Image description
আবদুল লতিফ মাসুম

আবদুল লতিফ মাসুম

গণতন্ত্র একটি প্রাচীন ধারণা হলেও সংসদীয় গণতন্ত্র তুলনামূলকভাবে এক নবীন পরিশীলিত ব্যবস্থা। গ্রিক নগররাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ‘ডেমোক্রেসি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ জনগণের শাসন। আব্রাহাম লিংকন একে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন অমর বাক্যে—‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের শাসন’ (Government of the people, by the people, for the people)। এই বিমূর্ত ধারণাকে বাস্তবের কাঠামোয় রূপ দিতে গিয়ে মানবসভ্যতা যে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করেছে, তার নাম সংসদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ওয়াল্টার ব্যাজহট তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The English Constitution’-এ পার্লামেন্টকে বলেছেন রাষ্ট্রের ‘মর্যাদাপূর্ণ’ ও ‘কার্যকর’ অংশের সংযোগসেতু। সংসদই সেই মঞ্চ, যেখানে জনগণের প্রতিনিধিরা যুক্তি ও পাল্টা-যুক্তির মধ্য দিয়ে জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করেন। ‘Parliament’ শব্দটির উৎপত্তি ফরাসি ‘parler’ থেকে, যার অর্থ কথা বলা। অর্থাৎ সংসদ মূলত কথা বলার জায়গা—কিন্তু সে কথা হবে যুক্তির, বিতর্কের, সহনশীলতার; কলহ ও হট্টগোলের নয়।

সংসদীয় গণতন্ত্রের দুটি প্রধান মডেল পৃথিবী সমাদৃত—একটি ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতি, অন্যটি মার্কিন প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা। ব্রিটেন সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার। তারা কোনো লিখিত সংবিধান রচনা করেনি, বরং শত শত বছরের রীতি, প্রথা ও দৃষ্টান্তকে সংবিধানের মর্যাদা দিয়েছে। সেখানে রাজা রাজত্ব করেন কিন্তু শাসন করেন না। প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী, যিনি সংসদের কাছে দায়বদ্ধ। ব্রিটিশ সংসদের সবচেয়ে উজ্জ্বল অলংকার হলো তার বিরোধী দল। তারা বিরোধী দলকে বলে ‘রাজকীয় অনুগত বিরোধী দল’ (His Majesty’s Loyal Opposition)। এই অভিধাটি তাৎপর্যপূর্ণ; বিরোধিতা মানে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থেকেই সরকারের নীতির গঠনমূলক সমালোচনা। সেখানে রয়েছে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ বা শ্যাডো কেবিনেট, যেখানে বিরোধী দলের প্রতিটি সদস্য সরকারের এক-একজন মন্ত্রীর প্রতিপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিকল্প নীতির খসড়া প্রস্তুত রাখেন। প্রধানমন্ত্রীকে প্রতি সপ্তাহে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে’ বিরোধী দলের তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে হয়। এই জবাবদিহিতাই ব্রিটিশ গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতারা ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভিন্ন পথ বেছে নেন। মন্তেস্কুর ‘ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ’ তত্ত্বকে তারা সংবিধানের মেরুদণ্ড করেন। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ—তিনটি অঙ্গকে পৃথক রেখে তারা ‘পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের’ এক অভিনব ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষ—সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদÑপ্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে সংযত রাখে। প্রেসিডেন্ট যত ক্ষমতাধরই হোন, বাজেট পাস থেকে যুদ্ধ ঘোষণা পর্যন্ত তাকে কংগ্রেসের সম্মতি নিতে হয়। মার্কিন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এই যে, সেখানে প্রেসিডেন্টের নিজ দলই মাঝেমধ্যে তার নীতির বিরোধিতা করে; দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বিবেক ও নির্বাচনি এলাকার স্বার্থ সেখানে অগ্রগণ্য। এ দুই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত শিক্ষা এক ও অভিন্ন—ক্ষমতা যেখানে নিরঙ্কুশ, সেখানে স্বৈরাচার অনিবার্য। লর্ড অ্যাক্টনের সেই অমোঘ উক্তি স্মরণীয়—‘ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কলুষিত করে নিরঙ্কুশভাবে’ ।

আমরা যেহেতু ২০০ বছর ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিলাম, উত্তরাধিকার সূত্রে সংসদীয় শাসনব্যবস্থাই আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলাদেশ ওয়েস্টমিনস্টার আদলে সংসদীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করে। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে, প্রতিষ্ঠানটি আমরা আমদানি করলেও তার আত্মা আমরা আত্মস্থ করতে পারিনি। সংসদীয় গণতন্ত্রের খোলস আমাদের ছিল, কিন্তু মজ্জা ছিল অনুপস্থিত। বিশেষত বিগত দেড় দশকের আওয়ামী শাসনামলে জাতীয় সংসদ পরিণত হয়েছিল এক নিষ্প্রাণ, নিরর্থক প্রদর্শনীর মঞ্চে। সংবিধানের প্রথম পঙ্‌ক্তিতে লেখা ছিল ‘জনগণই সকল ক্ষমতার মালিক’, অথচ বাস্তবে ক্ষমতাই হয়ে উঠেছিল সব রাজনীতির উৎস। ব্যাজহট যাকে বলেছিলেন সরকারের কার্যকর অংশ, সেই সংসদকে পরিণত করা হয়েছিল আলংকারিক শোভায়।

আওয়ামী আমলের সংসদীয় ইতিহাস প্রকৃত অর্থে নামমাত্র গণতন্ত্রের ইতিহাস। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তামাশার নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদে বিরোধী দল বলে কিছু ছিল না। ২০১৪ সালে দেড় শতাধিক আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি; ভোটের আগেই ফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। জাতীয় পার্টিকে একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী আসনে বসিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এক নজিরবিহীন কৌতুক। জনগণ তাকে যথার্থই নাম দিয়েছিল ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’। যে বিরোধী দল সরকারের অনুগ্রহে টিকে থাকে, যে বিরোধিতা সরকারের ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়, তা বিরোধিতা নয়—তা প্রহসন। সেই সংসদ হয়ে উঠেছিল একজন ব্যক্তির প্রশস্তি-গাথার আসর, ‘জি হুজুর’ আর করতালির সমবেত মহড়া। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘রাবার-স্ট্যাম্প সংসদ’, যার একমাত্র কাজ নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তে বিনা প্রশ্নে সিলমোহর বসানো। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ—তিনটি অঙ্গ যখন একটি কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন যাকে বলা হয় স্বৈরতন্ত্র, তারই প্রতিষ্ঠা ঘটেছিল ‘গণতন্ত্রের’ মোড়কে। এ ছিল কাঠামোগত প্রতারণা—সংসদীয় গণতন্ত্রের মোড়কে এক আইনি ও বেআইনি বাকশাল। জনগণ সে সংসদের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ হারিয়েছিল, কারণ যে প্রতিষ্ঠান জনগণের কণ্ঠস্বর বহন করে না, তার প্রতি জনগণের আস্থা থাকবে কেন?

এই দীর্ঘ অন্ধকারের পর চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতিকে এক নতুন প্রভাত উপহার দিয়েছে। ফ্যাসিবাদের পতনের পর যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, তাতে প্রকৃত অর্থে একটি সক্রিয়, সোচ্চার বিরোধী দল রয়েছে। সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনে আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা, বিরোধী দলের হট্টগোল, ওয়াকআউট, স্পিকারের উদ্বেগ—তা যতই অপ্রীতিকর মনে হোক, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর ইতিবাচক ইঙ্গিত। যেখানে প্রশ্ন আছে, প্রতিবাদ আছে, বিরোধিতা আছেÑসেখানেই গণতন্ত্রের প্রাণস্পন্দন। গত দেড় দশকে যে সংসদে টুঁ শব্দটি করার সাহস কারো ছিল না, সেই সংসদে আজ তরুণ সদস্যরা পরিসংখ্যান হাতে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে সরকারকে কোণঠাসা করছেন। এটাই স্বাভাবিক গণতন্ত্রের চিত্র। ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সেও তীব্র বাদানুবাদ হয়, টেবিল চাপড়ানো হয়, অর্ডার! অর্ডার! ধ্বনিতে স্পিকারকে শৃঙ্খলা ফেরাতে হয়। বিতর্ক গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, শক্তি।

তবে বিতর্ক আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ফারাক রয়েছে। যুক্তির স্থান যখন কণ্ঠের উচ্চগ্রাম দখল করে, পরস্পরকে বলার সুযোগ না দেওয়ার প্রবণতা যখন প্রবল হয়, তখন সংসদ প্রাণবন্ত না হয়ে হয়ে ওঠে অকার্যকর। এখানেই সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়ের সংযম কাম্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একজন প্রবীণ ও বিচক্ষণ পার্লামেন্টারিয়ান; তরুণ সদস্যদের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বদলে পিতৃসুলভ সহনশীলতাই তার কাছে প্রত্যাশিত। তিনি যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তাতে তার বিজ্ঞতাই প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলকেও মনে রাখতে হবে, ওয়াকআউট ও প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অস্ত্র বটে, কিন্তু তা সংযমের সঙ্গে প্রয়োগ করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক। স্পিকার দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন।

দেশ এখন এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, আইনশৃঙ্খলার অস্থিরতা—এসবের মধ্যেও জনগণ ধৈর্য ধরে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের অপেক্ষায় আছে। এই মুহূর্তে জাতির সামনে যে সুযোগ এসেছে, তা ঐতিহাসিক। বিগত অর্ধশতাব্দীতে বাংলাদেশ যে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাদ পায়নি, আজ তা প্রতিষ্ঠার এক বিরল সন্ধিক্ষণ উপস্থিত। এই সুযোগকে যদি আমরা কলহ ও অসহিষ্ণুতায় নষ্ট করি, তবে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। সংসদীয় গণতন্ত্র কোনো একদিনের অর্জন নয়; ব্রিটেন সাতশ বছরে যা গড়েছে, তা ধৈর্য, সহনশীলতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধার ফসল। আমাদের সংসদ যেন যুক্তি-তর্কের প্রাণবন্ত কেন্দ্র হয়, প্রশ্ন ও জবাবদিহিতার নির্ভীক মঞ্চ হয়, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার। সরকারি দল ও বিরোধী দল যদি পরস্পরকে শত্রু নয়, বরং একই গণতান্ত্রিক যাত্রার সহযাত্রী মনে করে, তবেই এই সংসদ হয়ে উঠবে প্রকৃত অর্থে জনগণের সংসদ। সেটিই হবে জুলাই শহীদদের রক্তের প্রতি যথার্থ সম্মান।