Image description

ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো কমিটি নেই। উপজেলায় নামমাত্র। ১৭ জেলা ফাঁকা, বাকিগুলোও আংশিক। এমন ‘নড়বড়ে’ তৃণমূল নিয়ে এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব থেকে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অবশ্য মাত্র এক বছর বয়সী দলটি ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসন জিতে চমক দেখিয়েছে।

এনসিপির নেতারা বলছেন, তৃণমূলে কমিটি ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে ভালো করা যাবে না– এমন নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এখনো তাজা। সরকারে গিয়ে বিএনপির ‘অবস্থান পাল্টে’ যাওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের কাছে এনসিপির আবেদন এখনো বহাল। কৌশল হিসেবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না– এমন ব্যক্তিদের সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পারের কথাও ভাবছেন তারা।

গত ৯ এপ্রিল সংসদে পাস হয়েছে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল-২০২৬। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার দলীয় প্রতীক থাকছেন না। ফলে প্রার্থী বাছাইয়ে এনসিপি সচেতন হলে প্রতীক না থাকার সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারবে।

এ ব্যাপারে এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন স্ট্রিমকে বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে এসেছে এনসিপি। বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন করলে স্বতন্ত্র চিন্তা-ভাবনা বা আদর্শ স্বাধীনভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন। বিপরীতে এককভাবে নির্বাচন করলে দলের কার্যকারিতা বেশি প্রকাশ পাবে। স্বকীয়তা থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আমরা এককভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি। জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীও আলাদাভাবে নির্বাচন করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

এলোমেলো তৃণমূল

এনসিপির সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল– দুই ভাগে। এখন পর্যন্ত উত্তরাঞ্চলের ৩২ জেলার ৩১টিতে আহ্বায়ক কমিটি হয়েছে। তবে দক্ষিণাঞ্চলের ৩২ জেলার মধ্যে এখনো ১৬টি জেলায় কোনো কমিটি দিতে পারেনি এনসিপি। সবমিলে ১৭ জেলায় কোনো আহ্বায়ক কমিটি নেই।

এনসিপির দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা দিনা স্ট্রিমকে বলেন, সংসদ নির্বাচনের ব্যস্ততায় আমরা দক্ষিণাঞ্চলের কিছু জেলায় কমিটি দিতে পারিনি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ে সংগঠন গোছানোর কাজ শুরু হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব, জেলা কমিটির মাধ্যমে উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি করা হবে।

একই কথা জানান এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও যুগ্ম সদস্যসচিব তাহসিন রিয়াজ। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, সারা দেশে কমিটি গঠনের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। আশা করছি, চলতি মাসেই সব জেলায় কমিটি দেওয়া সম্ভব হবে। অবশ্য আক্ষেপ করে তাহসিন রিয়াজ বলেন, এনসিপির বয়স মাত্র এক বছর। ফলে ৪০-৫০ বছরের পুরোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সাংগঠনিক কাঠামোর তুলনা করলে, সেটি এনসিপির প্রতি অন্যায় হবে।

চমক দেখাতে চায় ‘ওপেন কল’ কৌশলে

স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামোর ঘাটতি নির্বাচনে বিপাকে ফেলবে– এনসিপির নেতারাও স্বীকার করছেন। তবে তারা এটি পূরণে শুধু কর্মীর ওপর নির্ভর না করে ‘ওপেন কল’ কৌশলে এগোচ্ছেন। এরই অংশ হিসেবে গত ১০ মার্চ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী খুঁজতে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে এনসিপি। এই পদ্ধতি স্থানীয় সরকার পর্যায়ের সব নির্বাচনে কাজে লাগাতে চায় দলটির হাইকমান্ড।

এ ব্যাপারে তাহসিন রিয়াজ বলেন, যাদের রাজনীতিতে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আছে, যারা বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং স্থানীয় সরকার নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী– এমন যোগ্য ব্যক্তির জন্য আমাদের দরজা খোলা। শিগগির আমরা জনসাধারণের কাছে এই আহ্বান নিয়ে যাব।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম বলেছেন, গবেষণা ও জনমত জরিপে আমরা দেখেছি– দেশের সিংহভাগ মানুষ দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চান না। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ‘পার্টি লাইন’ নির্বাচনের নেতিবাচক প্রভাব সবাই দেখেছে। সেখানে ভোট কারচুপি, প্রভাব বিস্তার, কালো টাকার ছড়াছড়ি ও হানাহানি ছিল স্পষ্ট।

তিনি বলেন, তৃণমূলে কমিটি থাকার চেয়েও বড় নির্বাচনের পদ্ধতি। দলীয় প্রতীকবিহীন নির্বাচন হলে কমিটির অভাব এনসিপির জন্য খুব বেশি প্রভাবক হবে না। কারণ, যোগ্য ব্যক্তি দলটির মনোনয়ন পেলে তারা নির্বাচনে ভালো করবেন।