আন্তর্জাতিক বাজারে দর বৃদ্ধি ও প্রতিবেশী দেশে পাচারের কারণ দেখিয়ে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে উৎপাদন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। আবার এই দাম বৃদ্ধির সুফল সরকারের ঘরেও উঠছে। কারণ, জ্বালানি তেলের আমদানি ব্যয় যত বেশি হবে, তার ওপর কর ও ভ্যাটও তত বেশি হবে।
বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা জানান, দাম বাড়ানোর আগে প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে সরকার গড়ে ৩২ টাকার মতো কর পায়, এখন তা ৩৭ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
বিপিসির উপ-ব্যবস্থাপক (হিসাব) এম শরীফুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, পরিশোধিত ডিজেলের ক্ষেত্রে করভার এখন ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে কাস্টমস ডিউটি ৬ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর এবং অগ্রিম কর ২ শতাংশ করে।
অকটেন ও পেট্রোলে করহার কিছুটা কম হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করা ফার্সেন অয়েলে তা ৩৭ শতাংশের কাছাকাছি। বিপুল পরিমাণ কর নিয়ে সরকার লোকসানের যে হিসাব দেয়, সেটি নিয়েও বহু বছর ধরে বিতর্ক আছে।
তবে সরকার কখনো প্রকৃত আমদানি ব্যয়, পরিচালন খরচ, কর ও লোকসানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একধিক কর্মকর্তার কাছে টাইমস এসব বিষয়ে তথ্য জানতে চেয়েছে, তবে সবাই বলেছেন, এসব বিষয়ে কথা বলবেন না তারা।
অর্থনীতির গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মাহমিদা খাতুন টাইমসকে বলেন, ‘বিপিসির প্রকৃত আমদানি ব্যয়, পরিচালন খরচ, কর ও লোকসানের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময়ে সাময়িকভাবে কর কমিয়ে এবং পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তা পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে ভোক্তা ও সরকারের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য থাকবে।’
আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের ব্যারেল এখন ১০০ ডলারের আশেপাশে। প্রতি ব্যারেলে থাকে ১৫৯ লিটার তেল। আর সরকার গত ১৮ এপ্রিলের পর দ্বিতীয়বারের মতো তেলের দাম বাড়িয়েছে, দেশের বাজারে ডিজেলের দাম এখন লিটারে ১৩৫ টাকা, পেট্রোলের দাম ১৬০ এবং অকটেন ১৬৫ টাকা।
বাংলাদেশ বছরে ১৫ লাখ টনের মতো অশোধিত তেল এবং ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানি করে, যেটির দাম অশোধিত তেলের তুলনায় বেশি।
তবে ইদানীং মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাহাজ ভাড়া। বিপিসির কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম জানান, এখন ব্যারেল প্রতি জাহাজ ভাড়া ২২ ডলার পর্যন্ত উঠেছে, যা গত বছর অর্ধেক ছিল।
চট্টগ্রাম কাস্টমসের একটি হিসাবে দেখা যায়, চলতি বছর সেপ্টেম্বরে যে ডিজেল আমদানি হয়েছে, তার দাম পড়েছে ১৫৪ টাকা, আগস্টের দর ছিল ১৫০ টাকার মতো।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমদানি ব্যয় ছিল ৮৭ টাকা। গত এপ্রিল, যে মাসে ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে দাম ১১৫ টাকা করা হয়, সে মাসে আমদানি ব্যয় ছিল ১৩২ টাকা।
আরেক হিসাবে দেখা যায়, যখন দাম ৮৭ টাকা পড়েছিল, সে সময় প্রতি লিটারের বিপরীতে সরকার কর পেয়েছে ১৯ টাকার বেশি এখন তা ৩৪ টাকা ছাড়িয়েছে।
দাম বাড়ানোর বিজ্ঞপ্তিতে সরকার দাবি করছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। দাম বাড়ানোর আগে ডিজেলে লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসানের কথাও বলা হয়।
দৈনিক এই লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। এ হারে এক বছরে শুধু ডিজেলেই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হবে। লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে বলে সরকার মনে করছে।
তবে এতে কর, ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর এবং অগ্রিম কর আদায়ের কোনো তথ্য পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
তবে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের পরিসংখ্যান বিবেচনায় সরকারের এই খাত থেকে আয় বিপুল আয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল ও পেট্রিলিয়াম পণ্যের আমদানি ব্যয় ছির ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। পরের অর্থবছরে তা ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
যদি ডিজেলের হারেও ২৫ শতাংশ কর ধরা হয়, তাহলে ২-২৪-২৫ অর্থবছরে ১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন এবং পরের বছরে ২ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ কর আদায় হয়েছে।
অর্থনীতির গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ, সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘জ্বালানি তেলের ওপর উচ্চ কর সরকারের রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও ফার্নেস অয়েলে করের হার কিছুটা কমানো হলে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির চাপ আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। এতে পরিবহন ব্যয়, কৃষি উৎপাদন খরচ এবং নিত্যপণ্যের দামের ওপরও চাপ কিছুটা কমতে পারত।’
২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশও দাম বাড়ায়। পরে ধীরে ধীরে দাম কমে আসে। এতে ২০২২ সাল পর্যন্ত বিপিসি ৫৩ হাজার কোটি টাকার মতো মুনাফা করে। এই মুনাফার একটি অংশ সরকারকে লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়া হয়।
তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর আবার দুই বছর তেলের দাম লাফ দেয়। সে সময় বিপিসির সেই মুনাফার অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করা হয় বাড়তি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ে। কিন্তু এখন বাড়তি দরের সঙ্গে সমন্বয়ের মতো অর্থ বিপিসির হাতে নেই।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গ্যাস আমদানিতে সরকারকে বড় ধরনের অর্থ খরচ করতে হচ্ছে, কিন্তু দেশের ভেতরে দাম বাড়াতে পারছে না। এই অবস্থায় তেলে ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া কঠিন, যে কারণে দাম বাড়ানো হয়েছে।
তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জানানোর পর মানুষের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, সেটি এরই মধ্যে সত্য প্রমাণ হচ্ছে। বাস ভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে বাড়তি আদায় করা হচ্ছে ৫০ পয়সাও। ট্রাক ভাড়া দূরত্ব ভেদে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকাও বেড়েছে, যার প্রভাব পড়বে পণ্যমূল্যেও।
অতীতেও দেখা গেছে তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার যে হারে পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর অনুমোদন দেয়, বাড়ে তার চেয়ে অনেক বেশি। এতে মানুষের পরিবহন ব্যয়ের পাশাপাশি পণ্যমূল্যও বেড়ে যায়।
সবকিছু গোপন কেন
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ২০০৩ অনুসারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়েও সরকার কমিশনে প্রস্তাব দেওয়ার কথা। কিন্তু সরকার এটা কখনও করেনি। এর কারণ হলো, সরকার বলেছে, প্রবিধানমালা হওয়ার আগ পর্যন্ত জ্বালানির মূল্য সরকার নির্ধারণ করতে পারবে। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে এলপিজির দাম এখন বিইআরসিতে শুনানি করে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে প্রবিধানমালা কোনো সরকারই না করে নিজের হাতে রেখেছে।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম টাইমসকে বলেছেন, ‘এখানে সরকার একটা পক্ষ, সে পণ্য বিক্রি করবে। তার যদি লোকসান হয়, সেটা তারা জনগণকে বিস্তারিত জানাবে। কিন্তু যে কিনবে অর্থাৎ ভোক্তাকে তো জানানোর সুযোগ দিতে হবে যে কোনো মূল্য যৌক্তিক কি না। মানুষকে তো যাচাইয়ের সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু সরকার কোনো তথ্যই প্রকাশ করে না, সবগুলো তথ্যই গোপন করে রেখেছে।’
প্রতিবেশী দেশে দাম কম এবং সেখানে পাচার নিয়ে সরকার যে বক্তব্য দেয়, সেটাও খণ্ডন করেছেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেছেন, ‘একবার ভারত যখন নেপালে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তখন নেপালের মানুষকে কাঁধে করে কন্টেইনার নিয়ে সীমান্ত পারি দিতে দেখা গেছে। সেটা কি এখানে সম্ভব?’
সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিজিবির তাহলে কী কাজ এই প্রশ্নও তোলেন তিনি। বলেন, ‘পাচারের প্রসঙ্গ কেবল দাম বাড়ানোর সময় উঠে। অন্য সময় এ নিয়ে কথা বলে না।’
আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন
সরকার দেশে জ্বালানি তেলের দাম এমন এক সময়ে বাড়াল, যখন বিশ্ববাজার কিছুটা ঠান্ডা হচ্ছে। সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে এবং দাম এখন গত ১১ দিনের মধ্যে সর্বনিম্ন।
জ্বালানি তেল সাধারণত দুভাবে বিক্রি হয়। একটি হলো স্পট মার্কেটে, যে বাজার থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তেল কেনা যায়, ফলে দাম কিছুটা বেশি পড়ে। আরেকটি হলো আগাম কেনাবেচার বাজার, যাকে বলে ফিউচার।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রডের নভেম্বর মাসের ফিউচার দর ২ দশমিক ১১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৬৮ ডলারে নেমেছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর তেলের দাম ১০৯ ডলারে উঠেছিল।
অক্টোবর মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের ফিউচার দর ২ দশমিক ১ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৯ ডলারে নেমেছে।
জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষকেরা ১৮ সেপ্টেম্বর এক নোটে বলেছেন, সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দিয়ে তেল পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেশ ভালো পরিমাণে তেল সরবরাহ হচ্ছে। গত ১০ দিনে দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে, তবে ২০২৫ সালের গড়ের তুলনায় তা দৈনিক ৬১ লাখ ব্যারেল কম।