নির্বাচনী আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের একটি আসন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আসনটি উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদে সদস্যসংখ্যা বেশি থাকায় আসনটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও আলোচনা হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের বণ্টন অনুযায়ী বিএনপি জোট পেয়েছে ৩৬টি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্র জোট একটি আসন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিএনপি ৩৬ জন, জামায়াত জোট ১৩ জন এবং স্বতন্ত্র জোট একজন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। তবে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের পর তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় এনসিপির প্রার্থী মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
এদিকে মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার আশঙ্কায় বিকল্প হিসেবে এনসিপির আরেক নেত্রী নুসরাত তাবাসসুম মনোনয়ন জমা দেন। তবে নির্ধারিত সময়ের ১৯ মিনিট পরে মনোনয়ন জমা দেওয়ায় তার আবেদন গ্রহণ করেনি নির্বাচন কমিশন। এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, নির্ধারিত সময়ের পর জমা দেওয়া মনোনয়নপত্র গ্রহণের সুযোগ আইনে নেই।
দুটি মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি জটিল নয় এবং আইনগতভাবে সমাধানযোগ্য। এটি এমন কোনো সমস্যা না, যা সমাধানের বাইরে। এটি সম্পূর্ণ সলভেবল।’—মোহাম্মদ শিশির মনির, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য জমা দেওয়া জামায়াত জোটের ১৩টি মনোনয়নের মধ্যে ১২টি বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু মনিরা শারমিনের মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য তাকে সময় দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে: জামায়াতের কেন্দ্রীয় মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দীকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, আইন ও মানবসম্পদ বিভাগীয় সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নী, প্রচার ও সাহিত্য-সংস্কৃতি বিভাগীয় সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলু, কেন্দ্রীয় ইউনিট সদস্য ও সিলেট মহানগরের সাবেক সেক্রেটারি অধ্যাপক মাহফুজা হান্নান, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য সাজেদা সামাদ।
এছাড়াও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা সেক্রেটারি শামছুন্নাহার বেগম, নারী অধিকার আন্দোলনের সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ, জুলাই শহীদ জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগম, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতু, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবা হাকিম।
এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দিন খান জানান, জমা দেওয়া কাগজপত্রে সরকারি পে-স্কেলের তথ্য থাকায় বিষয়টি যাচাইয়ের প্রয়োজন হয়েছে। পদত্যাগ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য—কখন, কোথায় চাকরি করেছেন এসব স্পষ্ট না হওয়ায় তার মনোনয়ন আপাতত ঝুলে আছে।
আইন অনুযায়ী, সরকারি চাকরি থেকে অবসর বা পদত্যাগের পর তিন বছর পূর্ণ না হলে কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য নন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১২ (১)(চ) ধারা এবং জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী এ বিধান কার্যকর। সে হিসেবে মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বৈধ হওয়ার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গতকাল মনোনয়ন জমা দিয়েছে। তবে মনিরা শারমিনের মনোনয়ন নিয়ে কিছু সংশয় তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে তাবাসসুমও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, কিন্তু তিনি নির্ধারিত সময়ের প্রায় ১৯ মিনিট দেরিতে জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতিতে দুটি মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও বিষয়টি জটিল নয় এবং আইনগতভাবে সমাধানযোগ্য। এটি এমন কোনো সমস্যা না, যা সমাধানের বাইরে। এটি সম্পূর্ণ সলভেবল,’ বলেন তিনি।
সময় পেরিয়ে মনোনয়ন জমা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯ মিনিট দেরি হওয়াকে বড় কোনো ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আদালতের নজির অনুযায়ী, এমন বিলম্ব অনেক সময় গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এটা তেমন কোনো বড় ইস্যু না,’ যোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যদি এই বিলম্বের কারণে মনোনয়ন বাতিল করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আসনটি শূন্য থাকার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা থাকতে পারে। এছাড়া, যার মনোনয়ন গ্রহণ করা হবে না, তিনি চাইলে আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাইতে পারবেন এবং আদালতই বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।
মনিরা শারমিনের মনোনয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনগত বিষয়টি স্পষ্ট হলেও অতীতে এসব বিষয় এতটা গুরুত্ব পেত না। আগে মূলত ঋণখেলাপি কি না বা বিদেশি নাগরিকত্ব আছে কি না এসব বিষয় বিবেচনা করা হতো। যেহেতু এখানে একটি আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, তাই যে কোনো পক্ষ আদালতে গিয়ে বিষয়টির নিষ্পত্তি চাইতে পারে।
ইসি সূত্র জানায়, কোনো আসনে মনোনয়ন বাতিল হলে সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই নির্বাচনে সব দল অংশ নিতে পারে। ফলে মনিরা শারমিনের মনোনয়ন বাতিল হলে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ওই আসনটি হারাতে পারে। সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য বেশি হওয়ায় তারা প্রার্থী দিলে এবং সরাসরি নির্বাচন হলে তাদেরই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরা শারমিন বলেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একটি বিশেষায়িত ব্যাংক এবং এটি সেকেন্ড ক্লাস পদ, যা রাষ্ট্রের কোনো লাভজনক পদ নয়। বিষয়টি নির্বাচন কমিশন অবগত আছে, আর আইনি বিষয়গুলো তাঁদের আইনজীবীরা দেখবেন।
প্রসঙ্গত, এনসিপির নারীশক্তির কেন্দ্রীয় আহবায়ক মনিরা শারমিন ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে জেনারেল অফিসার পদে নিয়োগ পান। সর্বশেষ গত বছর ডিসেম্বরে কৃষি ব্যাংক থেকে চাকরি ছেড়েছেন। মনিরা শারমিনের ফেসবুক প্রোফাইলে ১১ নভেম্বর ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত কৃষি ব্যাংকের অফিসার হিসেবে চাকরি করার তথ্য রয়েছে। সেই হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের মাত্র চার মাসের মাথায় জোটের সমর্থনে সংসদ সদস্য হতে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।