ট্রাম্প ইরানে রেজিম চেইঞ্জের এডভেঞ্চার করতে গিয়ে যে সংকট তৈরি করেছিল, ইয়ামেনে তা আগে থেকেই করেছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ১২ বছর ধরেই করছেন। তাতে কিছুই করতে পারেননি হুথিদের। এবার পারবেন, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ইরান যুগপৎভাবে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সারভাইভ করার পর, হুথিরা আরও চাঙ্গা। গত সপ্তাহে তারা ইয়ামেনে সৌদি সমর্থিত বাহিনীকে কোনঠাসা করেছে। বাব আল মান্দেব প্রণাণীর উপকূল এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। প্রণালীর দ্বীপগুলোও তাদের দখলে। ফলে সৌদি জাহাজ চলাচল বন্ধ। হুথি লাগাতার হামলা চালাচ্ছে, সৌদি আরবে। গতকালই সৌদির রাজধানী রিয়াদে ড্রোন হামলা করেছে কিং খালেদ বিমান ঘাঁটিতে। ইতালির যুদ্ধ বিমান টাইফুন ধ্বংস করেছে। এর আগে সৌদির এফ-১৫ ভূপতিত করেছে হুথিরা।
সৌদি এর প্রতিশোধে আন্ধাধুন বিমান হামলা করছে ইয়ামেনের সানায়। কিন্তু ইয়ামেন তো আগে থেকেই ধ্বংস। আর কী করবে সৌদি? হুথির হারানোর কিছু নেই। তারা সৌদি পাপলাইন ধ্বংস করে দিয়েছে। যদিও ড্রোনটা এসেছিল, ইরাক থেকে। সুতরাং কে মারছে বলা মুশকিল। তবে ধারনা করা যায়, হুথিদের সমর্থকদের কাজ।
এই পাইপ লাইন ধ্বংস হওয়ার কারণে সৌদি জানিয়েছে, তারা ইউরোপে সেপ্টেম্বর এবং অক্ট্রোবর মাসে তেল পাঠাতে পারবে না। মনে হচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশও সৌদি তেল পাবে না।
আমেরিকা ইরানের তেল ক্ষেত্র ও পেট্রোক্যামিকেল শিল্পে হামলা করেছিল। ঠিক এই কাজটাই হুথিরা করছে সৌদির সঙ্গে। সৌদির টাকা আছে, আধুনিক বিমান, গোলাবারুদ, ড্রোন আছে। কিন্তু সেগুলো চালিয়ে যুদ্ধ জেতার মত বাহিনী ও প্রশিক্ষণ নেই। তার ওপর যে বাস করে বিলিয়ন ডলারের প্রাসাদে। হুথিরা বাস করে বস্তি ঘরে। এইসব বস্তি সৌদি গুড়িয়ে দিলে যে ক্ষতি হয়, হুথিরা যদি সৌদির প্রাসাদে একটা ঢিলও লাগতে পারে, সেই ক্ষতি কয়েকশ গুণ বেশি।
দিশেহারা সৌদি এখন সবার কাছে সহায়তা চাইছে। আমেরিকা মানা করে দিয়েছে। ইউরোপ জ্বালানি নিশ্চয়তা নিশ্চিতে কিছুটা আগ্রহ দেখিয়েছে। আরব আমিরাত এখন আবার সৌদির বিরুদ্ধে। মিশর রাজি নয় সৌদিকে হেল্প করতে। পাকিস্তানের কাছে সহায়তা দিয়েছে। পাকিস্তান সেনা পাঠিয়ে নয়, কৌশলগত পরামর্শ দিতে রাজি হয়েছে।
শেষেমেশে ইসরায়েলের হেল্প চেয়েছে সৌদি! অবিশ্বাস্য হলেও তা সত্য। কিন্তু ইসরায়েলও এই যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। আমেরিকা তো নয়-ই। যে আমেরিকা দুই বছর আগে হুথিদের ওপর নির্বাচার বিমান হামলা করেছিল, তারাই এখন হুথিদের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানিয়ে জেডি ভান্স। আমেরিকার অবস্থান হল, নিজে বাঁচলে বাপের নাম।
শেষে পর্যন্ত চীনকে ধরেছে সৌদি। চীন ধরেছে ইরানকে। যাতে ইরান হুথিদের থামায়। হায় আল্লাহ খালেদ এই হলো মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা। ৮০ বছর ধরে সৌদির একমাত্র নিরাপত্তা গ্যারেন্টার আমেরিকা, কিন্তু সৌদিকে হেল্প চাইতে হচ্ছে চীনের কাছে।
হুথি এবং হিজবুল্লাহ ইরানের সমর্থিত বাহিনী। কিন্তু হুথির নিজস্ব ইতিহাস আছে। চার দশকের লড়াইয়ের সিলসিলা আছে। তারা ইরান সমর্থিত হলেও, ইরানের কাছে এমন রিমোট নেই, যা টিপে হুথিকে বন্ধ করাতে পারবে।
এখন ওমানের মধ্যস্থতায় গোপনে একটা সমাধান চেষ্টা চলছে বলে খবর বেরিয়েছে। সৌদি বিরতিতে যুদ্ধ বিরতিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য হল, এবার হুথিরা রাজি নয়। তারা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। তাদের শর্ত হল, সৌদিকে আকাশ, জল, স্থলের সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। এটা সৌদি মেনে নেওয়ার অর্থ হচ্ছে, আত্মসমর্পনের দলিলে সই করা।
কিন্তু এই দুই যুদ্ধ বিশ্বকে কই নিয়ে যাবে তা বলা মুশকিল। মন্দা তো মনে হচ্ছে মাস্ট। ঋণের হার বাড়ছে সর্বত্র। বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। আমেরিকায় ডিজেলের গড় দাম প্রতি গ্যালন সাড়ে ৬ ডলার। ক্যালিফোর্নিয়ায় ক্ষেত্রবিশেষে দাম প্রতি গ্যালন ৭.৭৬ ডলার থেকে ৮.৩৫ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। যা আমেরিকার ইতিহাসে রেকর্ড। সৌদি আরব থেকে দিনে গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৭৭ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করে ইউরোপ।
ইরান এবং ইয়ামেন পরিস্থিতি ঠিক না হলে, এটা কই যাবে, আল্লাহ কেউ জানে না। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ব্যাংক জেপি মরগান পর্যন্ত বলছে, আমরা সহজ কথায় জানি না যে এই পরিস্থিতির শেষ কোথায়।
বাংলাদেশের কী হবে, এটাও বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ মোট চাহিদার ৩৫-৪০ শতাংশ তেল আনে সৌদি থেকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে ধরা। রাশিয়া, ভেনিজুয়েলার তেল কেনা বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব না। কারণ ওইসব তেলের পরিশোধনের সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। কিনতে হবে পরিশোধিত তেল। সেই ক্ষেত্রে দাম যা হবে, তাতে সরকারের জাঙ্গিয়া বিক্রির উপায় হবে।
২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৫.১৪ বিলিয়ন ডলারের তেল আমদানি করেছিল। ২০২৫-২০২৬ সালে আগের চেয়ে সামান্য বেশি তেল আমদানিতে খরচ হয়েছে ১০.০৬৪ বিলিয়ন ডলার। মানে প্রায় দ্বিগুণ। ৬৫ হাজার কোটি টাকার বেশি লেগেছে।
বাংলাদেশ গ্যাস কিনত কাতারের কাছ থেকে। সেটাও এখন বন্ধ। চুক্তি অনুযায়ী, কাতারের বাংলাদেশের কাছে বছরে ৪০ কার্গো গ্যাস বিক্রি করার কথা। ২০২৬ সালে ৫৬ কার্গো গ্যাস কেনার কথা। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসে মাত্র ১ কার্গো এসেছে। কারণ, কাতারের গ্যাস ক্ষেত্র এবং গ্যাস ফ্যাসিলিটিকে ইরান হামলা করে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। ফলে স্পট মার্কেট থেকে আড়াই তিন গুণ দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
আমেরিকায় নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প কাকু কী করবে তা অনিশ্চিত। একমাত্র তিনিই পারেন এই সমস্যা সমাধান করতে। তিনি, ইসরায়েল এবং সৌদি যদি যুদ্ধ থামিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যায়, এটাই সমাধান। এছাড়া আর পথ নেই। কারণ, এটা নিশ্চিত হয়ে গেছে, যুদ্ধ করে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ালেও তারা ইরান, হিজবুল্লাহ, হুদিকে হারাতে পারবে না। এই ক্ষয়ক্ষতি শুধু ইরান, লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়ামেনকে নয়, সারাদুনিয়ার ভোগান্তি আরও বাড়াবে।
মধ্যাপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ শুধু তেল গ্যাস কিনে না। ওই সব দেশ বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের খনি। ওইসব দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে, বাংলাদেশের রেমিট্যান্স কমে যাবে। এমনিতেই আমদানি ব্যয় বেশি, তেল গ্যাস কেনার খরচ বেশি, এর মধ্যে রেমিট্যান্স যদি কমে, তাহলে বাংলাদেশ ২০২২-২০২৩ সালের মত ডলার সংকটে পড়বে।
ইউরোপ আমেরিকায় জ্বালানি সংকট এবং মূল্যস্ফীতি উর্ধ্বমুখী থাকলে, ওইসব দেশ বাংলাদেশ থেকে মালামাল কেনা কমিয়ে দেবে। আবার ওরাই আমাদের মূল কাস্টমার। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি কমলে এবং একইসঙ্গে আমদানি খরচ বাড়লে বাংলাদেশ কাঙ্গাল হয়ে যাবে।
ফলে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের রক্ষা নেই। এসব সমস্যার একটাও বর্তমান সরকারের তৈরি না। কিন্তু এখান সরকারকেই এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করতে হবে। দেখাতে হবে, আসলেই তাদের দেশ চালানোর প্ল্যান আছে। এই জন্য হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে না থাকে বিকল্প উৎস থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল ও গ্যাস কিনতে হবে। সাপ্লাই ঠিক রাখতে হবে। খুব হিসাব করে ডলার খরচ করতে হবে।
ইরান, হুথি, সৌদি সবাইকে আস্থায় রেখে রাজি করাতে হবে, যাতে বাংলাদেশের সাপ্লাই যাতে ঠিক থাকে। ইউরোপ, আমেরিকাকে আস্থা রেখে রপ্তানি ঠিক রাখতে হবে। এগুলো যদি সরকার করতে পারে, তাহলে বোঝা যাবে, আসলেই প্ল্যান ছিল এবং আছে। কিন্তু সংকটের সময় চুপচাপ বসে পরিস্থিতি দেখা সরকারের কাজ না। তাহলে এক্স ওয়াই জেড একজন কেউ প্রধানমন্ত্রী হলেই হয়। সেই সরকারই ভালো, যে সংকটের সময়ে বুদ্ধি কৌশল দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারে। আর ভালো সময় তো যে কেউ-ই পার করতে পারে।