ডেল এইচ খান
বাংলাদেশ যদি চীনা জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনে, তাহলে বিষয়টি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সক্ষমতায় একটি প্রজন্মগত পরিবর্তন হতে পারে।
কারন,
আধুনিক আকাশযুদ্ধ শুধু বিমান বনাম বিমান নয়; রাডার, মিসাইল, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ডেটালিংক এবং পুরো কিল-চেইনই যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করে।
বর্তমানে আমাদের যুদ্ধবিমান বহরের বড় অংশ এফ-৭ এবং পুরনো মিগ-২৯ নির্ভর। জে-১০সিই হলো ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান, যার রয়েছে এইএসএ রাডার, আধুনিক ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, দূরপাল্লার বিভিআর মিসাইল ব্যবহারের সক্ষমতা, পিএল-১৫ই, পিএল-১০, উন্নত অ্যাভিওনিকস এবং স্থল ও সমুদ্র, দুই ধরনের লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে অপারেশনের ক্ষমতা।
২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষে পাকিস্তানের জে-১০সি ও পিএল-১৫ ব্যবহারের মাধ্যমে ভারতের রাফাল বিমান ফেলে দেবার ঘটনা এই বিমানকে আন্তর্জাতিকভাবে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
এবার আসি আসল জায়গায়,
জে-১০সিই এলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতায় কী পরিবর্তন হবে?
সহজ করে বলি,
এটা রাতারাতি আকাশযুদ্ধে বাংলাদেশকে ভারতের সমকক্ষ বানাবে না মোটেই, কিন্তু বাংলাদেশের আকাশটাকে আগে ভারত যেমন 'জিরো রিস্ক স্কাই' হিসেবে ট্রিট করত, সেইটা সম্ভব হবেনা।
কারন,
শুধু এই বিমান ২০টা যোগ করলে বাংলাদেশের সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতা আনুমানিক ২৫–৩৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
কিন্তু এর সঙ্গে যদি এডব্লিউঅ্যান্ডসি, আধুনিক গ্রাউন্ড রাডার, পিএল-১৫ই ও পিএল-১০ মিসাইল, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, নিরাপদ ডেটালিংক, শক্তিশালী বিমানঘাঁটি, প্রশিক্ষিত পাইলট এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রের মজুত তৈরি করা যায়, তাহলে সামগ্রিক প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধক্ষমতা প্রায় ৪০–৬০ শতাংশ এবং বিভিআর সক্ষমতা ৮০–১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
অর্থাৎ
বিভিআর সক্ষমতা প্রায় ১ দশমিক ৮ থেকে ২ দশমিক ৫ গুণ। আর আধুনিক মাল্টিরোল যুদ্ধক্ষমতার গুণগত উন্নতি ২ দশমিক ৫ থেকে ৪ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। ভারতের বিরুদ্ধে এর অর্থ আকাশে শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং ডিটারেন্স বাই ডিনায়াল।
অর্থাৎ,
কেউ যদি বাংলাদেশের আকাশে ঢোকে, তাকে অনেক দূর থেকেই শনাক্ত, ট্র্যাক এবং বিভিআর এনগেজমেন্টের ঝুঁকি নিতে হবে। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এই সুবিধা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
শান্তিকালেও এর প্রভাব থাকবে,
এর ফলে বাংলাদেশের আকাশসীমা পাহারা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া, বঙ্গোপসাগরে নজরদারি এবং বাংলাদেশের কৌশলগত দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে।
আর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নঃ জে-১০সিই কবে আসবে? আজ ২৫ আগস্ট ২০২৬-এ সরকার যে খসড়া চুক্তির কথা বলেছে, সেটাকে এখনও চূড়ান্ত ক্রয়চুক্তি বলা যাবে না। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০টি জে-১০সিই কেনার লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের মধ্যে। যদি ২০২৬ সালে চুক্তি চূড়ান্ত হয়, তাহলে ২০২৭ সালে বাংলাদেশি পাইলটদের প্রশিক্ষণ শুরু হতে পারে এবং প্রথম বিমান ২০২৭ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৮ সালের শুরুতে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। পুরো বহরকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে অপারেশনাল করতে সময় লাগতে পারে ২০২৯–৩০ পর্যন্ত।
অর্থাৎ
আগামীকালই আকাশে জে-১০সিই দেখা যাবে না। কিন্তু যদি বিমান কেনার সঙ্গে পুরো যুদ্ধব্যবস্থাটাও তৈরি করা হয়, তাহলে ২০২৮ থেকে ২০৩০-এর মধ্যে বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষার ভাষাই বদলে যেতে পারে।
তখন মক্কা প্যাক্টে জয়েন করার মত স্ট্রং কার্ড বাংলাদেশের হাতে থাকবে আর ওরাও দাওয়াত দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।
আশাকরি, এবার আমাদের পিএম এর ভারত সফর নিয়ে লেলিয়ে দেয়া ভিনা সিক্রিদের মত বাতিল ডিপ্লোম্যাটদের মাতমের কারন কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন।
একটা কথা ইয়াদ রাখবেন,
২০টা বিমান কিনলেই ২০টা সক্ষমতা পাওয়া যায় না। যুদ্ধবিমান আসলেই শক্তিশালী হয় তখনই, যখন তার সঙ্গে থাকে মিসাইল, রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, ডেটালিংক, প্রশিক্ষিত পাইলট এবং একটি সমন্বিত যুদ্ধব্যবস্থা।
জে-১০সিই হয়ত বাংলাদেশকে আকাশের মালিক বানাবে না ঠিকই।
কিন্তু এর উপস্থিতি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের আকাশকে আর আনকনটেস্টেড ও থাকতে দেবে না।
এটাই ডিটারেন্স।