Image description

৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশ এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এই পটপরিবর্তন পরবর্তী বাংলাদেশে বর্তমানে এক চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে একদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভগ্ন দশা মেরামত করার বিশাল চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং বিদেশি শক্তির বহুমুখী প্রভাব বিদ্যমান। এমন এক জটিল সমীকরণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ ধারণাটি কেবল একটি তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে রাজপথের প্রধান দলগুলো—সবার ভাবনায় এখন আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট।

 

বাংলাদেশের প্রধান জাতীয় দৈনিকগুলোর কলাম ও সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান প্রশাসনের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামো মেরামত করা এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর যে গভীর দলীয়করণ হয়েছে, তা একক কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে নিরসন করা অত্যন্ত কঠিন। প্রথম সারির দৈনিকগুলোর উপসম্পাদকীয়গুলোতে বারবার এই যুক্তি উঠে আসছে যে, যদি একটি নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে সেখানে অন্য দলগুলোর অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এর বিপরীতে একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠিত হলে সেখানে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি, টেকনোক্র্যাট এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব। মূলত একটি নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পথ তৈরি করা এবং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা থেকেই বর্তমানে জাতীয় সরকারের বিষয়টি এত বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতীয় সরকারের রূপরেখা নিয়ে সবচেয়ে স্পষ্ট ও সুদূরপ্রসারী প্রস্তাব পেশ করেছেন। তারেক রহমান স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলেও তারা এককভাবে দেশ পরিচালনা করতে চায় না। বরং আন্দোলন-সংগ্রামে শরীক হওয়া সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠন করা হবে। তারেক রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের ফলে রাষ্ট্রের যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা একক কোনো দলের পক্ষে সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তার প্রস্তাবিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার কর্মসূচিতে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তনের কথা বলা হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের মেধাবী ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় সরাসরি সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। তার বক্তব্যে বারবার এটি উঠে আসছে যে, প্রতিহিংসার রাজনীতি বন্ধ করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ার সুযোগ তৈরি করতে সব মত ও পথের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোও রাষ্ট্র সংস্কারের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান হলো—একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় ও সমর্থন দেওয়া। তবে তারা দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের অংশ হিসেবে একটি ‘ইনসাফ ভিত্তিক’ ব্যবস্থার পক্ষে মত দিচ্ছেন। জামায়াতের নেতারা বিভিন্ন আলোচনায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চান যেখানে জনগণের মৌলিক অধিকার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং অন্যান্য ছোট দলগুলো জাতীয় সরকারের ধারণাকে একটি ‘বিপ্লবী রূপান্তর’ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে গত ৫৩ বছরে যে দ্বিদলীয় বৃত্তের রাজনীতি চলেছে, তা ভাঙার এখনই উপযুক্ত সময়। এই দলগুলো মনে করে, কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ব্যবস্থার পরিবর্তনই হলো প্রকৃত মুক্তি।

 

বর্তমানে জাতীয় সরকার আলোচনার কেন্দ্রে আসার পেছনে আইনশৃঙ্খলা ও ফ্যাসিবাদের বিচারের ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে ‘মব জাস্টিস’ এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা রোধে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদী শক্তির বিচার নিশ্চিত করার দাবি রাজপথে অত্যন্ত জোরালো এবং এই বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত করতে সব দলের সমর্থনপুষ্ট একটি কাঠামো দরকার। এছাড়া অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় জাতীয় সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট কাটাতে কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদী কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। একটি দলীয় সরকারের পক্ষে অনেক সময় কঠোর সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একটি জাতীয় সরকার, যেহেতু সেখানে সব প্রধান পক্ষের প্রতিনিধিত্ব থাকে, তাই তারা অপ্রিয় হলেও প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কারগুলো সহজে বাস্তবায়ন করতে পারে।

সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার দাবিটি এখন বেশ জোরালো। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের উচ্চতর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করা। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যমান একক কক্ষবিশিষ্ট ব্যবস্থায় কেবল সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আইনসভায় বসেন। কিন্তু প্রস্তাবিত নতুন ব্যবস্থায় একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের কথা বলা হচ্ছে, যেখানে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং বিভিন্ন পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে যেকোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভীর বিচার-বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হবে এবং কোনো একক দল বা ব্যক্তি ইচ্ছে করলেই সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাপট দেখিয়ে স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। উচ্চকক্ষ মূলত নিম্নকক্ষের ওপর একটি গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ হিসেবে কাজ করবে।

সংবিধান সংস্কারের অন্যান্য মূল দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা। বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে যে অসীম ক্ষমতা ন্যস্ত রয়েছে, তা সংশোধন করে রাষ্ট্রপতি ও সংসদের মধ্যে ক্ষমতার যৌক্তিক বন্টন এখন সময়ের দাবি। একই সাথে একজন ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—এমন বিধান যুক্ত করার ব্যাপারে প্রায় সব দলই একমত। এছাড়া বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে পৃথক স্বাধীন সচিবালয় গঠনের দাবিও অত্যন্ত জোরালো। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কেমন হবে, তা সংবিধানে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে নির্বাচন নিয়ে কোনো সংকট তৈরি না হয়।

আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দেশের মানুষের প্রত্যাশা এখন আকাশচুম্বী। দীর্ঘ বছর পর মানুষ একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। তবে এই নির্বাচনের আগে নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো দূর করাকে রাজনৈতিক দলগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তাই দিচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কার কমিশনগুলো গঠন করেছে, তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর যে সরকার গঠিত হবে, তার রূপরেখা হিসেবেই ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ ধারণাটি একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলেও দেখা যায় যে, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশ এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে একটি সংহত জাতীয় অবস্থান প্রয়োজন। একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সরকার থাকলে বিদেশি শক্তির পক্ষে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো কঠিন হয়। রাজনৈতিক দলগুলো যখন নিজেরা একটি টেবিলে বসে দেশ পরিচালনার রূপরেখা ঠিক করে, তখন বহির্বিশ্বের কাছে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়। এই সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদ থেকেও জাতীয় সরকারের বিষয়টি এখন রাজনৈতিক টকশো এবং গোলটেবিল বৈঠকের মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

পরিশেষে বলা যায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পুরনো ধাঁচের একদলীয় রাজনীতি আর কার্যকর নয়। কেন আজ ‘জাতীয় সরকার’ এত প্রাসঙ্গিক, তার উত্তর নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং বর্তমানের অমিত সম্ভাবনার মাঝে। এটি কেবল একটি সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং রাষ্ট্র মেরামতের একটি সামগ্রিক দর্শনে পরিণত হয়েছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর বিশ্লেষণ এবং তারেক রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান প্রমাণ করে যে, দেশ এক নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফ্যাসিবাদের বিচার নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। যদি এই জাতীয় সরকারের ধারণাটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবেই বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে পরিণত হবে।


লেখক: রাজু আলীম
কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব