মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতি এবং জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক দলীয় ভূমিকা সংক্রান্ত বিতর্কে জাতীয় সংসদে ক্রমশ চাপের মুখে পড়ছে জামায়াতে ইসলামী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই দলটির ঐতিহাসিক অবস্থান ও অতীত দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ঘনীভূত হতে শুরু করে।
এর মধ্যেই দলটি রাজনৈতিকভাবে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে; একদিকে রাজপথে নতুন বাস্তবতায় সংগঠিত ও সক্রিয় উপস্থিতি, অন্যদিকে সংসদীয় রাজনীতিতে অতীত বিতর্কের চাপ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফল ও মাঠপর্যায়ের জনসমর্থনকে ভিত্তি করে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও ‘দেশপ্রেমিক’ অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্জিত পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে দলটি যেখানে নিজেদের পুনর্বিন্যাস ও প্রভাব বিস্তারের সুযোগ খুঁজছে, সেখানে জাতীয় সংসদের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে ধারাবাহিক প্রশ্নবাণ তাদের অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলছে।
ফলে একদিকে দলটিকে ৫ আগস্ট-পরবর্তী আন্দোলনের রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব ও অর্জনকে রক্ষা করার লড়াই চালাতে হচ্ছে, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক দায় ও জবাবদিহির চাপ তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে ক্রমশ সীমিত করে দিচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা জামায়াতকে এখন এক জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে দাঁড় করিয়েছে।
জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর অতীত ভূমিকা ও মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর বিষয়টি রাজনৈতিক পরিসরের বাইরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্ককে ঘিরে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান জোরালো করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অতীত শাসন, কর্তৃত্ববাদ ও রাজনৈতিক আচরণের প্রসঙ্গও সামনে আনছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে উত্থাপিত এ বিতর্ক একধরনের পাল্টা-বিতর্ক তৈরি করেছে, যেখানে জামায়াতকে ঘিরে সমালোচনার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট হচ্ছে এবং পুরোনো বিতর্কগুলো নতুন প্রেক্ষাপটে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ও ৭১ সালের তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক শুরু হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও বেড়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, গতকাল মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান সংসদে বিস্ফোরক বক্তব্য দেন। তিনি ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করার তীব্র বিরোধিতা করেন।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের যোদ্ধাদের আমি ছোট করে দেখছি না। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আমি নিজেও এই আন্দোলনে ছিলাম। শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত আমার যুদ্ধ চলবে বলেছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্ট কোনো বিপ্লব নয়, এটি হলো গণঅভ্যুত্থান। সেই গণঅভ্যুত্থানকে যারা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুলনা করতে চায়, আমি বলবো এটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম একদিনে হয়নি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ১৯৭১ সনে শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন।’
সংসদে স্বাধীনতাবিরোধীদের উদ্দেশ্য করে এই প্রবীণ রাজনীতিক বলেন, ‘যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, এদেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে— ততদিন মুক্তিযোদ্ধারা জিতবে, রাজাকাররা কোনোদিন এদেশে জয়লাভ করতে পারবে না।’
ফজলুর রহমান নিজের বক্তব্যে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াতে ইসলাম করতে পারে না। কোনো শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। করলে এটা ডাবল অপরাধ।’
তিনি জামায়াতকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, ‘তারা বলেছিল কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। যুদ্ধ হইছে, সেদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’
এ নিয়ে সংসদে তুমুল সমালোচনা শুরু করে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা। ফজলুর রহমানকে জবাব দিতে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘নিজের অবদান বলতে গিয়ে আরেকজনের অবদানের ওপর হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। আমি কোন দল করব, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার অধিকারও কারও নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের সন্তান হিসেবে জামায়াত করা যাবে না— এমন কোনো বিধান সংবিধান বা রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। এই মন্তব্য নাগরিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ এবং গুরুতর অপরাধ।’
জামায়াতের অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করে ‘আমরা রাজাকারের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি’ বলে মন্তব্য করেন ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে তরুণ সমাজ যে অত্যাচার দেখেছে, তা হয়তো তারা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি বলেই বারবার শুধু জুলাইয়ের ৩৬ দিনের কথা বলে। শেয়ার মার্কেটের দরবেশের লুটপাট, বিডিআর বিদ্রোহ, হেফাজতের আলেমদের ওপর নির্যাতন, চ্যানেল ওয়ান বা দিগন্ত টিভি বন্ধ করে দেওয়া— এসব তারা হয়তো শুনেছে, কিন্তু ফিল করেনি।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা (জামায়াত) ডাবল স্ট্যান্ডার্ড করছেন। আপনারা একবার রাজপথে অভ্যুত্থানের ডাক দেন, আবার অন্য কথা বলেন।’ এ সময় তিনি একটি উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘জিয়া পরিবার থেকে মানুষকে মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।’
পার্থর বক্তব্যের তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পার্থ সাহেব খুব ভালো ডিবেট করেন, অনেক মেটেরিয়ালস নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তিনি আমার নামে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা আমি বলিনি। জিয়া পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার মতো এ ধরনের বেপরোয়া কথা আমি কারও নামেই বলি না, এমনকি শেখ হাসিনার পরিবারের নামেও বলি না।’
তিনি ব্যারিস্টার পার্থর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘বক্তব্যের মাধুর্য ছড়াতে গিয়ে আমার ওপর মেহেরবানি করে এই ধরনের দয়া যেন উনি না করেন। সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো ডকুমেন্ট হাতে নিয়ে রেফারেন্স দিলে তা পরিষ্কার ও সুনির্দিষ্ট হওয়া উচিত। কনফিউজিং ওয়েতে কিছু প্রেজেন্ট করলে সমস্যা তৈরি হয়।’
পরে ব্যারিস্টার পার্থ পুনরায় ফ্লোর নিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা একটি জোটের প্রধান। আমি উনার নাম দিয়ে শুরু করলেও ওই উক্তিটি মূলত উনাদের জোটের অন্য এক নেতার। এখানে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। ডিজিটাল যুগে মিথ্যা বলার কোনো সুযোগ নেই।’
জামায়াতের সমালোচনা করে বিএনপির সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক ‘গুপ্ত হচ্ছে স্বৈরাচার গুপ্তের বাবা রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেন।
যে বিষয়টি নিয়ে মূলত সংসদে দলটিকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেটি নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলে ১৯৬৯, ১৯৭০ তৎকালীন নেতারা কি করেছিলেন, সেটির ফিরিস্তি তুলে ধরেন চট্টগ্রাম-১৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী। জামায়াতের এ নেতা দাবি করেন, ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করতে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের মাধ্যমে আন্দোলন করেছিল এবং সেই সময় সবচেয়ে বেশি অর্থের জোগান দিয়েছিল।
শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘জাতি জামায়াতে ইসলামীকে এবারের নির্বাচনে ভোটের সংখ্যার দিক থেকে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে যে আমরা দেশপ্রেমিক। জামায়াতের ইতিহাস হলো গণতন্ত্র উদ্ধার করা।’
তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর অধ্যাপক গোলাম আযমের পক্ষ থেকে শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বানের বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শাহজাহান চৌধুরী এসব দাবি ১৯৭১ সালের জামায়াতে ইসলামীর ‘নেতিবাচক’ ইমেজ ঝেড়ে ফেলে একটি ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘ইতিহাসের অংশীদার’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা।
তবে জামায়াতের এমন আত্মপক্ষ সমর্থনকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বুধবার (২৯ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি রাজনৈতিক দল (জামায়াত), যাদের জনগণ কখনও ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসায়নি, তাদের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা থাকতে পারে। নির্বাচনের আগে যাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইতে হয়, তারা রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ।’
তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াত অতীতে বিভিন্ন সময় ভুল স্বীকারের কথা বললেও আনুষ্ঠানিকভাবে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা না চাওয়ায় তারা বারবার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে।’
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং শান্তি কমিটি, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে দলটির ভেতর থেকেই একটি অংশ ওই ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তোলে এবং এ ইস্যুতে ভিন্নমতের জেরে কেউ কেউ দল ত্যাগও করেন।
বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে সতর্ক ও কৌশলী অবস্থান নিয়েছেন। তবে জাতীয় সংসদে সাম্প্রতিক আলোচনায় সরকারি দলের সদস্যরা সরাসরি ‘ক্ষমা চাওয়ার’ প্রশ্নটি উত্থাপন করায় বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত জামায়াত যত ভুল করেছে, দলের পক্ষে আমির ডা. শফিকুর রহমান তার জন্য ক্ষমা চান।
তিনি বলেন, ‘১৯৪৭ থেকে আজকের দিন (২২ অক্টোবর, ২০২৫) পর্যন্ত আমাদের দ্বারা যে যেখানে যত কষ্ট পেয়েছেন আমরা বিনাশর্তে তাদের কাছে মাফ চাই। এই অ্যাপোলজি (ক্ষমা প্রার্থনা) কমপক্ষে তিনবার চেয়েছি। অধ্যাপক গোলাম আযম, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং আমিও চেয়েছি। কিছুদিন আগে এ টি এম আজহার যখন জেল থেকে মুক্তি পেলেন তখনো বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা কেউ যদি কোনো কষ্ট পান, কারো কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, আমি সব ব্যক্তি এবং সংগঠনের পক্ষে নিঃশর্তে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাই, আপনারা আমাদের ক্ষমা করে দেবেন।’
আত্মপক্ষ সমর্থন করে জামায়াতের আমির তখন আরও বলেন, ‘আমরা ভুল করিনি বলব কীভাবে? আমাদের ১০০টার মধ্যে ৯৯টা সিদ্ধান্ত সঠিক, একটা তো বেঠিক হতে পারে। সেই বেঠিক একটা সিদ্ধান্তের জন্য জাতির ক্ষতি হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে আমার কোনো সিদ্ধান্তের জন্য যদি জাতির ক্ষতি হয়, তাহলে আমার মাফ চাইতে অসুবিধা কোথায়।’
যদিও এরপর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা কার্যত হয়নি এবং জাতীয় সংসদেও এ বিষয়ে জামায়াত কোনো শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাওয়ার পেছনে কৌশলগত ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলে দলটির একটি অংশের সমর্থনভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল, বিশেষ করে যারা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান ধারণ করে। আরও বড় বিষয় হলো, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হওয়া মামলায় জামায়াতের যেসব নেতার বিচার করা হয়েছে, তা সঠিক ছিল বলেই প্রতীয়মান হবে।
একই সঙ্গে, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সঙ্গে জোট রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে তীব্র বিরোধের প্রেক্ষাপটে জামায়াত বিষয়টি এড়িয়ে চলাকেই নিরাপদ কৌশল হিসেবে দেখেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা মনে করেন, ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নটি সামনে এলে তা আইনি ও রাজনৈতিকভাবে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিতে পারত, যা দলটির সাংগঠনিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিতে পারত।
ফলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের আগে পর্যন্ত জামায়াত ইস্যুটি সচেতনভাবেই অনির্ধারিত রেখে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের একটি ‘পরিবর্তিত’ ও তুলনামূলকভাবে ‘উদার’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা জোরদার করেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তায় সক্রিয়তা, মন্দির পাহারার মতো উদ্যোগ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির বার্তা সামনে এনে দলটি জনমনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে চেয়েছে। একই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে সমালোচনা, সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যার মাধ্যমে তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে জাতীয় সংসদে নবীন-প্রবীণ রাজনীতিকদের কঠোর সমালোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ঘিরে বিতর্ক এখনো তাদের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, একাত্তর এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর ও সংবেদনশীল বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়ায় সে সময় জামায়াতের অবস্থান নিয়ে ‘একাত্তরের কলঙ্ক’ প্রশ্নটি সহজে মুছে যাওয়ার নয়।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর গোলাম হাফিজ বাংলানিউজকে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে চলমান এই বিতর্ক স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি শুধু জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করবে না। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক প্রশ্নে দলটি কতটা স্বচ্ছ অবস্থান নেয় এবং অনুতাপ প্রকাশে কতটা আন্তরিকতা দেখায়, তার ওপরও তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি বড় অংশ নির্ভর করবে।’