Image description
 

পুরো বাংলাদেশের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা সবকিছুরই নিয়ন্ত্রণ হয় এই ঢাকা থেকে। চাকরি পেতেও ঢাকায় আসার বিকল্প নেই বললেই চলে। তাই গ্রামে নানান সংকটে জীবন কাটানো অধিকাংশ মানুষের চোখ থাকে ঢাকার দিকে। কেউ উচ্চ শিক্ষার জন্য, কেউ ভালো চিকিৎসা পেতে কেউ আবার ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে একবুক স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করেন জাদুর শহর ঢাকায়। কিন্তু কজন জানেন, জাদুর শহর ঢাকায় প্রবেশ করতেই শুরু হয়ে যায় তার জাদুঘরমুখী যাত্রা।

 

মানুষের প্রথম চাহিদা একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু ঢাকায় নতুন করে আসা মানুষের জন্য এটি মেটানো দুঃসাধ্য বটে। সাধ্যের অনেক বেশি টাকা ব্যয় করেও মানসম্মত ঘর ভাগ্যে জোটে না অধিকাংশ ঢাকাবাসীর। জাতিসংঘের হিসাব মতে, ঢাকায় বসবাস করে ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ। কিন্তু সেন্টার ফর হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চের তথ্য বলছে, ঢাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফ্ল্যাট আছে মাত্র ২ থেকে ৫ শতাংশ। যার কারণে এই শহরে বসবাস করতে প্রত্যেককে তার আয়ের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যয় করতে হয় শুধু বাসা ভাড়ার পেছনে। গত ২৫ বছরে এই শহরে প্রায় ৪০০ গুণ বাসা ভাড়া বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিদের।

বাড়তি টাকা খরচ করে নিরাপদ আবাস পেলে কিছুটা স্বস্তি ছিল। কিন্তু ঢাকার বাসিন্দাদের জন্যে তা যেনো সোনার হরিণ। নিয়মিত পানি, গ্যাস সংকটতো আছেই, সাথে ভবনে পুড়ে মরার শঙ্কা। প্রতিমুহূর্তেই থাকতে হয় ভূমিকম্পের আতঙ্কে।

 

যারা একটু নিম্নবিত্ত, ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও তাদের থাকতে হয় বস্তিতে। আর বস্তির জীবন মানেই এক দুঃসহ জীবন। সেখানে যথাযথভাবে মেলেনা মৌলিক অধিকারগুলোর কোনোটিই। তথ্য বলছে, ঢাকা শহরের ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তিতে বাস করেন অন্তত ৪০ লাখ মানুষ। তবে বস্তির মানুষের ভূমিকম্প ঝুঁকি কম থাকলেও ষড়যন্ত্রের আগুনে প্রায়ই জ্বলতে হয় তাদের। তথ্য বলছে, ঢাকার সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইল পুড়েছে গত ১২ বছরে ১০ বার।

 

ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষের বসবাসের কারণে ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্ত পানির স্তর নামছে হুহু করে। এখন ব্যবহারের জন্য যে পানি মিলছে সেটাও উচ্চমাত্রায় দূষিত। যা তিলে তিলে মারছে ঢাকাবাসীকে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ স্ট্র্যাটেজিস বলছে, প্রতি বছর এই শহরের ভূগর্ভস্ত পানির স্তর নামছে ৩ মিটার করে। এখনি পদক্ষেপ না নিলে খুব শিগগিরই পানি শূন্য হতে পারে ঢাকার তলদেশ। পানির অভাবে মৃত শহরে পরিণত হতে পারে ঢাকা।

ঘরের বাইরের চিত্র আরও ভয়াবহ। সড়কে মিলবে না পর্যাপ্ত পরিবহন। ধাক্কাধাক্কি করে লক্কর ঝক্কর কোনো বাসে কেনোরকম ঝুলে উঠতে পারলেও একটু পরই আটকে যেতে হয় যানজটে। বুয়েটের গবেষণা বলছে, ঢাকা শহরে প্রতি ২ ঘণ্টায় ৪৬ মিনিট যানজটে থাকতে হয় নগরবাসীকে। এতে ঢাকায় প্রতিদিন মানুষের যে পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় তার আর্থিক মূল্য ১৪০ কোটি টাকা বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ঢাকার এই যানজট নিয়ন্ত্রণে যেমন কোনো টেকসই পরিকল্পনা ছিল না, তেমনি ছিলো না পরিবহন সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো উদ্যোগও। বরং ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনার বড় বড় উন্নয়ন এখন গলার কাটা ঢাকাবাসীর। নতুন বিষফোঁড়া অটোরিকশাও পেয়েছে রাজনৈতিক সমর্থন।

যানজটে পড়ে হেটে চলে যাবেন? তারও উপায় নেই। হয়তো ফুটপাথ ভাঙাচোরা, নাহয় রয়েছে বেদখলে। এসটিপি ২০২৫ এর প্রতিবেদন বলছে, ১৬৩টি ফুটপাথের প্রায় ১০৮ কিলোমিটারই রয়েছে বেদখলে। কিন্তু এই বেদখলের বড় অংশই রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের অবৈধ আয়ের উৎস হওয়ায় কখনোই ফুটপাথ দখল মুক্তের উদ্যোগ নেয়নি কোনো সরকার।

রাস্তায় চলাচলে আছে আরও এক বিপত্তি। ঢাকা শহরের যে কোনো সড়কে যে কোনো সময় আপনি পড়ে যেতে পারেন ছিনতাইকারীর কবলে। হয়তো মূল্যবান জিনিসপত্র দিয়ে পার পাবেন, নাহয় যেতে পারে জীবনটাও। বিআইডিএস এর তথ্য বলছে, ঢাকা শহরের ২৫ শতাংশ মানুষ একবারের জন্য হলেও পড়েছেন ছিনতাইকারীর কবলে। যার বড় কারণ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অপর্যাপ্ততা বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকায় চলতে গিয়ে কারো টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে বাঁধে আরো বড় বিপত্তি। কারণ ঢাকায় প্রায় ১ লাখ মানুষের বিপরীতে পাবলিক টয়লেট আছে মাত্র ১টি করে। যার ফলে রাস্তার পাশেই মলমূত্র ত্যাগ করতে হয় অনেককে।

এই শহরে প্রাণ খুলে নিশ্বাস নেবেন? সেই সুযোগও নেই। কারণ পরিবেশের দিক থেকে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায়ও রয়েছে এই ঢাকা শহর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছে, শুধু বায়ু দূষণের কারণে ঢাকার মানুষের গড় আয়ু কমছে ৭ বছর ৭ মাস করে। এছাড়া ঢাকার ৯৮ ভাগ শিশুর রক্তে রয়েছে সীসা। দূষিত পানির কারণে নানান রোগে ভুগছে ঢাকাবাসী।

দূষণ থেকে বাঁচতে প্রয়োজন প্রাকৃতিক পরিবেশ। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরী ঢাকায় নেই পর্যাপ্ত সবুজ ভূমিও। ফলে গরমের দিনে তাপপ্রবাহে নাকাল অবস্থা হয় নগরবাসীর। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে বৃষ্টির জন্য হাহাকার শুরু হয় এই শহরে। কিন্তু সেই বৃষ্টিও অভিশাপ হয়ে আসে ঢাকাবাসীর জন্য। কারণ একটু বৃষ্টি হলেই ঢাকায় শুরু হয় জলাবদ্ধতা। যার প্রধান কারণ নগরীর খাল, বিল ও জলাধারগুলো ভরাট করে ফেলা।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে ঢাকায় তরান্বিত হচ্ছে আরও অনেক সংকট। বাড়ছে ডেঙ্গুর মতো রোগও। কিন্তু অসুস্থ হলে আপনি চিকিৎসা নিতে যাবেন তারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই এই শহরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকায় প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে হাসপাতালের শয্যা আছে মাত্র ০.৪টি। চিকিৎসাহীনতায় মারা গেলেও নেই মুক্তি। কারণ ঢাকায় সাড়ে তিন হাতের একটি স্থায়ী কবর পেতে আপনাকে গুনতে হবে ৪ কোটি টাকা। না-হয় কদিন পর অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে আপনার কবরও।

কিন্তু ঢাকার কেন এত খারাপ অবস্থা ভেবে দেখেছেন কী? বিশেষজ্ঞরা কিন্তু প্রতিনিয়ত এ নিয়ে কথা বলছেন। হচ্ছে শত শত সভা-সেমিনার। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবদী এই কথাগুলো আমলে নেয়নি কেউ। অন্য সব বিশেষজ্ঞের ভাষায় আমিও মনে করি, ঢাকার এত সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার সংকট। যা সমাধানের সময় এখনি। এই শহরকে বাঁচাতে এখনি উদ্যোগ না নিলে খুব শিগগিরই মৃত শহরে পরিণত হতে পারে বাংলাদেশের রাজধানী।

কিন্তু যে উদ্যোগ ৫৪ বছরে নেওয়া গেল না সেটা এখন কতটা সম্ভব সেই প্রশ্নও আসবে অনেকের মনে। কিন্তু আমি বলবো এটাই সুসময়। কেননা, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে আসা নির্বাচনকে সবাই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মানের নির্বাচন হিসেবেই ধরে নিয়েছে। এই নির্বাচনে দলগুলোকে চাপ দেওয়া গেলেই সম্ভব ঢাকা বাঁচানোর একটি সুনির্দিষ্ট ইশতেহার আদায়। সেটি করাই এখন হতে পারে নাগরিক সমাজ ও তরুণদের কাজ।

এবারের নির্বাচনের বন নীতি নির্ধারক তরুণ ভোটাররা। আমি বিশ্বাস করি তারুণ্য শুধু মার্কা দেখে ভোট দেবে না। তারুণ্য দেখবে কার পরিকল্পনা কেমন। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের পরিকল্পনার প্রতিযোগিতায় নামানো। ঢাকা নিয়ে কার পরিকল্পনা কতটা টেকসই সেটা তুলে ধরা। যা দেখে ভোটাররা বাছাই করবে কোন দলকে তারা ভোট দিবে।

ঢাকার পরিচয়ে বাংলাদেশের পরিচিতি। বিদেশ থেকে কোনো একজন মানুষ বাংলাদেশে এলে প্রথম সে ঢাকায় নামে। পুরো বাংলাদেশ আমরা যতই পরিবর্তন করি না কেন ঢাকাকে নতুন করে পরিকল্পিতভাবে ঢেলে সাজানো না গেলে সবই বৃথা যাবে। তার বিপরীতে সারা বাংলাদেশ রেখে ঢাকাকে নতুন রূপে সাজানো গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই পরিবর্তন হয়ে যাবে পুরো দেশ। তাই আসুন আমরা ঢাকা বাঁচানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তুলে ধরতে রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য করি। সিদ্ধান্ত নেই ঢাকা নিয়ে গঠনমূলক ও টেকসই পরিকল্পনা যার থাকবে না আমার ভোটও পাবে না সে।

দিন শেষে আমি বিশ্বাস করি ভোটাররা বদলে গেলে এই বাংলাদেশ বদলাতে বাধ্য।

কেফায়েত শাকিল