তারেক সালমান
দীর্ঘ প্রায় দেড়যুগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে লন্ডনে নির্বাসন থেকে মাত্র দু’মাস আগে দেশের মাটিতে পা রেখেই লাখো জনতার উপস্থিতিতে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। গেল বছরের ২৫ ডিসেম্বর তার সেই ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের সময়ে নিজের সেই ‘প্ল্যান’ বা সেই পরিকল্পনা কি তা তখনই খোলাসা না করে রহস্য রেখেছিলেন তিনি।
আর সেই সুযোগে বিরোধীদল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের নেতারা এবং অন্যান্য প্রতিপক্ষরা কটাক্ষ-ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে মেতে উঠেছিলেন। নানা ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুক্ত পরিবেশে জনগণের স্বাধীন ভোটাধিকারের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেই একের পর এক ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সেই কটাক্ষ, বিদ্রুপ ও সমালোচনার জবাব দিতে শুরু করেছেন তারেক রহমান।
সরকার পরিচালনার শপথ নিয়ে মাত্র দশদিন হলো দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তারেক রহমান। সাধারণত এ সময়টায় অনেক রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান নায়ক ব্যস্ত থাকেন ফুলের তোড়া শুভেচ্ছা বিনিময় আর আনুষ্ঠানিকতায়। কিন্তু সেই চিরচেনা পথে হাঁটেননি তারেক রহমান। প্রথম কর্মদিবস থেকেই শুরু হয় তারেক রহমানের ব্যস্ততা। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজে নেমে পড়েন তিনি ও তার মন্ত্রিসভা। ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই নেয়া হয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যার প্রভাব পড়ে সরাসরি জনজীবনে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পরদিনই শুরু হয় পবিত্র মাহে রমজান। আর এই রমজান এলেই দেশের বাজারে আগুন এ যেন চিরচেনা দৃশ্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকট, নাজুক আইনশৃঙ্খলা সব মিলিয়ে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। কিন্তু এবার দৃশ্যপট বদলাতে উদ্যোগী হন তারেক রহমান। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে চড়া বাজারে লাগাম টানার নির্দেশ দেন তিনি, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে। ইফতার ও সেহরিতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নেয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
বিএনপি ও সরকার সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের নাজুক ও ভঙ্গুর সমস্যা সমাধানে কেবল তাৎক্ষণিক সংকট সামাল নয়, দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার দিকেও নজর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে আগামী ছয় মাসের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ছয় মাস পর মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের জবাবদিহির একটি শক্ত বার্তাও দিয়েছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন ছয় মাস পরে আপনি যদি এই চেয়ারে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারেন আপনার চেয়ে যোগ্য কেউ সেই আসনে বসবেন। এর মধ্যে দিয়ে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন এই সরকার দলীয় কমান্ডে নয় জনগণের সেবায় নিয়োজিত।
জানা গেছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারে ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের পাইলট কার্যক্রম শুরু করতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ১৭টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে এই কার্যক্রম। আগামী ১০ মার্চ বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নিজ জেলা শহর বগুড়া সদর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন বলে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছেন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রনালয় এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
ফ্যামেলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম মাইলস্টোন হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সরকারের মেয়াদকালে সারাদেশে মোট ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপনের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। খাল কাটা কর্মসূচি ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সমন্বিতভাবে চলবে বলে জানা গেছে। খাল খনন ও খাল পূণরুদ্ধারের পর খালের দুই পাড়, সামাজিক বনায়ন প্রকল্প, স্কুল-কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাস্তার ধারে বৃক্ষরোপণ করা হবে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্যান্য মন্ত্রণালয় সমন্বয় করবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আজ থেকে প্রায় ৪০-৪৫ বছর আগে এ ধরনের বিপ্লব বা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশকে স্বনির্ভর এবং প্রতিটি মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করতে চেয়েছিলেন। খাল খননের ফলে জলাবদ্ধতা দূর হবে, মাছ চাষ বাড়বে এবং বাজারে মাছের দাম স্থিতিশীল থাকবে। খালের পানি সেচের কাজে ব্যবহার করে উৎপাদন দ্বিগুণ করা যাবে, যা দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবে এবং উদ্বৃত্ত পণ্য রপ্তানি করা যাবে। অতীতে খাল দখল, বর্জ্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাধার কারণে এ কাজগুলো ব্যাহত হয়েছিল। এজন্য ‘সফল খাল খননের জন্য অনেক জায়গাতেই দখলদার উচ্ছেদ ও স্থানীয় মানুষের সমর্থনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
জানা গেছে, সরকার গঠনের শপথ নেয়ার আগে থেকেই বিএনপির হাইকমান্ড অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানে ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে বিএনপি। কিন্তু গুরুত্ব বিবেচনা করে খুব দ্রুত সময়েই তা বাড়িয়ে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে সেই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই লক্ষ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।
এসবের বাইরে রাজধানীর উপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে রেল, নৌ, সড়ক ও সেতু কার্যক্রম পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেয়ার ঘোষণা উঠে এসেছে সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারে। পাশাপাশি ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও ব্যক্তিগত জীবনযাপনে নজির স্থাপন করেছেন তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়ার পরে তিনি চলাফেরা করছেন নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে। ব্যক্তিগত চালক এবং নিজস্ব জ্বালানি ব্যয় বহন করছেন নিজের অর্থে। প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তায় ব্যবহৃত গাড়ি বহর ১০টি বেশি থেকে কমিয়ে আনা হয়েছে মাত্র চারটিতে। কৃচ্ছসাধনের এটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এর চেয়ে বড় বিষয় জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে ট্রাফিকের মধ্যে আটকে থাকছে প্রধানমন্ত্রীর ছোট গাড়ি বহর। গতকাল বৃহস্পতিবার ২১ পদক প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তো সচিবালয় থেকে পায়ে হেঁটে ওসমানী স্মৃতিমিলনায়তন কেন্দ্রে পৌঁছান তারেক রহমান। হেঁটেই তার সঙ্গে সেখানে যান প্রধানমন্ত্রী কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও। এসব কিছুই নতুন বাংলাদেশের ইতিবাচক বার্তা বহন করছে বলছেন বিশ্লেষকরা।
গেল ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় সংসদ সদস্যদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য সরকারি সুবিধায় ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করতে পারবেন না। পাবেন না সরকারি প্লট গ্রহণের সুবিধাও। এই কৃচ্ছসাধনের আহ্বান ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পুরো প্রশাসন জুড়ে।
সূত্র জানায়, নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডের পাশাপাশি সরকার সবচেয়ে যুগান্তকারী উদ্যোগ নিচ্ছে খাল কাটা কর্মসূচির মাধ্যমে। বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল কাটা কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে আনাচে-কানাচে ঘুরে বেরিয়েছেন। কৃষি উৎপাদনে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটিয়েছেন। আগামী ৫ বছরে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার। সরকারের প্রথম ছয়মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে কমপক্ষে ১ হাজার কিলোমিটার খাল।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, খাল খনন কর্মসূচি একটি বিপ্লব, একটি আন্দোলন। যা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন আজ থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে। এটি আমাদের সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে অন্যতম। যা সরকারের একটি চলমান প্রকল্পের অংশ হিসেবে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। আগামী পাঁচ বছরে মোট ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তার মধ্যে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে আমরা ১ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ দৃশ্যমান করার পরিকল্পনা নিয়েছি।