Image description

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।  দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আস্থার সংকট ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতা নির্ধারণের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, জনগণের আস্থা ও ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার দিকনির্দেশক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে আগ্রহ, প্রত্যাশা ও প্রশ্ন—সবই রয়েছে।  এই ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, তার সীমা কোথায় এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তা কীভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এগুলোই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সশস্ত্র বাহিনী শুধু প্রতিরক্ষা দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিভিন্ন জাতীয় সংকটে তারা দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা জরুরি রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতিতে বাহিনীর পেশাদারিত্ব বারবার প্রমাণিত হয়েছে।  নির্বাচনের সময়েও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং প্রশাসনকে সহায়তার মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনী অতীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।  ফলে আসন্ন নির্বাচনেও জনগণ স্বাভাবিকভাবেই একটি নিরপেক্ষ, পেশাদার ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রত্যাশা করছে।

নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর মূল ভূমিকা কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নয়, বরং সংবিধান ও আইনের আলোকে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করা।  নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন চাপের মুখে পড়ে, তখন সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি একটি মনস্তাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা তৈরি করে।  সহিংসতার আশঙ্কা কমে, সাধারণ ভোটার নিরাপত্তার অনুভূতি পান এবং ভোটকেন্দ্রে অংশগ্রহণ বাড়ে।  এই সহায়ক ভূমিকা নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এখানে ভারসাম্য রক্ষা অত্যন্ত জরুরি।  সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে বা তাদের উপস্থিতিকে কোনো পক্ষ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করলে তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।  তাই বাহিনীর প্রতিটি কার্যক্রমকে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা, সংবিধান এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।  ক্ষমতার প্রদর্শন নয়, বরং দায়িত্ববোধ ও সংযমই হতে হবে তাদের আচরণের মূল ভিত্তি।

আসন্ন নির্বাচনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো গুজব, অপপ্রচার ও ডিজিটাল উত্তেজনা।  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সহিংসতা উসকে দিতে পারে।  এ ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি তথ্যযুদ্ধে না জড়ালেও মাঠপর্যায়ে শান্তি বজায় রাখা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও যোগাযোগব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।  এটি নির্বাচনকালীন সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নির্বাচনের সময় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।  বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদার বাহিনী হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে দেশে অনুষ্ঠিত একটি জাতীয় নির্বাচনেও সেই পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতার প্রতিফলন প্রত্যাশিত।  একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে, বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক আস্থাও বাড়াবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থার জায়গায় অটুট থাকতে হবে।  কোনো রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি আনুগত্য নয়, বরং রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্যই তাদের পরিচয়।  এই নীতিতে অবিচল থাকলে বাহিনীর ভূমিকা নির্বাচনকে বিতর্কমুক্ত করতে সহায়ক হবে এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ইতিবাচক অবদান রাখবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, আসন্ন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সহায়ক, সীমিত ও পেশাদার হওয়াই রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর।  তারা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে সহযোগিতার মধ্যে নিজেদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখে, তবে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে।  গণতন্ত্রের স্বার্থে, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার স্বার্থে এবং জনগণের আস্থার স্বার্থেই সশস্ত্র বাহিনীর এই সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা আজ সময়ের দাবি।

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক