Image description

আহসান মোহাম্মদ

দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা হবে আগামী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ড. ইউনূসের সরকার চলে যাওয়ার সাথে সাথে দেশে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যা বাংলাদেশকে অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ও নির্মোহ আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন যাতে আগামীতে যারা সরকার গঠন করতে যাচ্ছে, তারা এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে পারে এবং বিষয়টি মোকাবেলায় তাদের পরিকল্পনা জনগণকে জানাতে পারে। 

আসুন দেখা যাক, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা নেয়ার সাথে সাথে কী কী অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী ঘটনা ঘটতে পারে:

১. নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে আন্দোলন:
আগামী নির্বাচনে জয়ের বিষয়ে প্রধান দুই দলই আশাবাদী। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দুই দলেরই জনসমর্থন প্রায় সমান সমান। এদিকে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন কতটুকু নিরপেক্ষ থাকতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুই দলের শক্তি প্রায় সমান হওয়ার কারণে কারচুপির নির্বাচন হলে দ্রুতই রাজপথে জোরালো আন্দোলন দানা বাঁধবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে এক-এগারোর পটভূমি তৈরি হয়েছিল বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে নিজেদের লোক বসানোর মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টার কারণে।

২. চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও স্থানীয় সন্ত্রাসীগ্রুপগুলোর দাপট ও অন্ত:কলহ:
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রধান দুটি দলের একটি সাংগঠনিক ভাবে সুশৃঙ্খল নয়। দলটির তৃণমূলের নেতা কর্মীদের ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এই দলটি ক্ষমতায় আসলে এবং এই সকল কাজে জড়িত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক গণবিক্ষোভ এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার মত ঘটনা ঘটতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন যে ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর নিজ দলের নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে নির্বাচনের পর পরই আইন শৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ঘটে, যাকে অন্য কোন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে খালেদা জিয়াকে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে সেনা নিয়ন্ত্রিত অভিযান চালাতে হয়। এতে একশতের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন বিএনপির নেতা কর্মী। এই দলটি এবার ক্ষমতায় এলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরণের কোন অপারেশন চালাবে বা চালাতে পারবে কিনা, না চালালে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা প্রয়োজন।

৩. বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক
বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আগামী সরকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এই চ্যালেঞ্জটি মূলত: দুইটি ফ্রন্ট থেকে আসতে পারে:
ক) উন্নয়ন সহযোগী ও পশ্চিমা দেশসমূহ:
উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো চাইবে একটি দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত সরকারের কাজ করতে। ২০০১-০৬ টার্মের সরকারের দুর্নীতির দুর্নাম ছিল। সে সময় পর পর পাঁচ বছর বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। দুর্নীতির কারণে সরকারের গতিশীলতা মারাত্মক বাধাগ্রস্থ হয়েছিল। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে সরকার চরমভাবে ব্যর্থ হয়, যার মূল্য দলটিকে পরবর্তীতে দিতে হয়েছিল। সরকারের দক্ষতার অভাবে সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা এবং বৃটিশ রাষ্ট্রদূতের উপর বোমা হামলার মত ঘটনা ঘটে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং এক-একারোর মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। উক্ত দলটি ক্ষমতায় আসলে আবারো একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অপরদিকে জামায়াতের বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলির কিছু রক্ষণশীলতা থাকতে পারে। যদিও হাসিনা পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতদের সাথে জামায়াতের ঘন ঘন বৈঠকের খবর দেখা যাচ্ছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তরে জামায়াতের আমিরকে দাওয়াত করেও নেয়া হয়। পশ্চিমাদের প্রধান উদ্বেগ – নারী ও অমুসলিম নাগরিক – উভয় ইস্যুতে দলটি খুবই ভালো করছে। তাদের নেতা-কর্মীদের সততা ও দক্ষতার সুনাম আছে। যদি তারা একটি দক্ষ, গতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত সরকার দেখাতে পারে, তাহলে পশ্চিমাদের সমর্থন ও সহযোগীতা পেতে পারবে। 

খ) ভারত:
ভারতের সাথে সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ বড় দুই দলের জন্য দুই রকম হবে। ২০১৪ সালের পর বিএনপি ভারতের বিষয়ে ধীরে ধীরে তার অবস্থান বদলাতে থাকে। খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার পর দলটির ভারত বিষয়ক ভাবনা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে, তারা মনে করতে থাকে ভারতের সমর্থনের অভাবেই দলটি ক্ষমতায় যেতে পারছে না। হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে ভারত দলটিকে আওয়ামী লীগে বিকল্প হিসেবে দেখতে চায়। ফলে বিএনপি ভারতের সমর্থন পাবে, তবে তার জন্য তাকে আওয়ামী লীগের মতই দেশের বড় বড় স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। অপর দলটির বিষয়ে ভারতের প্রকাশ্য অবস্থান নেতিবাচক। তবে, সম্প্রতি জানা গেছে, দেশটির রাষ্ট্রদূত উক্ত দলের আমিরের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এর থেকে বোঝা যায়, দেশটি সব দলের সাথেই কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই দলটি ক্ষমতায় আসলে ভারতের সাথে সম্পর্ক শীতল থাকতে পারে বা মালদ্বীপের মতও হতে পারে। উল্লেখ্য যে মালদ্বীপের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু ‘ইন্ডিয়া আউট’ কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে জয়ী হলেও ভারতের সাথে দেশটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। জামায়াতের সরকারের কুটনৈতিক দক্ষতার উপরেও এ সম্পর্ক নির্ভর করছে।

উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে, স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ দুই দলের জন্যই রয়েছে। আমরা আশা করবো, এই বিষয়ে দল দুটি তাদের কর্মপরিকল্পনা ও কৌশল জাতির সামনে পেশ করবে।