শহীদুল্লাহ ফরায়জী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর শপথ গ্রহণে চার দিনের ব্যবধান (১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি) এবং সরকার গঠনে বিলম্বের পেছনে মূল কারণ হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংবিধানের নির্দেশনার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যের ভুল ব্যাখ্যা।
সংবিধানের মূল উদ্দেশ্য (Object and Purpose) হলো—জনপ্রতিনিধিদের দ্রুত বৈধতা নিশ্চিত করে সরকার গঠনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট কার্যকর করা। এই প্রক্রিয়ায় বিলম্ব রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে যেকোনো মুহূর্তে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
যখন বিদায়ী বা অন্তর্বর্তী সরকার ‘ডি জুরে’ (De jure) কার্যকারিতা হারিয়ে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং নির্বাচিত সরকার শপথের অভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে না, তখন রাষ্ট্র এক ভয়াবহ ‘পাওয়ার ভ্যাকিউয়াম’ বা ক্ষমতার শূন্যতায় নিমজ্জিত হয়। এই মধ্যবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকে। সেই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল শক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহল চক্রান্তের জাল বুনতে পারে এবং নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের আগেই রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাতে পারে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ‘Power Vacuum’ একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থা। প্রতিবেশী কিংবা বৈশ্বিক শক্তিগুলো এমন ‘অভিভাবকহীন’ মুহূর্তের সুযোগ নিতে পারে। সরকার গঠনে বিলম্ব প্রমাণ করে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সতর্কতা অনুপস্থিত।
জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত দলকে গেজেট প্রকাশের পর অপেক্ষায় রাখা বহির্বিশ্বে এই বার্তাই দেয় যে, আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ দক্ষতা ও স্থিতিশীলতা অর্জন করেনি।
সংবিধানের ১৪৮(২) ও ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদের মূল চেতনা হলো—রাষ্ট্র এক মুহূর্তের জন্যও অভিভাবকহীন থাকবে না। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (CEC) শপথ গ্রহণ করানোর ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যাতে কোনো যান্ত্রিক বা রাজনৈতিক কারণে ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যাহত না হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা এই সময়সীমার তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়ে সংবিধানের গতিশীল (Dynamic) চরিত্রকে উপেক্ষা করেছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৮(২) ও ১৪৮(২ক) অনুচ্ছেদ সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শী বিধান। স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে শপথের দায়িত্ব প্রদান কোনো দৈব ব্যবস্থা নয়; এটি একটি ‘Constitutional Safety Valve’। এই বিধানের লক্ষ্য গেজেট প্রকাশের পর দ্রুততম সময়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আইনি বৈধতা প্রদান করা।
শপথ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সরকার গঠনের প্রাথমিক ও অপরিহার্য ধাপ। যদি গেজেট প্রকাশের ২৪ বা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শপথ সম্পন্ন হতো, তবে তা বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের সাংবিধানিক পরিপক্কতার এক উজ্জ্বল নজির স্থাপন করত।
কখনো কখনো বিদায়ী স্পিকার দলীয় সংকীর্ণতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিজের পদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অচল করার অপচেষ্টা চালাতে পারেন। সংবিধান প্রণেতারা সম্ভাব্য এই ‘Political Sabotage’ অনুমান করেছিলেন বলেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে একটি বিকল্প সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।
সংবিধানে উল্লিখিত ‘তিন দিন’ সময়সীমা ছিল স্পিকারের জন্য এক অলঙ্ঘনীয় বাধ্যবাধকতা। আর স্পিকার অনুপস্থিত, অদৃশ্য বা কার্যত নিষ্ক্রিয় হলে সেই একই সাংবিধানিক দায়ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপর বর্তায়। এখানে অপেক্ষা বা শূন্যতার কোনো সুযোগ নেই।
ক্ষমতা হস্তান্তর হতে হবে দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন ও সুনির্দিষ্ট—যেখানে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতায় এক মুহূর্তের বিচ্ছেদও ঘটবে না। ত্রয়োদশ সংসদের এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সংবিধানের ব্যাখ্যায় অদক্ষতা একটি রাষ্ট্রকে কত সহজে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
কিন্তু আরও ভয়াবহ উদ্বেগজনক বাস্তবতা হলো—ত্রয়োদশ সংসদের ২৯৭ জন সদস্য কিংবা নবগঠিত সম্ভাব্য সরকারের কোনো আইন বিশেষজ্ঞ শপথ ও সরকার গঠনে এই বিলম্বের প্রশ্নে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। এই নীরবতা কেবল ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক সচেতনতার গভীর সংকটের প্রতিফলন।
সংসদ সদস্যরা সাংবিধানিক শপথ গ্রহণের পূর্ব মুহূর্তেই যদি সংবিধানের স্পষ্ট সময়সীমা ও চেতনা রক্ষার প্রশ্নে নীরব থাকেন, তবে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক বিচ্যুতি রোধে তাঁদের সক্রিয় ভূমিকার প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত—সে প্রশ্ন অনিবার্যভাবে উঠে আসে। আইনজ্ঞদের এই নীরবতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ সংবিধানের ব্যাখ্যা, উদ্দেশ্য রক্ষার নৈতিক দায়িত্ব তাঁদের ওপরই সর্বাধিক বর্তায়।
ভুল জানার পরও সংশোধন না করা মানে নীরবতার মাধ্যমে একটি অবস্থান গ্রহণ করা। এটি কেবল ব্যাখ্যার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পরিপক্কতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততার প্রশ্ন।
ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—রাষ্ট্র হঠাৎ করে সংকটে পড়ে না; সংকট প্রথমে জন্ম নেয় নীরবতার ভেতরে, তারপর তা স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়ায় বিস্তার লাভ করে। আমরা কেবল একটি প্রশাসনিক বিলম্বের মুখোমুখি নই; বরং সাংবিধানিক সতর্কতা ও রাজনৈতিক দায়বোধের অবক্ষয়ের মুখোমুখি।
অতএব, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হলো নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ দ্রুত নিশ্চিত করা, যাতে ক্ষমতার শূন্যতা দীর্ঘায়িত না হয়। জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের দ্রুত সরকারে বসানো কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি সংবিধানের চূড়ান্ত নির্দেশনা।
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক