Image description

আগামী এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা কওমিধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সাত সদস্যের কমিটিও গঠন করে দিয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে কওমিধারার চারটি দল নির্বাচনী জোট করে। এই জোটে রয়েছে মাওলানা মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, মাওলানা আবদুল বাছিত আজাদের খেলাফত মজলিস, সারওয়ার কামাল আজিজির নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টি ও মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। চারটি দলের শীর্ষ নেতৃত্বই কওমি ধারার অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন শীর্ষ পদে রয়েছেন।

এর বাইরে কওমিধারার আরেক রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপির সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করে। অন্যদিকে শুরুতে জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলেও শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে গিয়ে এককভাবে নির্বাচন করে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

আদর্শগত বিরোধের কারণে ঐতিহাসিকভাবে কওমি ধারার আলেমদের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিরোধ রয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটে থাকা অবস্থায় জামায়াতের সঙ্গে কওমিধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য হলেও পৃথকভাবে জামায়াতের সঙ্গে তাদের ঐক্য হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যতিক্রমভাবে চারটি কওমি ধারার রাজনৈতিক দল জামায়াতের সঙ্গে জোট করে। নির্বাচনের পরে বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য ধরে রেখে তারা আন্দোলনও করছে।

তবে নির্বাচনের আগে থেকেই হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী এর তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন। নির্বাচনের পরেও জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য অটুট রাখায় বিভিন্ন সময় তিনি নিজের অসন্তুষ প্রকাশ করেছেন।

এর ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় তাঁর উপস্থিতিতে প্রসঙ্গটি নিয়ে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থিত অন্তত দুজন শীর্ষ হেফাজত নেতা স্ট্রিমকে জানিয়েছেন, জামায়াতের বিষয়ে আমিরের অবস্থান সব সময় একমুখী ছিল। ওই বৈঠকে তিনি জামায়াতজোটে থাকা হেফাজত নেতাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন।

পরে উপস্থিত শীর্ষ নেতারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জোটে থাকাদের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজনের বিষয়ে যুক্তি তুলে ধরেন। এরপরে আলোচনা করে হেফাজত আমিরকে জানানোর জন্য এক মাসের সময় দিয়ে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়।

কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে হাটহাজারি মাদ্রাসার মুফতি জসিম উদ্দিনকে। সদস্য রাখা হয়েছে হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান, হেফাজতের নায়েবে আমির ও মধুপুরের পীর আল্লামা আব্দুল হামিদ, আল্লামা সালাহ উদ্দীন নানুপুরী, ডিআইটি পীর আল্লামা আব্দুল আউয়াল, মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী ও মুফতি বশীরুল্লাহকে।

এর বাইরে নিজেদের দাবি তুলে ধরার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করে সাক্ষাতের সময় নির্ধারণ করতে চার সদস্যের এবং দেশব্যাপী ‘শানে রেসালাত সম্মেলন’ বাস্তবায়ন করতে সাত সদস্যের আরও একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, হেফাজতভুক্ত নেতারা জামায়াতের সঙ্গে এখনও জোটভুক্ত থাকবেন নাকি ভিন্ন কোনো চিন্তাভাবনা আছে, এটা নিশ্চিত হতেই হেফাজতের শীর্ষ মুরুব্বিদের নিয়ে একটি সাব কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বসে তাদের মনোভাব জেনে আমিরকে রিপোর্ট করবেন। তাদের রিপোর্টের ভিত্তিতে পরবর্তীতে পরামর্শ হবে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেরও যুগ্ম মহাসচিব। বিএনপির সমর্থন নিয়ে সংসদ নির্বাচনও করেছেন তিনি। স্ট্রিমকে বলেন, হেফাজত নেতাদের জামায়াতের সঙ্গে থাকা-না থাকার বিষয়টি সিদ্ধান্তে তারতম্যের সৃষ্টি করবে নিঃসন্দেহে।

হেফাজতের আরেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীও কমিটি গঠনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। স্ট্রিমকে তিনি জানিয়েছেন, হেফাজতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। জামায়াত প্রশ্নে হেফাজত আমিরের অনড় অবস্থানের কথা সবাই জানে। জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের মনোভাব বোঝার জন্যই এই কমিটি করা হয়েছে।

তবে কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এর পক্ষে-বিপক্ষে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যুক্তি-পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করছেন। সেখানে অনেকে বলছেন, মূলত মাওলানা মামুনুল হকের জামায়াত-ঘনিষ্ঠতার কারণেই এই কমিটি করা হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাঁকে হেফাজত থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।

তবে এই কথা মনির হোসাইন কাসেমী ও আজিজুল হক ইসলামাবাদী দুজনই বাতিল করে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, জামায়াত জোটে মামুনুল হক ছাড়াও হেফাজতের গুরুত্বপূর্ণ আরও অনেক নেতাই রয়েছেন। জোটে থাকায় হেফাজতের সঙ্গে দলটির আদর্শিক বিরোধের জায়গাটি নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এ থেকে বাঁচার উপায় বের করতে চায় হেফাজত।

এ বিষয়ে জানতে কমিটিতে থাকা হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, নায়েবে আমির ও মধুপুরের পীর মাওলানা আব্দুল হামিদ, নায়েবে আমির আল্লামা সালাহ উদ্দিন নানুপুরীকে ফোন করা হয়। তাঁরা কেউই ফোন রিসিভ করেননি।