স্বাতি চতুর্বেদী
মাত্র কয়েক দিন আগেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইলে অসাধারণ উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন। নেসেটে তাকে একটি প্রতীকী পদক দেওয়া হয়। তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই ধরনের গেরুয়া রঙের পোশাক পরার পরিকল্পিত ‘কাকতালীয়’ ঘটনাটি নিয়ে তিনি হাসি-আনন্দও প্রকাশ করেন।
এখন ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলার পর একটি প্রশ্ন বাতাসে ভাসছে। নেতানিয়াহু কি এমন একটি সফরের মাধ্যমে মোদিকে এবং তার মাধ্যমে ভারতকে ব্যবহার করেছেন? তিনি কি এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছেন, যা দেখে মনে হয়েছিল ইরানের ওপর হামলায় মোদিরও অনুমোদন রয়েছে? এটি কি এক ধরনের কৌশলী ফাঁদ (অ্যামবুশ) ছিল, নাকি মোদি নিজেই এই খেলায় অংশ নিয়েছিলেন?
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ভারতের সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত প্রায় এক কোটি ভারতীয়র নিরাপত্তা এবং ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সেই কৌশলগত অস্পষ্টতা বা ভারসাম্য এখন আর কাজ করবে না। সবকিছু একদম স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
২০১৭ সালে ইসরাইল সফর করা প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মোদি। তিনি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন এবং তা করলেন অত্যন্ত সংকটময় এক সময়ে। মোদির কঠোর ‘হিন্দুত্ববাদী’ মতাদর্শ, অর্থাৎ হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ এবং নেতানিয়াহুর চরম ডানপন্থি জায়নবাদ একে অপরকে শক্তি জোগায়। নেতানিয়াহুর প্রভাবকে পুরোপুরি গ্রহণ করার মাধ্যমে মোদি সেই ভারসাম্য নষ্ট করেছেন। এর ফলে নয়াদিল্লি এখন স্পষ্টভাবে ইসরাইলের পক্ষেই দাঁড়িয়ে গেছে।
কিন্তু ভারত এত স্পষ্টভাবে কোনো এক পক্ষ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না। আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সংযোগের জন্য ভারত অনেকটাই ইরানের ওপর নির্ভরশীল। আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং ইউরেশিয়ায় প্রবেশের একটি কৌশলগত পথ হিসেবে ভারত ইরানের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। এর মাধ্যমে ভারত পাকিস্তানকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে, কারণ পাকিস্তান স্থলপথে ভারতের প্রবেশাধিকার দেয় না।
ভারতের অভ্যন্তরেও মোদির ইসরাইলমুখী নীতি এবং নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের বিরুদ্ধে সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। কংগ্রেসের এক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাকে বলেছেন, “নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ বলে দাবি করা সেই নেতা আসলে এতটাই ভীরু যে তিনি ভারতকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর হাতে জিম্মি করে ফেলেছেন।”
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলার খবর প্রকাশের কয়েক মিনিটের মধ্যেই কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান জয়রাম রমেশ মোদির ইসরাইল সফরকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। মোদি ইসরাইল সফরের মাত্র দুই দিন পরই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরু করেছে। গত কয়েক মাস ধরে তাদের সামরিক প্রস্তুতি দেখলে এই হামলা পুরোপুরি প্রত্যাশিতই ছিল।
তবুও মোদি ইসরাইল সফরে গেছেন। সেখানে তিনি নৈতিকভাবে চরম কাপুরুষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন যে ভারত ইসরাইলের পাশে আছে। এমন কথা বলার জন্য তিনি একটি পুরস্কারও গ্রহণ করেছেন। এই ইসরাইল সফর ছিল লজ্জাজনক। আর এখন তার দুই ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ যুদ্ধ শুরু করায় সেই লজ্জা আরো বেড়ে গেছে।
এর আগে কংগ্রেস দলের নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিশালী গান্ধী পরিবারের সদস্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাকে সংসদে এমন ব্যাগ হাতে দেখা যায়, যার লোগো ছিল ফিলিস্তিনি আন্দোলনের সমর্থনে। তিনি মোদিকে অনুরোধ করেছিলেন যেন নেসেটে দেওয়া বক্তৃতায় গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুর গণহত্যার বিষয়টি উত্থাপন করেন। কিন্তু মোদি এ ধরনের কিছুই করেননি। তবে তিনি প্রবল করতালির মধ্য দিয়ে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা পেয়েছেন।
তবে ভারতের সাধারণ জনগণ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাস্তব অবস্থান মোদি যে পথে জোর করে দেশকে নিয়ে যাচ্ছেন তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মোদির সমর্থক শিবিরে রয়েছে কঠোর হিন্দুত্ববাদী অনুসারীরা। এদের অনেকেই ক্ষমতাসীন বিজেপির কুখ্যাত অনলাইন ট্রোল সেলের সদস্য। তারা দিনরাত ইসরাইলের পক্ষে প্রচারণা চালায় এবং ফিলিস্তিনিদের আক্রমণ করে, কারণ মুসলমানদের প্রতি তাদের গভীর বিদ্বেষ রয়েছে।
তবে এখনো ভারত ইরান ও ইসরাইল উভয়ের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছে। সরকারের শীর্ষ কিছু সূত্র আমাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আমাকে বলেছেন, ‘আমরা সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছি এবং শান্তিতে ফেরার চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে আমাদের নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার কাজও চলছে।’
তবে তিনি খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেন যে মোদির ইসরাইলপ্রীতি এবং বারবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশ মেনে চলার দৃশ্য ইরানের কঠোরপন্থি শাসকদের কাছে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘আগের মতো সম্মান এখন আর আমরা পাচ্ছি না। মোদির শাসনামলে ভারতীয় মুসলমানদের সঙ্গে আচরণের কারণে ইরানিরা এখন ভারতের গণতন্ত্রকে ইসরাইলের গণতন্ত্রের মতোই মনে করছে।’
ভারত আসলে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে এক ধরনের নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চেয়েছিল। কিন্তু মোদির কর্মকাণ্ড ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে। ট্রাম্পের অসন্তোষের পর ভারত ইরানের চাবাহার বন্দরে তাদের বিনিয়োগ কার্যত শূন্যে নামিয়ে এনেছে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি পরিবহন সংযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে ভারত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বিরল খনিজ সংগ্রহ করতে পারত এবং অঞ্চলে বাড়তে থাকা চীনের প্রভাবও নিয়ন্ত্রণ করতে পারত।
এমনকি মোদির ইসরাইল সফরের আগেই জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কারণে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাকে অগ্রাধিকার দেন। তবে তখনও সেই কৌশলগত ভারসাম্য পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
জানুয়ারিতে ইরানকে সন্তুষ্ট করতে ভারত জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। সেই প্রস্তাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমনে সহিংসতার নিন্দা করা হয়েছিল। এই পদক্ষেপের জন্য তেহরান প্রকাশ্যে দিল্লিকে ধন্যবাদ জানায়। এটি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক ভোট দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাসেরই অংশ। ১৯৯৪ সালে পাকিস্তান কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। তখন ইরান সেই প্রস্তাব আটকে দিয়েছিল।
মোদির আমলে ভারত ইসরাইলের সঙ্গে ব্যাপকভাবে যুক্ত হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিশাল অস্ত্রচুক্তি। এই চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে যার মূল্য প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার। সরকারের এক শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী আমাকে বলেছেন, “অপারেশন সিন্দুরের পর আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। দেখুন পাকিস্তান আফগানিস্তানে কী করছে। তারা এটিকে ‘ওপেন ওয়ার’ বলে আক্রমণ চালাচ্ছে।
“আমাদের যুদ্ধ প্রস্তুতির জন্য ইসরাইলি সামরিক সরঞ্জাম দরকার। কারণ আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে শত্রুভাবাপন্ন অঞ্চলে বাস করি, যেখানে চীন ও পাকিস্তান আমাদের ঘোষিত শত্রু। উদারপন্থি কলাম লেখকদের মতো আমরা কল্পনার জগতে বাস করি না। আমরা বাস্তব জগতে বাস করি। ইসরাইল এখন আমাদের বন্ধু। যেকোনো পরিস্থিতিতেই সে আমাদের বন্ধু থাকবে।”
মোদি ইসরাইলি সাইবার নজরদারি প্রযুক্তির জন্যও বড় বড় অর্ডার দিয়েছেন। এর মধ্যে পেগাসাসের মতো সফটওয়্যারও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, নাগরিক সমাজ এবং সাংবাদিকদের ওপর নজরদারির জন্য। আমি নিজেও (লেখক) সেই তালিকায় রয়েছি।
গত এক দিনে ভারত স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে তারা ইরান থেকে কতটা দূরে সরে গেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডে ভারত কোনো সরকারি শোকবার্তা দেয়নি। সাধারণত সামাজিক মাধ্যমে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান মোদি। কিন্তু এবার তিনি বা তার সরকার কেউই খামেনির মৃত্যুর বিষয়টি পর্যন্ত স্বীকার করেননি।
বিরোধী দল কংগ্রেস এই নীরবতাকে ভীরুতা এবং ‘নৈতিকতা বিবর্জিত নেতৃত্বের’ উদাহরণ বলে আখ্যা দিয়েছে। তাদের মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে সামান্য সমালোচনাও করতে অনীহা থেকেই এই নীরবতা এসেছে। এটি ভারতের ঐতিহাসিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণ। ভারত এর আগে কখনো এত দুর্বলতা দেখায়নি।’
মোদি ও নেতানিয়াহু নিজেদের যেভাবে শক্তিশালী হিসেবে তুলে ধরছেন, তা অনেকটাই কল্পিত শক্তির প্রকাশ। তৃতীয় মেয়াদে মোদি একজন গভীরভাবে বিভাজন সৃষ্টিকারী ও কর্তৃত্ববাদী নেতা হয়ে উঠেছেন। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত রাজনৈতিক সমর্থন হারাচ্ছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বহির্বিশ্বে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে। আর নিজ দেশে জনসমর্থন পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে আছেন।
ভারতের জন্য এখন মূল প্রশ্ন হলো—ইসরাইল ও তার বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে দিয়ে দেশটি শেষ পর্যন্ত কতটা ক্ষতির মুখে পড়বে।
লেখক : পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রিন্ট ও সম্প্রচার সাংবাদিক
হারেতজ থেকে ভাষান্তর : এইচ এম নাজমুল হুদা