বাগেরহাটের রামপালে বৃহস্পতিবার বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাস ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বর-কনেসহ ১৪ জন নিহত হয়েছেন। বেলাই ব্রিজ এলাকায় মোংলা থেকে ছেড়ে আসা একটি বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় গাড়ির সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। মূলত চালকদের ভুলের কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে। একই দিন সন্ধ্যায় যশোর-মাগুরা মহাসড়কের বাঘারপাড়ায় ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও বাসের সংঘর্ষে দুজন নিহত হন। শুক্রবার রংপুরের তারাগঞ্জে দুই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালক নিহত হন। বছরের পর বছর এমন দুর্ঘটনা ঘটে। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেশি ট্রিপ দেওয়ার মানসিকতা, সড়কের অবকাঠামোগত বেহাল অবস্থার কারণে লাশের মিছিল লম্বা হচ্ছে। ঈদের সময় এমন দুর্ঘটনা আনন্দের ঈদযাত্রা মুহূর্তেই বিষাদে রূপ নেয়।
একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী-গত ঈদের (ঈদুল আজহা) আগে-পরে ১২ দিনে সারা দেশে ৩৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময় সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে-চালকরা বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালায়, চালকের মনোযোগের অভাবে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে এবং অসতর্কতায় সড়কে দাঁড়ানো ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিয়ে থাকে। যানবাহনের চাকা ফেটেও দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, ঈদের সময় স্বাভাবিকভাবে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এমন সময় আইন মানার প্রবণতাও কমে যায়। পরিবহণের চাহিদা থাকায় ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো রাস্তায় নামে। আনফিট গাড়ি ও আনফিট চালক সড়কে নেমে পড়লে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। আর রাস্তায় যানবাহনের চাপের সময় ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, ঈদের আগের ছয় দিন ও পরের ছয় দিন গায়ে-গোতরে নেমে সামাল দেব-এ চিন্তা যারা করেন তারা টেকসইভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনার মূল মন্ত্রটাই জানেন না। এ নিয়ে সারা বছর ধরে কাজ করতে হয়। সারা বছর সড়ক নিয়ন্ত্রণে থাকলে ঈদের সময় সামান্য নজর দিলেই সব টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব। কিন্তু আমরা মৌসুমি কাজ করতে পছন্দ করি। কেউ জবাবদিহির আওতায় আসে না।
বিজ্ঞানভিত্তিক কালচার তৈরি করতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, পুলিশও মৌসুমি কাজ করে। বিআরটিএও মৌসুমি কাজ করে। সারা বছর কাজ করার সংস্কৃতিতে তাদের ফিরে আসতে হবে। পুরোনো ধারা থেকে চলে এসে সরকারকে কৌশলী হতে হবে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী- গত ঈদের (ঈদুল আজহা) আগে-পরে ১২ দিনে সারা দেশে ৩৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১২ জন নিহত হয়েছে। ১ হাজার ৫৭ জন গুরুতর আহত হয়েছে। এছাড়া ৫৮৯টি যানবাহন দুর্ঘটনা কবলিত হয়েছে এবং ১২১৮ কোটি টাকার বেশি মানবসম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
ঈদযাত্রা ও দুর্ঘটনা পর্যালোচনায় বলা হয়-২০২৪ সালের ঈদুল আজহার আগে-পরে ১৩ দিনে ২৬২ জন নিহত হয়। প্রতিদিন গড়ে ২০ জন নিহত হয়। ২০২৫ সালে ঈদুল আজহার আগে-পরে প্রতিদিন গড়ে ২৬ জন নিহত হয়। এ হিসাবে প্রাণহানি ২৯ শতাংশ বেড়েছে। বছরভিত্তিক সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যে বলা হয়-২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছে। ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছে। ২০২৪ সালে ৬ হাজার ৯২৭টি দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ২৯৪ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৯ জন আহত হয়। ২০২৩ সালে ৬ হাজার ৯১১টি দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫২৪ জন নিহত এবং ১১ হাজার ৪০৭ জন আহত হয়। ঈদ ঘিরে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধিকে প্রতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান। যুগান্তরকে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি সড়ক দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ। বিআরটিএ, বিআরটিসিসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো জবাবদিহিতা নেই, স্বচ্ছতা নেই। তাদের ব্যর্থতাগুলোর জন্য শাস্তি হয় না। তিনি আরও বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পর দেখা যায়-চালকের সমস্যা ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে সে গাড়ি চালাচ্ছিল অথবা বাসের সমস্যা ছিল। ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অদক্ষ চালকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। সড়কে আইন মানতে বাধ্য করতে পুলিশকে কঠোর হতে হবে।
সাইদুর রহমান বলেন, আসন্ন ঈদে বিপুল সংখ্যক ঘরমুখো যাত্রী পরিবহণ করার মতো পর্যাপ্ত মানসম্মত যানবাহন না থাকায় যাত্রীরা ভেঙে ভেঙে টেম্পোসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ গাড়িতে চড়তে বাধ্য হয়। এতে দুর্ঘটনা বাড়ে। এ সমস্যা সমাধানে সেনাবাহিনী, বিজিবি, আনসার, পুলিশ, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের বাসগুলো ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ ব্যবস্থাপনায় একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত বাসগুলো যাত্রী পরিবহণ করলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মানসম্মত যানবাহনের ঘাটতিও পূরণ হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে ২২ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়কে বেশির ভাগ চালক আইন বা নিয়মনীতি মানতে চান না। তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান। এছাড়া সড়ক রয়েছে বিশৃঙ্খলা। সড়ক-মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহনও চলছে। নির্বিঘ্নে চলছে লক্কড়-ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন বাস। এসব কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে, ঝরছে প্রাণ।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ প্রণয়ন করে। যানবাহনের গতির লাগাম টানতে মোটরযান গতিসীমাসংক্রান্ত নির্দেশিকা-২০২৪ জারি করা হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং জেলা শহরসহ বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বেশির ভাগ চালক এসব আইনের তোয়াক্কা করেন না। সড়কে এখন সাড়ে ছয় লাখের বেশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করছে। তাই সড়ক পরিবহণ আইন বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ঘাটতির কথা জানিয়েছেন দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা।
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দেশে ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলার মত রাস্তাও নেই। কিন্তু সুযোগ পেলেই চালকরা ১০০ কিমি. গতিতে গাড়ি চালান। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঢাকা-মাওয়া ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডে পরীক্ষামূলকভাবে অটো মামলা দেওয়া হচ্ছে। অন্য মহাসড়কেও গতির ওপর জোর দিয়ে অটো মামলা দেওয়া হবে। অটো জরিমানা সিস্টেম করে দিলে অনেকটা ভালো হবে বলে আমি মনে করি। তিনি আরও বলেন, গার্মেন্ট ছুটি হলে সড়কের চেহারা পালটে যায়। এক রুটের গাড়ি অন্য রুট দিয়ে যায় তখন দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। কারণ সড়ক সম্পর্কে চালকরা জানেন না। চালকদের সতর্ক করতে মাইকিং করা হচ্ছে। এ বছর ঈদের দীর্ঘ ছুটির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা কিছুটা কমতে পারে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর যুগান্তরকে বলেন, ঈদযাত্রার সময় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। শুক্রবার থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালু হয়েছে। বিআরটিএর সব কর্মকর্তা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাসস্টান্ডের পর্যবেক্ষণ বুথে অবস্থান করছেন। ভাড়া বেশি নিচ্ছে কিনা বা অন্যসব নিয়ম-কানুন মানছে কিনা সেসব বিষয়ে তারা মনিটরিং করছেন। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনা হ্রাসের ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ করাটাই মূল চ্যালেঞ্জ। মহাসড়কের বিভিন্ন স্পটে পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা যানবাহনের গতি মনিটরিং করছেন। আমরা চাচ্ছি-সব গণপরিবহণে বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস এবং ট্রাকগুলোতে জিপিএস যুক্ত করে দিতে। যখনই চালক ৮০ কিলোমিটারের উপরে গাড়ি চালাবে তখন স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তার জরিমানা হয়ে যাবে। আমরা এ বিষয়ে ইতোমধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি। এটা বাস্তবায়ন হতে হয়তো এক বছর সময় লাগতে পারে।