছিলাম। এতে সরকার এবং পুলিশ সদর দপ্তরের মধ্যে একটি মনিটরিং ব্যবস্থা চালু থাকত। কিন্তু সেটা হয়নি। তবে সরকার যদি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করে, সেক্ষেত্রে পুলিশবাহিনীতে কিছুটা হলেও সংস্কার হতে পারে।
এদিকে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমানে পুলিশবাহিনীর এমন দুরবস্থার পেছনে একাধিক বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা। পুলিশ মনে করে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যেসব পুলিশ সদস্য হতাহতের শিকার হয়েছেন, তার বিচার হওয়া উচিত। যেভাবে বিচার হচ্ছে পুলিশের গুলিতে হতাহতের।
তবে পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে খোদ বাহিনীর ভেতরেই দ্বিমত রয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকে বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানে পুলিশ নিছক আত্মরক্ষায় গুলি চালিয়েছে-বিষয়টি এমন নয়। বরং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া লাখো মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে সে সময় পুলিশ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের বুকে গুলি চালাতে এতটুকু দ্বিধা করেনি। তাই এক্ষেত্রে শুধু জানমাল এবং আত্মরক্ষার অজুহাত দিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক ব্যবহার : সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশবাহিনী কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। পরে যাদের নেতৃত্বের আসনে বসানো হয় তাদের ক্ষেত্রে পেশাদারত্বের বদলে মূলত দলীয় আনুগত্যকে দেওয়া ছিল মুখ্য। ফলে আগস্টের পর তারা উচ্চমানের পেশাদারত্ব নিয়ে বাহিনীকে সেভাবে নেতৃত্ব দিতে পারেননি। এমনকি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ সবাইকে হতাশ ও ব্যথিত করে।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপার যুগান্তরকে বলেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক বার্তা ছড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো-ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে একশ্রেণির পুলিশকে দিয়ে যেভাবে রাজনৈতিক নিপীড়ন, হত্যা এবং গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটানো হয়েছে-এখন সে ধরনের কিছু হচ্ছে না। বরং পুলিশ এ বিষয়ে খুবই সতর্ক। এমনকি সরকার কোনো অন্যায় নির্দেশ দিলেও পুলিশের বেশির ভাগ সদস্য আগের মতো তা আর প্রতিপালন করবে বলে মনে হয় না। কারণ এসব অপকর্ম করে পুলিশের অনেকে এখন জেলে আছেন, কেউ আবার পালিয়ে গেছেন। ফলে অপরাধ বিজ্ঞানের ভাষায় পুলিশ এক ধরনের ‘ট্রিগার সাইনেস’-এ ভুগছে।
এক প্রশ্নের জবাবে কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্য যে, এত বড় গণ-অভ্যুত্থানের পরও পুলিশের কিছু সদস্যের যেন শিক্ষা হয়নি। কেউ কেউ আওয়ামী স্টাইলে ফের গ্রেফতার বাণিজ্যসহ নানারকম টর্চারের পথ বেছে নিয়ে দুহাতে টাকা কামাতে মরিয়া হয়ে গেছেন। অথচ আমরা শুনি তাদের নাকি কিছুই হবে না। কারণ তারাও রাজনৈতিক লিংকে অনেক ক্ষমতাধর। আমরা বলব, তাদের এখনই থামাতে হবে। তা না হলে আমরা যে পেশাদার আধুনিক পুলিশবাহিনীর স্বপ্ন দেখছি তা রাজনীতিসহ নানা নিয়ন্ত্রণের ফাঁদে বন্দি হয়ে যাবে।’
এদিকে বর্তমানে বাহিনীর এমন স্থবিরতার পেছনে ঘন ঘন বদলিকেও অন্যতম কারণ হিসাবে দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাহিনীর অন্তত ৮০ শতাংশ রদবদল করা হয়। এতে পুলিশের সর্ববৃহৎ ইউনিট হিসাবে ডিএমপি (ঢাকা মহানগর পুলিশ) সর্বোচ্চ ক্ষতির মুখে পড়ে। অনেককে রাতারাতি মফস্বল থেকে এনে ঢাকায় পদায়ন করা হয়। কিন্তু তাদের পক্ষে এখনো সেভাবে রাজধানীর রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অপরাধের ধরন বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি।
উদাহরণ দিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, অভ্যুত্থানের পর ডিএমপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাইবার এবং এন্টি টেরোরিজম ইউনিট থেকে গণবদলি করা হয়। অথচ বিশেষায়িত এ দুটি ইউনিটে পেশাদারত্ব দেখাতে হলে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ এবং বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ফলে নতুন করে দক্ষ জনবল তৈরির আগ পর্যন্ত এখান থেকে তেমন ভালো কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। আর প্রশিক্ষণ পেলেও অভিজ্ঞতা একদিনে সঞ্চয় করা সম্ভব নয়। অবশ্য এমন অভিযোগও সত্য যে, আওয়ামী লীগ আমলে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের বড় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার বদল হলেই বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর রেওয়াজ বাহিনীতে এক ধরনের নেতিবাচক বার্তা দেয়। এতে পেশাদার কর্মকর্তারাও শঙ্কিত হন। তারা মনে করেন, ফের পটপরিবর্তন হলে হয়তো তাদেরও এভাবে চাকরি হারাতে হবে। অপরদিকে চাকরিতে যাদের স্বল্পমেয়াদকাল রয়েছে তারা রাজনৈতিক সুবিধা লাভের আশায় আরও বেশি করে দলীয় আনুগত্য দেখাতে মরিয়া। এভাবে পুলিশবাহিনী এক ধরনের দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছে। এই ঘেরাটোপ থেকে পুলিশবাহিনী যেন বের হতে পারছে না।
তবে সুপরিচিত কয়েকজন পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পুলিশকে যদি সত্যিকারার্থে জনগণের বাহিনীতে পরিণত করতে হয় তাহলে সবার আগে রাজনীতিবিদদের ঠিক হতে হবে। তাদের জনগণের সামনে ওয়াদা করতে হবে যে, তারা কোনোভাবে কখনো পুলিশকে দলীয় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার কিংবা অপব্যবহার কোনোটাই করবেন না। মনে রাখতে হবে, রাজনীতিবিদরা এমন ওয়াদা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করবেন এবং পুলিশকে আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার এখতিয়ার দেবেন, সেদিন থেকে পুলিশবাহিনীতে আর কোনো ‘ডিবি হারুন’ তৈরি হবে না। কিন্তু আগের মতো যদি জনগণের সামনে বক্তৃতায় এক ধরনের কথা বলি, আর গোপনে পুলিশকে ঠিকই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে থাকি-তাহলে পেশাদার পুলিশবাহিনী গড়ে তোলা অনিশ্চিত গন্তব্যের পথেই হাঁটতে থাকবে।