Image description

আলফাজ আনাম

নির্বাচনের পর সরকারের মেয়াদ ছয় মাস পার হয়ে গেছে। এই ছয় মাসে সরকারের সামনে প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যা এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। দেড় দশকের আওয়ামী লুটেরা সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে লুটপাট হয়েছে, তার পুরো দায় এসে পড়েছে এই সরকারের ওপর। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে সংকট তৈরি হবে, তা বহু আগে থেকেই বিশেষজ্ঞরা বলে এসেছেন। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে। সহসাই এ সমস্যার যে সমাধান হবে না, তা সরকারের মন্ত্রীরা জানিয়ে দিয়েছেন।

সরকারের প্রচারযন্ত্র বিদ্যুৎ সমস্যার আসল কারণগুলো মনে হচ্ছে সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছে না। এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা কী, তাও মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়। ফলে বিদ্যুৎ খাতের সমস্যার কারণে সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হচ্ছে। কারণ বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে দেশের অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসবে। অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে কিংবা উৎপাদন কমে যাবে। যার প্রভাব পড়বে রপ্তানি আয়ে। পণ্যমূল্য বেড়ে যাবে অস্বাভাবিকভাবে। বাজারে ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

জ্বালানি সমস্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত সারের উৎপাদন ও আমদানি। সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সারের মজুত আছে। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি হয়েছে। সারের গোডাউন লুটের ঘটনাও ঘটেছে। সার নিয়ে সারা দেশে এক ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে—এমন খবর সংবাদপত্রে এসেছে। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী শ্রেণি জড়িত রয়েছে।

একটা বিষয় স্পষ্ট—আমলাতন্ত্র থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণ, প্রতিটি ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদী আমলের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে পারছে না সরকার। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে গিয়ে আওয়ামী সিন্ডিকেট এখন নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছে। প্রশাসনের ভেতরে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে হাসিনা আমলের সুবিধাভোগীরা বসে আছেন। শুধু তাই নয়, একে অন্যকে গুপ্ত ট্যাগ দিয়ে কোণঠাসা করছে। এই পুরোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নামে নতুন কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠী ভিড়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও সার সংকট নিয়ে অতীতে বিএনপি সরকার নানা ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট ও ঢাকার শনির আখড়ায় বড় ধরনের বিক্ষোভ মোকাবিলা করতে হয়েছিল। আবার গাইবান্ধায় সারের দাবিতে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সে সময় সরকারে এসব ঘটনা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। আওয়ামী লীগ এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু প্রচারণা চালায়নি, সারা দেশে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। সে সময় এ ধরনের ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ ছিল সিন্ডিকেটের কারসাজি ও স্বচ্ছতার অভাব।

বর্তমান সরকার আবার একই ধরনের সংকটের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ কিংবা সারের সংকটকে কেন্দ্র করে জনঅসন্তোষের সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। এজন্য দরকার পূর্ণ সচেতনতা এবং সংকটের কারণ জনগণকে স্পষ্টভাবে জানানো। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া।

ইতোমধ্যে আওয়ামী প্রচারবিদরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে এই বিষয়গুলো সামনে এনে নানামুখী প্রচারণা শুরু করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে যেকোনো অসন্তোষে পতিত সরকারের অনুসারীরা যে সম্পৃক্ত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি পুলিশ কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে এমন আশঙ্কার কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও জানিয়েছেন।

বিদ্যুৎ সংকটের সঙ্গে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। পরিসংখ্যান হাতে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে যা-ই বলুন না কেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যাচ্ছে, চুরি, ছিনতাই ও খুনের ঘটনা বেড়েই চলছে। খোদ সংসদ ভবনের সামনে দিনদুপুরে ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাননি একজন নারী শিক্ষিকা। তার হাত থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে গেলে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে তিনি মারা গেছেন। চুরি, ছিনতাই ও রাহাজানির মতো অপরাধ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যেসব অপরাধের বড় অংশ পুলিশের রেকর্ডে আসে না।

আমার দেশ-এর খবরে বলা হয়েছে, সাত মাসে ২ হাজার ৭৬ জন মানুষ খুন হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে ৭৫ জন মারা গেছে, যার ৯০ শতাংশই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। অর্থাৎ, স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে নানা প্রভাববলয় তৈরি হয়েছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। সামনের স্থানীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে এ ধরনের সংঘাত আরো বেড়ে যেতে পারে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোন্দল বাড়ছে, যা দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রমাণ।

দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সঙ্গে মাদকের সম্পৃক্ততা আছে। চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের বড় একটি অংশ মাদকসেবী কিংবা মাদক ব্যবসায়ী। রংপুরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি পরিবারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রয়েছে মাদকের সম্পৃক্ততা। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তির যোগসাজশের কারণে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সরকার যদি এখনই অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তা আরো ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। সরকারের উচিত সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা। শুধু লোকদেখানো অভিযান নয়, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের মুখোমুখি করতে না পারলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব হবে না।

এ কথা সত্য, সরকারের ৬ মাসে পুলিশের নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ড, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ প্রশাসন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। গণহত্যার সঙ্গে জড়িত উচ্চপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ পালিয়ে গেছে। আবার কেউ কেউ বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে পুলিশের যে পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল, এখনো তা শেষ করা যায়নি।

আসলে পুলিশ প্রশাসনকে নতুন করে সাজাতে হবে। পুলিশ যাতে অতীতের মতো দলীয় বাহিনীতে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা না গেলে দেশে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিতে না পারলে পুরোনো ব্যবস্থাই ফিরে আসবে। মুখে সরকার যতই মানবাধিকার ও আইনের শাসনের কথা বলুক না কেন, পুলিশের সঙ্গে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা অপরাধীদের যোগসাজশ তৈরি হবে। ফ্যাসিবাদী আমলে গুম, খুন ও নিপীড়নের প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের সংযোগ। রাজনৈতিক নেতা থেকে অলিগার্ক ব্যবসায়ী—সবাই পুলিশকে নিজের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। একপর্যায়ে পুলিশ হয়ে উঠেছে শক্তির উৎস, যা একটি দানবীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। পুলিশের আমূল সংস্কার করতে না পারলে ধীরে ধীরে একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী গণতান্ত্রিক শাসনের এ সময়টা অনেকটা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সময় হিসেবে দেখা যেতে পারে। এ সময় ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে যে ঐক্য দরকার ছিল, তা যেন শিথিল হয়ে পড়ছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। এই সুযোগে বিদেশি মদতপুষ্ট পতিত শক্তি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

একমাত্র পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে মতভেদ তীব্র হয়ে উঠছে। সংসদ ও সংসদের বাইরে আমরা এর প্রতিফলন দেখছি। বিরোধী দলের কাজ হচ্ছে সরকারের জবাবদিহিতা চাওয়া। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলকে যদি শুধুই প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবে, তাহলে জবাবদিহিতার গণতান্ত্রিক রাজনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে।

অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, মন্ত্রিসভার একজন জোটসঙ্গী প্রধান বিরোধী দলের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করেছেন। প্রশ্ন হলো, তাহলে ক্ষমতাসীন জোটের মধ্যে কেউ কেউ কি বিরোধী দলবিহীন রাজনীতির স্বপ্ন দেখছে? নাকি নতুন কাউকে বিরোধী দল বানানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে? এ ধরনের বক্তব্য সুস্থ ধারার রাজনীতির জন্য ভালো কোনো লক্ষণ নয়। মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের এমন বক্তব্যের দায় শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ওপর বর্তাবে।

রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ দেড় দশক পর ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছে। মানুষ জানত, সরকারকে পাহাড়সম প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে একপর্যায়ে মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। সে ধরনের পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য সংকটের কারণগুলো মানুষকে যেমন জানাতে হবে, তেমনি সংকট মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে আস্থায় নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে। ক্ষমতাসীন দল যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার রাজনীতির দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠে, তাহলে পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তি তার সুযোগ নেবে।

 

লেখক: সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ