Image description

হওয়ার কথা ছিলো বন্যপ্রাণী আর প্রকৃতির অভয়ারণ্য। কিন্তু সুন্দরবন পরিণত হয়েছে বনদস্যু জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে। অপহরণ, চাঁদাবাজি, মুক্তিপণ আদায়, হত্যাকা-ের ঘটনায় ক্রমশঃ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে বিশ্বখ্যাত এই ‘ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’। পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ হিসেবে সুন্দরবন ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বটে। কিন্তু এটি এখন চোরাকারবারি, বনদস্যু, মাদকপাচারের মতো অপরাধীদের অভয়ারণ্য। খুলনা,বাগেরহাট,পিরোজপুর, বরগুনাজেলা সহ সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তত ৩ লাখ মানুষের জীবিকা সুন্দরবন কেন্দ্রিক। পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে ১০ লাখ মানুষের। এদের কেউ জেলে, কেউ মৌয়াল, কেউবা বাওয়ালি, কাঁকড়া শিকারি, চিংড়ি পোনা সংগ্রহকারী। বনের ভেতর ডালপালার মতো বয়ে চলা নদী ও খাল থেকে শামুক ও ঝিনুক কুড়িয়ে চুন তৈরি করেও জীবিকা নির্বাহ করছে অনেকে। প্রান্তিক পর্যায়ের এ জনগোষ্ঠীর জীবিকা, নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধার প্রশ্নটি জাতীয় ভাবনার প্রসঙ্গ হয় না কখনো।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বিলুপ্ত প্রায় রয়েলবেঙ্গল টাইগারসহ নানা প্রাণীর বিলোপ, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে এনজিওগুলোকে মাঝেমধ্যেই সভা-সমাবেশ করতে দেখা যায় বটে। কিন্তু বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড এবং অখণ্ড নৌসীমা হিসেবে সুন্দরবনের ওপর দেশের প্রশাসন কীভাবে কর্তৃত্ব হারাচ্ছে, অসহায় হয়ে পড়ছেÑ সেই উদ্বেগ কি কারো আছে ? 
প্রশ্নটি এসেছে চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সুন্দরবনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিদৃষ্টে। আ’লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক অপরাধীচক্র। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে গড়ে অপহৃত হতেন ১শ’ জন বনজীবী।

কিন্তু আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর শৈথিল্যের সুযোগে গত কয়েক মাসে অপহরণের ঘটনা বেড়েছে কয়েক গুণ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই সুন্দরবনে ৩ শতাধিক অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় জেলে, বাওয়ালি ও কাঁকড়া শিকারিরা হয়েছেন অপহরণের শিকার। চলতি বছরের শুরুর দিকেও ঘটে বেশ কিছু অপহরণের ঘটনা। গত জানুয়ারিতে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে একদফায় ১৮ জন জেলেকে অপহরণ করে দস্যুরা। একই মাসে ২ জন বিদেশি পর্যটক এবং একজন রিসোর্ট মালিককে অপহরণ করে। এ বছর মে মাসে সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জ থেকে পৃথক অভিযানে ২২ থেকে ৩০ জন বনজীবীকে মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি করে সশস্ত্র দস্যুরা।

গত মাসে সুন্দরবনের পূর্ব জোন থেকে ট্রলারসহ আরো ৫ জন জেলেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায়। অপহরণের পর সাধারণ জেলেদের কাছ থেকে ২০ থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করছে। পর্যটক, ব্যবসায়ী ও রিসোর্ট মালিকদের কাছ থেকে মুক্তিপণ নিচ্ছে ১ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত। নিরীহ, নিরস্ত্র বনজীবীদের অপহরণ করা সহজ। তাদের অপহরণ করে গহীন বনে নিয়ে আটকে রাখা হয়। মোবাইল বা বিকাশের মাধ্যমে দ্রুত গোপনে মুক্তিপণ আদায় করে ফেলে তারা। অপহরণের শিকার বনজীবীরা ভয়ে অনেক সময় প্রশাসনকে না জানিয়ে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে স্বজনকে জীবিত ফিরিয়ে আনার পথটিই নিরাপদ মনে করেন। কেউ প্রশাসনের সহযোগিতা নেয়ার চেষ্টা করলে শিকার হচ্ছেন হত্যাকা-ের।

কারা জড়িত : সুন্দরবন কেন্দ্রিক অপরাধীরা গড়ে তুলেছে অন্তত দুই ডজন দুর্ধর্ষ দস্যু বাহিনী। এসব বাহিনীর রয়েছে নাম, উপ-নাম। এক সময় ‘ডন বাহিনী’, মোস্তফা শেখের নেতৃত্বাধীন ‘মাস্টার বাহিনী’, ‘শরীফ বাহিনী’, ‘করিম-শরীফ বাহিনী’, ‘জিয়া বাহিনী’র নামে কাঁপতো সুন্দরবন। পরে কর্তৃত্বে চলে আসে ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’, ‘মাস্টার বাহিনী’, ‘আনারুল বাহিনী,’ ‘আফতাব বাহিনী’, ‘আফজাল বাহিনী’ ওরফে ‘দুইভাই বাহিনী’, ‘মিজান বাহিনী’। ২০১৮ সালের দিকে আবির্ভাব ঘটে জাহাঙ্গীর মোড়ল নেতৃত্বাধীন ‘নানাভাই বাহিনী’, ‘ফজলু বাহিনী,’ ‘আলিফ বাহিনী’, ‘শান্তিবাহিনী,’ ‘দয়াল বাহিনী’, ‘মজনু বাহিনী,’ ‘ছোট সুমন বাহিনী’, ‘আসাবুর বাহিনী’, ‘রবিউল বাহিনী’, ‘জোনাব বাহিনী’, ‘ভাই ভাই বাহিনী’, ‘মামা-ভাগ্নে বাহিনী’। এসব বাহিনী এতোই দুর্ধর্ষ যে, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এসব বাহিনীর কাছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, বনবিভাগ রীতিমতো অসহায়। সুন্দরবনের ভৌগলিক পরিবেশ, গোলক ধাঁধা, সহজ টার্গেট, শিকারের প্রাপ্যতা, দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, আইন-প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় অসাধুচক্রের ইন্ধন সশস্ত্রগোষ্ঠী গুলোর অপরাধ সাম্রাজ্য বিস্তারে অনুকূল পরিবেশ দিয়েছে।

তথ্যের উন্মুক্ত উৎসগুলো বলছে, সুন্দরবনের অপহরণ ও দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার পেছনে রয়েছে ভৌগলিক জটিলতা এবং আত্মসর্পণের পুনর্বাসনের অভাব। অসাধু মহাজনদের পৃষ্ঠপোষকতা। ২০১৮ সালে একবার সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বছরগুলোতে বিশেষ করে ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে নতুন করে একাধিক দস্যুবাহিনীর উত্থান ঘটেছে।

মুক্তিপণ আর চাঁদাবাজির মাধ্যমে এসব বাহিনী প্রধানগণ হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ ছাড়া চোরাই পথে লুট করছে মূল্যবান কাঠ, গোলপাতাসহ নানা বনজ সম্পদ, জলজ ও বন্যপ্রাণীজ সম্পদ। শত শত হরিণ শিকার করছে। হত্যা করছে বাঘ। দেশের ভেতর মাদক প্রবেশ করানোর নিরাপদ রুট হিসেবেও ব্যবহার করছে সুন্দরবনকে। স্থানীয় প্রশাসনের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমনই হোক, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। ওই অঞ্চলের কোনো পয়েন্টে নতুন কোনো মানুষ প্রবেশ করলেই গোষ্ঠীগুলোর কাছে খবর চলে যায় মুহূর্তেই। বনের গহীনে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না। পক্ষান্তরে সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করছে ওয়াকিটকি।

ফলে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত স্থান বদল, নিরাপদে পালিয়ে যাওয়া সহজ। একেকটি গোষ্ঠীতে সদস্য সংখ্যা থাকে ৬ থেকে ৬০ জনও হতে পারে। এর মধ্যে এক বাহিনী ভেঙ্গে তৈরি হয় স্বতন্ত্র সশস্ত্র বাহিনী। কখনো আস্থার সঙ্কট দেখা দিলে নিজেদের মধ্যেই ঘটে গোলাগুলি। ‘অনিরাপদ’ মনে হলে সরিয়ে দেয়া হয় পথের কাঁটা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত কয়েক বছরে অন্ততঃ ১শ’ ৩৫ জন বনদস্যু নিহত হয়েছেন। মুক্তিপণ না পেয়ে দস্যুদের নির্যাতনে প্রতিবছরই মারা যান নিরীহ বনজীবী। হত্যার পর বনের গহীনে দেয়া হয় মাটি চাপা। ফলে এসব হত্যাকা-ে কোনো রেকর্ড থাকে না। অথচ এসব দস্যুতা, অপরাধমূলক তৎপরতা এবং বর্বর হত্যাকা- সম্পর্কে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো চুপ।

উন্মুক্ত তথ্যসূত্রের মতে, সুন্দরবনের বিভিন্ন দস্যুবাহিনীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই লেগেই থাকে। নেতৃত্বের কোন্দল, মুক্তিপণের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ, লুন্ঠিত মালামাল ভাগাভাগি এবং চরম অবিশ্বাসের কারণে তাদের মধ্যে বহুবার অন্তর্ঘাতের ঘটনা ঘটেছে। বনদস্যুদের আয়ের মূল উৎস মৎস্য শিকারি, গোলপাতা সংগ্রহকারী (বাওয়ালি) ও মধু সংগ্রহকারী মৌয়ালদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়। মুক্তিপণের বড় অংশ বাহিনীর প্রধান কিংবা সেকেন্ড-ইন-কমান্ডের পকেটে যায়। সাধারণ সদস্যরা অধিকাংশ সময় পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। অপরাধলব্ধ অর্থের এই অসম বণ্টন থেকে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ। যা অনেক সময় দলের ভেতরেই বিদ্রোহ বা প্রধানকে হত্যার পরিকল্পনায় রূপ নেয়।

একটি বাহিনী যখন সদস্য সংখ্যায় বড় ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে তখন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড নিজেই নতুন বাহিনীর প্রধান হওয়ার স্বপ্ন দেখে। মূল নেতার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে অনুগত অন্য সদস্যদের নিয়ে দল গঠন করা সুন্দরবনের বনদস্যুদের মধ্যকার মামুলি ঘটনা। এ প্রক্রিয়ায় এক সময়কার কুখ্যাত ‘মাস্টার বাহিনী’ ভেঙ্গে গঠিত হয় ‘ইলিয়াস বাহিনী’ ও ‘সাগর বাহিনী’। পরবর্তী দু’টি বাহিনীতেও ভাঙ্গন দেখা দেয়।

সূত্র বলছে, দলের ভেতরের গোপন তথ্য আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী বাহিনীর কাছে ফাঁস করে দেয়ার ঘটনা ঘটে। সে ক্ষেত্রে তথ্য ফাঁসকারী ধরা পড়লে নির্ঘাৎ গুপ্ত হত্যার শিকার হতেন। কখনো বা বাহিনীর প্রধানও শিকার হন গুপ্ত হত্যার।

দস্যু বাহিনীগুলো কী ধরনের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় তাদের কিছু ‘আত্মসমর্পণ’ অনুষ্ঠানে। সুন্দরবনের বনজীবী, জেলে, মৌয়াল ও পর্যটকদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ছিলো ‘মাস্টার বাহিনী’। মোস্তফা শেখ ওরফে ‘কাদের মাস্টার’র নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিলো দুর্ধর্ষ ‘মাস্টার বাহিনী’। নৌকা ও জেলেদের জিম্মি করে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করতো মোস্তফা শেখের বাহিনী।

২০১৬ সালের ১ জুন নিজ বাহিনীর ৯ সদস্যসহ সরকারের কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টার। মংলা বন্দরের জেটি সংলগ্ন এলাকায় আত্মমর্পণকালে তার বাহিনীর সদস্যরা দেশি-বিদেশি ৫২টি আগ্নেয়াস্ত্র, সাড়ে ৪ হাজার গুলি সমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণকালে মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দেন। মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টারের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার কাটাখালি এলাকায়। তার পিতা আব্দুল লতিফ শেখ ছিলেন সুন্দরবনের মাছ ব্যবসায়ী।

এসব দস্যুবাহিনী ইচ্ছে করলেও অনেক সময় আত্মসমর্পণ করতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকে যখন আত্মসর্পণের সুযোগ দেয়া হয় (সাধারণ ক্ষমা ও পুনর্বাসন), তখন বাহিনীর ভেতর দু’টি পক্ষ তৈরি হয়। একপক্ষ আত্মসমর্পণ করতে চাইলে অন্যপক্ষ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো বনদস্যু নিজেকে রক্ষা করতে সরকারের কাছে পুরস্কার পাওয়ার লক্ষ্যে অস্ত্রের গোপন আস্তানার সন্ধান দিয়ে দেন। নিজ দলের ভেতর কোনো সদস্যের সঙ্গে নেতার দূরত্ব সৃষ্টি হলে প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য বড় কোনো বাহিনী ওই সদস্যকে অর্থ এবং ক্ষমতার লোভ দিয়ে নিজ দলে টেনে নেন।

২০১৬ সালে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণার পরও বাহিনীগুলোর মাঝে বিভাজন দেখা দেয়। সেই থেকে সৃষ্টি হয় অন্তর্কোন্দলও। মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টারের আত্মসমর্পণকেও তার বাহিনীর অনেক সদস্য মেনে নিতে পারেনি। ফলে তারা পৃথক বাহিনী গঠন করে দস্যুতাবৃত্তিতেই থেকে যায়। দস্যুদের তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন- এমন অভিযোগে গঠিত নতুন বাহিনী এখন মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টারের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া।

আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ধারাবাহিক চিরুনি অভিযানের মুখে গত ৩১ আগস্ট আত্মসমর্পণ করে ৫টি সক্রিয় দস্যুবাহিনীর প্রধানসহ ৫৯ জন। এর মধ্যে রয়েছে ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’র ১৬ জন, ‘আনারুল বাহিনী’র ১৩ জন। ‘আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনী’র ১৫ জন। ‘আফতাব বাহিনী’র ৮ জন। ‘মিজান বাহিনী’র ৭ জন। এ সময় তারা ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫শ’ ৪১ রাউন্ড গুলিও সমর্পণ করেন।

দস্যুতাবৃত্তির পুনরাবৃত্তি : আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং বনবিভাগের নিরাপত্তারক্ষীদের চাপে ইতিপূর্বে বেশ কয়েকটি বাহিনী সরকারের কাছে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে নানা অজুহাতে তারা ফিরে গেছে দস্যুতাবৃত্তিতেই। ২০১৮ সালে সুন্দরবনকে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণার পর কিছু বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেন। পরবর্তীতে পুনর্বাসনে বিলম্ব, আইনি জটিলতা, প্রতিপক্ষের গুলিতে প্রাণ হারানোর আশঙ্কাসহ নানা কারণ দেখিয়ে পুরনো ‘পেশা’য় আত্মনিয়োগ করেন। কেউ পুরনো সদস্যদের একত্রিত করে নতুন বাহিনী গঠন করেছেন।

কেউবা নতুন-পুরনো মিলিয়ে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। আত্মসমর্পণের পর দস্যুবৃত্তিতে ফিরে যাওয়া বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে জাহাঙ্গীর মোড়লের নেতৃত্বাধীন ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’,‘নানা ভাই বাহিনী’, আত্মসমর্পণকারী ‘শান্ত বাহিনী’র সেকেন্ড-ইন-কমান্ড গড়ে তুলেছেন ‘ফজলু বাহিনী’। আত্মসমর্পণের পর পুনরায় সক্রিয় হয়েছে ‘দুলাভাই বাহিনী’। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম অংশ জেলেদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ে এখন সক্রিয় রয়েছে ‘শরীফ বাহিনী’ ও ‘করিম-শরীফ বাহিনী’। এ ছাড়া ‘ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী’, ‘আসাবুর বাহিনী,’ ‘রবিউল বাহিনী’, ‘জোনাব বাহিনী,’ ‘ছোট সুমন বাহিনী’, ‘ভাই-ভাই বাহিনী’ এবং ‘মামা-ভাগ্নে বাহিনী’।

কোস্টগার্ড ও ‘নিখোঁজ নাটক’ : আধুনিক যন্ত্রপাতি, জনবল সঙ্কটসহ নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বন বিভাগ, নৌ-পুলিশ, পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী প্রায়ই এসব বনদস্যুদের কাছে অপরাধ সংঘটনের পথে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে চলতি বছর পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যরা আত্মসমর্পণকেই শ্রেয় মনে করেন। কিন্তু যারা দস্যুতাকেই আজীবনের ‘জীবিকা’ হিসেবে গ্রহণ করেছেÑ এসব বাহিনীর কাছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী বরাবরই অস্বস্তিকর। বিশেষতঃ অপরাধ সংঘটনের ‘স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট’ এলাকায় যদি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান কিংবা নজরদারি বাড়েÑ সেটি দস্যুবাহিনী গুলোর বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দস্যুরা তখন সুযোগ বুঝে সশস্ত্র হামলাও চালায় আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর ওপর।

দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিলো মোংলা উপজেলাধীন সুন্দরবনের পশ্চিত জোনের ‘নন্দবালা খাল’। এ এলাকার জলদস্যুদের দমনে ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি এই স্থানে ঘাঁটি গাড়ে ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড’র একটি পন্টুন। কারিগরি ও জনবল সীমাবদ্ধতার ভেতরও এ সুন্দরবনের অঞ্চল ও হারবারিয়া সংলগ্ন এলাকার অপরাধ দমনে কোস্টগার্ডের কর্মতৎপরতা প্রশংসিত হয়। স্থানীয় বনজীবী, ‘ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন’, ‘বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশন, মোংলা বন্দর মাঝি মাল্লা সংঘ, বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, মোংলা উপজেলা শিপিং পেইন্টিং ইউনিয়নও তাদের পেশাগত কার্যক্রম পরিচালনায় স্বস্তি ফিরে পায়। কিন্তু বনদস্যু, জলদস্যু বাহিনীর অপরাধ সংঘটনের বড় একটি স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট হচ্ছে সুন্দরবনের মোংলা থানাধীন ‘জয়মনির ঘোল’ পয়েন্ট।

পেশাজীবীদের অব্যাহত অনুরোধে বনদস্যুদের ব্যাপক অপতৎপরতা রোধে গত বছর ৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের স্টেশন হারবারিয়া (ভাসমান পন্টুন)টি নিয়ে নোঙর করে বনদস্যুদের স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্ট জয়মনির ঘোল এলাকায়। আর তাতেই দস্যুবাহিনীগুলোর মাঝে অস্বস্তি বাড়ে। স্থানীয় বনজীবী ও সাধারণ মানুষ কোস্টগার্ডের এই উপস্থিতিকে সাধুবাদ জানান। পক্ষান্তরে দস্যুদের মাঝে বাড়িয়ে তোলে আতঙ্ক। জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, মুক্তিপণ দাবি, হরিণসহ বন্যপ্রাণী নিধন, কাঠ পাচার বিঘিœত হতে থাকে। বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে মাদক প্রবেশের নিরাপদ রুটও হয়ে উঠলো অনিরাপদ। 

ফলে অপরাধীদের মাছে অস্বস্তি ও ঝুঁকি সৃষ্টিকারী কোস্ট গার্ডের পন্টুনটিকে সরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে দস্যুবাহিনীগুলো। বিশেষতঃ ড্রোনের মাধ্যমে কোস্টগার্ডের সার্বক্ষণিক নজরদারি, বেশ কয়েকটি সফল ‘অপারেশন’ আতঙ্ক ধরিয়ে দেয় দস্যুদের মনে। ফলে দস্যু বাহিনীগুলো পরস্পর অন্তর্কলহে লিপ্ত হলেও অভিন্ন টার্গেটে পরিণত হয় কোস্টগার্ডের ‘হারবারিয়া পন্টুন’। এ লক্ষ্যে পন্টুনের ওপর বিভিন্ন সময় চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। ক্যামেরাসহ যন্ত্রপাতিও খুলে নিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১০ এপ্রিল বনদস্যুরা পেয়ে যায় এক মোক্ষম মওকা। দুর্ধর্ষ বনদস্যু ‘মাস্টার বাহিনী’র প্রধান মোস্তফা শেখ ওরফে কাদের মাস্টারের পুত্র ‘মিরাজ শেখ’ (৩০) হঠাৎ নিরুদ্দেশ। 

ঘটনা বাগেরহাট মোংলা উপজেলার জয়মনির ঘোল বাজার (ঠোটার মোড়)। সন্ধ্যার দিকে রটে যায় মিরাজ শেখকে পাওয়া যাচ্ছে না! আর যায় কোথায় ? মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন, মা তাসলিমা বেগম, বোন লিজা ইসলাম রটিয়ে দেন, মিরাজ শেখকে সাদা পোশাকধারীরা ধরে নিয়ে গেছেন! এ মুখ থেকে ওই মুখ। গোটা অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া হয় বনদস্যু (পরবর্তীতে আত্মসমর্পণকারী) ছোট সুমন বাহিনীর সঙ্গে কাজ করা মিরাজ শেখকে পাওয়া যাচ্ছে না। ‘তাকে গুম’ করা হয়েছে-মর্মে অভিযোগ তোলা হয়। আর সেই ‘অভিযোগ’র তীর ছোড়া হয় জয়মনির ঘোল এলাকায় অবস্থানরত কোস্টগার্ডের ভাসমান পন্টুনে অবস্থানরত সদস্যদের প্রতি। 

কয়েকদিনের মধ্যেই সুন্দরবনের বনদস্যুদের দিক থেকে প্রশাসনের দৃষ্টি স্থানান্তরিত হয় সেখানে দায়িত্বরত কোস্টগার্ড সদস্যদের প্রতি। এ ঘটনাকে ‘ইস্যু’ সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। হামলা হয়েছে। আত্মরক্ষার্থে মামলা হয়েছে। আর এটিই যেন ছিলো সুন্দরবন জলদস্যুদের দীর্ঘদিনের আকাক্সক্ষা। বিষয়টি গড়াতে গড়াতে এখন রীতিমতো ‘মানবাধিকার’ এর ফেরিওয়ালা এনজিওগুলোর মোক্ষম খোরাক। এ কারণে পর্যবেক্ষক মহলের গভীর সন্দেহ, ১৯৯৪ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রতিষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ কোস্টগার্ড’র গায়ে নেতিবাচক কোনো তকমা দিতে সুন্দরবনের দস্যুবাহিনী এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দানকারী স্থানীয় রাজনীতিকদের কোনো নাটক নয়তো ?

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় বনদস্যুদের চাতুর্যের কাছে কোনোভাবেই হার মেনে নেয়া নয়। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বনদস্যুদের দমনে প্রয়োজন অপরাধীদের স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বৃদ্ধি করা। সুন্দরবন বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো বনাঞ্চল নয়। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জনবল স্বল্পতা দূর করে সেখানে প্রয়োজন স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী ও কোস্টগার্ডের নিরবচ্ছিন্ন শক্ত উপস্থিতি।