Image description

মো. এমদাদুল হক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গত ১৭ আগস্ট আবারও সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। এর আগে জুলাই ও আগস্টজুড়ে সৌদি বিনিয়োগ, বন্দর-লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ নিয়ে ঢাকার সঙ্গে রিয়াদের ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হয়েছে। এসব ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—তারেক রহমানের কূটনীতি কি তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের মতোই মধ্যপ্রাচ্যমুখী হয়ে উঠছে? প্রশ্নটির সরল উত্তর হলো: আংশিকভাবে হ্যাঁ, কিন্তু ‘জিয়ার মতোই’ বললে ইতিহাস ও বর্তমান—দুটোকেই অতিরিক্ত সরলীকরণ করা হবে। কারণ জিয়াউর রহমানের মধ্যপ্রাচ্যনীতি কোনো একমুখী ভৌগোলিক ঝোঁক ছিল না; সেটি ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর বাড়িয়ে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন অর্জনের একটি বৃহত্তর বহুমুখীকরণ কৌশলের অংশ। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও তাঁর সরকারের ছয় মাসে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা মধ্যপ্রাচ্যকে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভে পরিণত করছে—কিন্তু পুরো পররাষ্ট্রনীতির একমাত্র ভরকেন্দ্র হিসেবে নয়।

 

জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ছিল স্নায়ুযুদ্ধের দ্বিমেরু ভূরাজনৈতিক কাঠামোয় বিভক্ত। সদ্য স্বাধীন ও আয়তনে ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে একদিকে উন্নয়ন সহায়তা, কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও বাজার দরকার ছিল। অন্যদিকে ‘দিল্লি-মস্কোকেন্দ্রিক’ বলে বিবেচিত একটি সীমিত কূটনৈতিক পরিসর থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন ছিল। জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে তাঁর নীতিকে বাস্তববাদী, বহুমাত্রিক ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ছিল সেই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ; একই সময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পরবর্তী সময়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করা আঞ্চলিক সহযোগিতার দিকেও সক্রিয় ছিলেন। অর্থাৎ তাঁর কূটনীতির প্রকৃত বৈশিষ্ট্য ‘মিডল ইস্ট ফার্স্ট নয়’ নয়, বরং ‘অপশনস ফার্স্ট’—একটি ছোট রাষ্ট্রের জন্য যত বেশি কূটনৈতিক বিকল্প, তত বেশি দর-কষাকষির ক্ষমতা।

 

তবে মধ্যপ্রাচ্য জিয়ার কাছে যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল, তার বাস্তব কারণও ছিল। ১৯৭৭ সালে তাঁর সৌদি সফর, তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত সম্প্রসারণ, ওআইসিতে বাংলাদেশের সক্রিয়তা, আল-কুদস কমিটিতে অংশগ্রহণ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দৃশ্যমান অবস্থান—সব মিলিয়ে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ককে তিনি রাষ্ট্রীয় কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে রূপ দেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ ও প্রবাসী আয়ের ভিত্তি তৈরিও এই সময়ের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার। এখানে ধর্মীয় সংহতি ছিল একটি উপাদান; কিন্তু উন্নয়ন অর্থায়ন, শ্রমবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং কৌশলগত ভারসাম্য ছিল অন্তত সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই জিয়ার মধ্যপ্রাচ্যমুখিতা বুঝতে হলে ইসলামি পরিচয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তববাদ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নটিও দেখতে হয়।

 

বেগম খালেদা জিয়ার সরকার সেই সম্পর্ককে নতুন আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বহন করে। ১৯৯১–৯৬ এবং ২০০১–০৬—এই দুই পূর্ণ মেয়াদে বিশ্বব্যবস্থা ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র-প্রভাবিত একমেরু ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর; একই সঙ্গে বিশ্বায়ন, শ্রম অভিবাসন ও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। খালেদা জিয়ার সময় সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা ধর্মীয় যোগাযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০০৫ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত OIC-এর বিশেষ শীর্ষ সম্মেলনে তিনি মুসলিম দেশগুলোর সংহতি জোরদারের কথা বলেন। ২০০৬ সালের সৌদি সফরে বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে আলোচনায় সৌদি বিনিয়োগ, ঋণ, দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ এবং পেশাজীবীদের জন্য সুযোগ সম্প্রসারণ গুরুত্ব পায়। একই সফরে ওআইসি ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল।

 

কিন্তু খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতিকেও শুধু মধ্যপ্রাচ্যমুখী বলা যাবে না। তাঁর সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছে, পশ্চিমা রাষ্ট্র ও দাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক রেখেছে, লুক ইস্ট পলিসির অপরিহার্য অংশ হিসেবে জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ফলে জিয়া থেকে খালেদা—ধারাবাহিকতাটি আসলে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রতি আনুগত্যের ধারাবাহিকতা নয়; বরং ভারতের ভৌগোলিক অপরিহার্যতা, চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব, পশ্চিমের বাজার ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রম-অর্থনীতি—এই চারটি ক্ষেত্রকে পাশাপাশি ধরে রাখার প্রয়াস। মধ্যপ্রাচ্য সেই সমীকরণে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এটি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, জ্বালানি, ধর্মীয়-সামাজিক সংযোগ এবং উন্নয়ন অর্থের উৎস।

 

তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সবচেয়ে স্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে। সেখানে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার কথা বলা হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো—গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি দেশগুলোর উদ্বৃত্ত পুঁজির সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও মানবসম্পদকে যুক্ত করে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ার পরিকল্পনা। অগ্রাধিকারের তালিকায় খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামরিক শিল্প ও প্রশিক্ষণও রাখা হয়েছে। এটি আগের সময়কালের ‘শ্রমিক পাঠানো ও সাহায্য আনা’র সম্পর্কের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত একটি ভূ-অর্থনৈতিক কল্পনা।

 

ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ দেখলে ইশতেহারের সেই ভাষা কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হয়ে থাকেনি। জুলাইয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সৌদি প্রতিনিধিদল ঢাকা এসে বন্দর, রেল ও অন্যান্য অবকাঠামোয় এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে। রেড সি গেটওয়ে টারমিনাল ইন্টারন্যাশনাল বে টারমিনালে ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং বাংলাদেশের বন্দর খাতে মোট বিনিয়োগ এক বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার আগ্রহ জানায়। এর কয়েক সপ্তাহ পর ৪ আগস্ট সৌদি ভাইস মিনিস্টার ফর ফরেন অ্যাফেয়ার্সের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান সৌদি বিনিয়োগ বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ খাতে আহ্বান করেন। আলোচনায় প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, সামুদ্রিক খাদ্য, কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিও আসে। প্রধানমন্ত্রী তখন বাংলাদেশ–সৌদি সম্পর্ককে ‘কৌশলগত, বহুমাত্রিক ও দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে’ উন্নীত করার কথা বলেন।

 

এই ধারার সর্বশেষ প্রতীক হলো ১৭ আগস্ট মোহাম্মদ বিন সালমানের আনুষ্ঠানিক সফর-আমন্ত্রণ। কূটনীতিতে একটি আমন্ত্রণ নিজে কোনো নীতিগত পরিবর্তনের প্রমাণ নয়; কিন্তু মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধারাবাহিক যোগাযোগ, বিশেষ দূত পাঠানো, বিনিয়োগ আলোচনা, সৌদি পরিবহন ও লজিস্টিকস প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফর এবং সৌরশক্তি ও প্রযুক্তিতে অংশীদারত্বের প্রস্তাব—এসব একসঙ্গে দেখলে সৌদি আরবকে বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, এমন সিদ্ধান্ত যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত।

 

কাতারের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সময় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত দোহায় গিয়ে আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির কাছে সংহতির বার্তা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের প্রস্তাব পৌঁছে দেন। মে মাসে ঢাকায় কাতার-বাংলাদেশ জয়েন্ট কমিটি অন লেবার-এর সপ্তম বৈঠকে শ্রম সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের কাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয় এবং কাতারের শ্রমমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জুলাইয়ে তারেক রহমান আমিরের কাছে পাঠানো চিঠিতে কাতারি বিনিয়োগ আহ্বান করেন। অর্থাৎ কাতারের সঙ্গে সম্পর্কেও শ্রমবাজারের পুরোনো স্তম্ভের পাশে এখন বিনিয়োগ ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব যুক্ত হচ্ছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের যোগাযোগ আবার একটি ভিন্ন মাত্রা দেখিয়েছে—নিরাপত্তা ও প্রবাসী সুরক্ষা। ২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শুরুতে তারেক রহমান সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে ফোনে কথা বলে আমিরাত ও জিসিস দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশের সংহতি এবং দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত সৌদি আরব, কাতার ও আমিরাতে বার্তা নিয়ে যান। একই সময়ে বাংলাদেশ ওআইসি রাষ্ট্রদূতদের কাছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মুসলিম বিশ্বের শক্তিশালী সহায়তা চেয়েছে এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বাংলাদেশের প্রচলিত অবস্থানও বজায় রেখেছে।

 

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার। জিয়ার সময় মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের কাছে প্রধানত ছিল স্বীকৃতি, উন্নয়ন সহায়তা, শ্রমবাজার এবং মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক সমর্থনের ক্ষেত্র। খালেদা জিয়ার সময় শ্রম, রেমিট্যান্স, ওআইসি ও দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়। তারেক রহমানের সময় জিসিসি-কে দেখা হচ্ছে একবিংশ শতকের নতুন পুঁজি, বন্দর-লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উৎস হিসেবে। অর্থাৎ একই অঞ্চল—কিন্তু সম্পর্কের অর্থ ও গতিধারা বদলে গেছে।

 

এর পেছনে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামোও কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ দেশভিত্তিক রেমিট্যান্স তথ্য অনুযায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–মে সময়ে সৌদি আরব ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স উৎস; সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েক ও কাতার শীর্ষ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে। ২০২৫ সালে বিএমইটি-এর তথ্য অনুযায়ী শুধু সৌদি আরবেই ৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী চাকরি নিয়ে গেছেন; কাতার ও কুয়েতও ছিল বড় গন্তব্য। ফলে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জন্য একটি ‘ঐচ্ছিক’ কূটনৈতিক অঞ্চল নয়। সেখানে যুদ্ধ, ভিসানীতি, শ্রমবাজার বা অর্থনৈতিক মন্দা ঘটলে তার প্রভাব বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা, গ্রামীণ আয়, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় এসে পড়ে।

 

২০২৬ সালের যুদ্ধ এই নির্ভরতার আরেকটি মাত্রা—জ্বালানি নিরাপত্তা—খুব নির্মমভাবে সামনে এনেছে। হরমুজ প্রণালীর অস্থিতিশীলতার কারণে কাতার এনার্জি বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ২০২৬ সালের এলএনজি সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নামিয়েছে বলে জুলাইয়ে রয়টার্স জানিয়েছে। বাংলাদেশকে তখন ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে কার্গো সংগ্রহ করতে হয়েছে। এই একটি ঘটনাই দেখায়, মধ্যপ্রাচ্যনীতি এখন শুধু ‘মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব’ বা ‘প্রবাসী কল্যাণ’ নয়; এটি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।

 

তবে এই সবকিছু সত্ত্বেও তারেক রহমানের কূটনীতিকে এককভাবে মধ্যপ্রাচ্যমুখী বলা কঠিন হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁর প্রথম বিদেশ সফর। ২১ জুন তিনি মালয়েশিয়া দিয়ে প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেন এবং সেখান থেকে চীনে যান। চীন সফরে ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়; বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও সংযোগ ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, জ্বালানি, হালাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি আলোচিত হয়। অর্থাৎ সরকারের প্রথম উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সংকেতই ছিল দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দিকে। যদি নীতিটি সরল অর্থে মিডল ইস্ট ওরিয়েন্টেড হতো, তাহলে এই সফর-ক্রম ব্যাখ্যা করা কঠিন হতো।

বরং বর্তমান প্রবণতাকে একাডেমিক ভাষায় ‘স্ট্র্যাটেজিক ডাইভারসিফিকেশন’ বা ‘মাল্টি অ্যালাইনমেন্ট’-এর কাছাকাছি বলা যায়। বাংলাদেশ এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে আছে যেখানে ভারত ভৌগোলিকভাবে অপরিহার্য, চীন অবকাঠামো ও বাণিজ্যের বড় অংশীদার, যুক্তরাষ্ট্র প্রধান রপ্তানি বাজার ও নিরাপত্তা-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, আর মধ্যপ্রাচ্য শ্রম, রেমিট্যান্স, জ্বালানি ও ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের কেন্দ্র। এই চারটি অক্ষের কোনো একটিকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি টেকসই করা সম্ভব নয়। তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি সফল হতে হলে তাই এক শক্তির কাছ থেকে আরেক শক্তির দিকে নির্ভরতা স্থানান্তর নয়, বরং নির্ভরতাগুলোকে ছড়িয়ে দিয়ে দর-কষাকষির জায়গা বাড়াতে হবে।

 

এই জায়গায় জিসিসি দেশগুলো বাংলাদেশের জন্য বিশেষ কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। গত এক দশকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার নিজেদেরকে কেবল তেল-গ্যাস রপ্তানিকারক রাষ্ট্র হিসেবে রাখেনি; বন্দর, এভিয়েশন, ডিজিটাল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সভেরিন ইনভেস্টমেন্ট-এর বৈশ্বিক খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই পুঁজি পশ্চিমা উন্নয়ন অর্থায়ন বা চীনা অবকাঠামো ঋণের বিকল্প নয়, কিন্তু একটি ‘তৃতীয় অর্থনৈতিক পরিসর’ তৈরি করতে পারে। সৌদি বন্দর বিনিয়োগের আগ্রহ কিংবা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অংশীদারত্বের আলোচনা সেই সম্ভাবনার প্রাথমিক লক্ষণ।

 

তবে সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও আছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বাংলাদেশের শ্রমনির্ভরতা খুব বেশি। শুধু শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ানোকে কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখলে হবে না; দক্ষতা, বেতন, নিয়োগ ব্যয়, চুক্তি বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং শ্রমিকের অধিকারকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বন্দর বা লজিস্টিকসের মতো কৌশলগত অবকাঠামোয় বিদেশি বিনিয়োগ নেওয়ার সময় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দর, জাতীয় নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক রিটার্ন নিশ্চিত করা জরুরি। তৃতীয়ত, জিসিসিকে একটি অভিন্ন ‘মুসলিম ব্লক’ হিসেবে দেখাও ভুল হবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরান, তুরস্ক, ইসরায়েল এবং বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের নিজস্ব হিসাব আছে। ঢাকাকে তাই সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে, কিন্তু কারও আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশে পরিণত হওয়া উচিত নয়।

 

এই সতর্কতা ২০২৬ সালের যুদ্ধের সময় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়েছে। বাংলাদেশ একদিকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর হামলার ঘটনায় তাদের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি সংহতি জানিয়েছে, অন্যদিকে পরে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান শান্তি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে উত্তেজনা হ্রাস, সরবরাহ শৃঙ্খল পুনরুদ্ধার এবং কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। একটি ছোট কিন্তু উচ্চমাত্রায় আন্তঃনির্ভর রাষ্ট্রের জন্য এটাই যৌক্তিক—মধ্যপ্রাচ্যে কোনো পক্ষের ভূরাজনৈতিক প্রক্সি হওয়া নয়, বরং স্থিতিশীলতা রক্ষা করা; কারণ যুদ্ধের প্রভাব ঢাকাতে এসেও পড়ে।

 

তারেক রহমানের সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক কূটনীতিকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে আনার চেষ্টা। জুলাইয়ে এফআইসিসিআই-এর বিনিয়োগ সম্মেলনে তিনি ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে গালফ ক্যাপিটাল-এর প্রতি আগ্রহ স্বাভাবিক। কিন্তু সৌদি বা কাতারি বিনিয়োগ আকর্ষণের সাফল্য শেষ পর্যন্ত মাপতে হবে কতটি আমন্ত্রণপত্র আদান-প্রদান হলো তা দিয়ে নয়; বাস্তবে কত বিনিয়োগ এলো, কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো, প্রযুক্তি কতটা স্থানান্তরিত হলো এবং বাংলাদেশ কতটা নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারল—এই সূচক দিয়ে।

সুতরাং ‘তারেক রহমানের কূটনীতি কি জিয়ার মতোই মধ্যপ্রাচ্যমুখী?’—প্রশ্নটির সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর সম্ভবত এই: ভৌগোলিক অর্থে নয়, কৌশলগত দর্শনের কিছু জায়গায় হ্যাঁ। জিয়াউর রহমান মধ্যপ্রাচ্যকে ব্যবহার করেছিলেন বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিকল্প বাড়াতে, অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে এবং একটি মাত্র আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমাতে। খালেদা জিয়া সেই সম্পর্ককে শ্রম, রেমিট্যান্স, ওআইসি ও সৌদি অর্থনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করেন। তারেক রহমান এখন একই ঐতিহাসিক সম্পদকে নতুন যুগের ভাষায়—জিসিসি ক্যাপিটাল, লজিস্টিকস, রিনিউয়েবল এনার্জি, টেকনোলজি, ফুড সিকিউরিটি এবং স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ—পুনর্গঠন করতে চাইছেন বলে প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

 

কিন্তু তাঁর কূটনীতির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি ঘনিষ্ঠতা দিয়ে নয়; বরং এই ঘনিষ্ঠতাকে তিনি বৃহত্তর বিশ্বে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের কতটা কাজে লাগাতে পারেন, তা দিয়ে। মালয়েশিয়া ও চীনে প্রথম সফর, সৌদি আরবের সঙ্গে দ্রুত গভীরতর অর্থনৈতিক যোগাযোগ, কাতারের সঙ্গে শ্রম ও বিনিয়োগ কূটনীতি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জিসিসি-র সঙ্গে সংকটকালীন সংহতি, ওআইসি-তে রোহিঙ্গা ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে সক্রিয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এখন পর্যন্ত যে ছবি তৈরি হচ্ছে, তা ‘মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরে যাওয়া’ নয়; বরং পরিবর্তনশীল বহুমেরু বিশ্বে বাংলাদেশের অংশীদারত্বের ঝুড়ি বড় করার চেষ্টা। এই কৌশল যদি ভারসাম্য, স্বচ্ছতা এবং বাস্তব অর্থনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে তারেক রহমানের কূটনীতির সঙ্গে জিয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মিলটি মধ্যপ্রাচ্যমুখিতা নয়—বরং ছোট রাষ্ট্রের জন্য বেশি বিকল্প তৈরি করে বেশি কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের চেষ্টা।

 

লেখক: পিএইচডি শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগশানডং বিশ্ববিদ্যালয়, চীন